ঢাকা ০৮:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

গল্প || ফুল ও রাজকন্যা – পারভেজ হুসেন তালুকদার 

ফুল ও রাজকন্যা
পারভেজ হুসেন তালুকদার 
অনেক দিন আগের কথা, এক দেশে ছিলো এক রাজকন্যা। সে ছিলো খুব রূপবতী আর তাঁর চরিত্র ও ছিলো খুব ভালো। একদিন রাজকন্যার খুব ইচ্ছে হলো জঙ্গলে বেড়াতে যাবে তাই সে অনেক সৈন্য, দাসী ও প্রহরিদের নিয়ে ভ্রমণে বের হলো। রাজকন্যা বিশাল এক হাতির পিঠে মুক্তখচিত আসনে বসে বসে চারপাশ দেখতে দেখতে যাচ্ছেন। জঙ্গলে পৌঁছে আয়োজন করা হলো খাওয়া দাওয়া, এদিকে রাজকন্যা পায়ে হেঁটে বেড়িয়ে পড়লেন জঙ্গল দেখতে। যদিও আরো অনেকবার আসা হয়েছে এই জঙ্গলে তবুও রাজকন্যার কাছে আজ যেনো খুব বেশি ভালো লাগছে জঙ্গলটা। পাখিদের গান,  বাগানের সজীবতা, রঙিন ফুল আর ফুলের সুঘ্রাণে মুগ্ধ হলেন রাজকন্যা। জঙ্গলের পথে হাটতে হাটতে রাজকন্যার নজরে পড়লো পাশের একটি ফুলগাছ, গাছে দুটো সুন্দর ফুল। সেই গাছ থেকে নিজ হাতে একটা ফুল তোললেন তিনি। তখন অন্য ফুলটা বললো; আমাকেও তোলো। রাজকন্যার হাতে থাকা ফুলটা দাসীকে দিয়ে এই ফুলটা তোললেন। কাছে এনে কয়েকবার ঘ্রাণ নিলেন; আহ্ এমন ঘ্রাণ তিনি কখনো পাননি। মন থেকে আলতু করা একটা চুমু খেলেন ফুলে। সঙ্গে সঙ্গে একঝলক আলো এসে ফুল থেকে হয়ে গেলো এক সুন্দর যুবক। রাজকন্যাকে বললো ; আমি অনেকদিন তোমার অপেক্ষায় ছিলাম, আমি জানতাম তুমি আসবে আর আমাকে এখান থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে। রাজকন্যা বললো ; কে তুমি আর ফুল হলে কিভাবে? যুবক তাঁর হৃদয়ভরা দুঃখগাথা কথা রাজকন্যাকে বলতে লাগলো।
এই রাজ‍্য থেকে তিন পরে আমার রাজ‍্য, আমি এক রাজপুত্র। একদিন আমাদের প্রাসাদে এক দুষ্টু যাদুকর আসে এবং আব্বাজানের ( রাজা’র ) কাছে গিয়ে বলতে থাকে ‘ এই রাজ‍্য আমার হাতে তোলে দে, না হয় তুই আমার হাতে মারা যাবি’। আব্বাজান তার কথা শুনে প্রহরী দিয়ে তাকে প্রাসাদ থেকে বের করে এই রাজ‍্য ছাড়া করতে বলেন। প্রহরীরা তাকে রাজ‍্য ছাড়িয়ে অনেক দূরে ফেলে এসেছিলো। তবুও সেই রাতে সে আবার আসে। তাঁর যাদুশক্তি দিয়ে আমার পুরো পরিবারকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করে নেয়। আমি তখন কিশোর ছিলাম, সে আমাকে এই জঙ্গলে ফুল বানিয়ে রেখে যায়। যাবার সময় বলে যায়; শুন, এই দেশের এক রাজকন্যা আছে যে এখনো ছোট, তাঁর যখন ১৮ বছর পূর্ণ হবে সে সময়ের পরে যদি এসে তোর পাশের ফুলটা ছিঁড়ে তাহলে তুই এই কথা বলতে পারবি ‘ আমাকেও তোলো ‘। তখন তুই যদি তাকে ডেকে বলতে পারিস তবেই সে তোকে তোলবে এবং যদি তোকে চুমু খায় তুই সেদিন আবার মানুষ হতে পারবি।
তুমি ত এখন ঠিক হয়ে গেছো কিন্তু তোমার রাজ‍্যের কি হবে? রাজকন্যা বললো। তখন রাজপুত্র বললো; দুষ্টু যাদুকর বলেছি যে যদি কোনদিন তাকে কেউ বন্দি করতে পারে এবং সে আত্মসমর্পণ করে তাহলে তাঁর যাদুশক্তি চিরদিনের জন্য চলে যাবে আর তখন রাজ‍‍্য ফিরে পাবো কিন্তু আমার বাবা মা’কে পাবো না। রাজকন্যা বললো; দুঃখ করো না, আগে প্রাসাদে চলো। আব্বাকে বলে সবকিছু খোলে বলি গিয়ে।
রাজকন্যা রাজপুত্র, দাসী,  সৈন্যদের সাথে নিয়ে ফিরে এলেন এবং সবকিছু রাজাকে খোলে বললেন দুজনে। তখন রাজা তাঁর দেশের সবথেকে বড় যাদুকরকে ডাকলেন। যাদুকর এসে সবকথা শুনে বললো বুঝেছি, তিন দিন পর আমি আসবো তখন কিভাবে কি করতে হবে তখন বলবো। আর এই তিনদিনে রাজকন্যা আর রাজপুত্রের বন্ধুত্বটা খুব গভীর হলো। তিনদিন পরে যাদুকর আসলো এবং বললো, তোমার যদি ঐ যাদুকরকে বন্দি করতে চাও তহলে তোমাদের কঠিন একটা কাজ করতে হবে। সেই কাজটা হলো, ঐ যাদুকরের শরীরের পশম ( লোম ) দিয়ে যদি তোমরা তাঁর হাত পা বাঁধতে পারো সে তা খোলতে পারবে না এবং দুইবার নিজেকে মুক্ত করবার চেষ্টা করলেই তাঁর যাদুশক্তি অকেজো হয়ে যাবে। তাছাড়া আর কোনো পথ নেই। রাজকন্যা আর রাজপুত্র সারা রাত্রি না ঘুমিয়ে ভাবতে ভাবতে একটা বুদ্ধি বের করলেন। দুজনেই দুষ্টু যাদুকরের কাজে দাস-দাসী হয়ে যাবেন। রাজার অনুমতি নিয়ে দুজনে ঐ যাদুকরের প্রাসাদে পৌঁছালেন, কাজও পেলেন। যাদুকরের দেখাশোনার কাজ। দুজনে যখন ঐ যাদুকরকে দেখলেন চমকে গেলেন। কারণ  দুষ্টু যাদুকরের মাথায় চুল না থাকলেও শরীরের লোম অনেক লম্বা লম্বা। দুই-তিনটা লোমেই হাত পা বাঁধা যাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেকদিন কেটে গেলো সুযোগ পাচ্ছেন না রাজকন্যা ও রাজপুত্র। অবশেষে একদিন সুযোগ পেলেন, প্রাসাদের সবাই বাহিরে গেছেন। রাজা একা আর ঐ দুই দাস-দাসী ( রাজপুত্র ও রাজকন্যা ) সুযোগ বুঝে লোম ছিঁড়ে নিলেন দুই-তিনটা। প্রথম দুটোর টের না পেলেও শেষটায় টের পেয়ে গর্জে উঠেছে যাদুকর। কিন্তু রাজকন্যা রূপের মায়া দিয়ে চুপ করিয়ে দিলেন। আর রাজপুত্র তাঁর পা বেঁধে নিলেন। শেষে রাজকন্যা তাঁর হাত ও বেঁধে নিলেন। এবার রাজপুত্র পাশের দেয়াল থেকে তলোয়ার নিয়ে এসে গলার কাছে রেখে বললেন, তুই বন্দি আত্মসমর্পণ কর। যাদুকর তরতর কাঁপছে, কাঁপতে কাঁতপে আত্মসমর্পণ করে নিলো। রাজপুত্রের দেশের সবাই এ ঘটনা জানলেও ভয়ে কিছু বলতো না। এবার সবাই খুশি। রাজকন্যা বিদায় নিয়ে চলে গেলেন, রাজপুত্রের মন না চাইলেও তাকে যেতে দিতে হলো। এভাবে বেশ কিছুদিন যাবার পরে রাজকন্যা আর তাঁর বাবা রাজপুত্র তথা নতুন রাজার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলেন, নতুন রাজা গ্রহণ করলেন এবং তাঁদের বিয়ে হয়ে গেলো। তাঁরা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।
Tag :
জনপ্রিয়

গোমস্তাপুরে বাল্য বিয়ে বন্ধ করলো উপজেলা প্রশাসন

গল্প || ফুল ও রাজকন্যা – পারভেজ হুসেন তালুকদার 

প্রকাশের সময় : ১০:২৮:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২
ফুল ও রাজকন্যা
পারভেজ হুসেন তালুকদার 
অনেক দিন আগের কথা, এক দেশে ছিলো এক রাজকন্যা। সে ছিলো খুব রূপবতী আর তাঁর চরিত্র ও ছিলো খুব ভালো। একদিন রাজকন্যার খুব ইচ্ছে হলো জঙ্গলে বেড়াতে যাবে তাই সে অনেক সৈন্য, দাসী ও প্রহরিদের নিয়ে ভ্রমণে বের হলো। রাজকন্যা বিশাল এক হাতির পিঠে মুক্তখচিত আসনে বসে বসে চারপাশ দেখতে দেখতে যাচ্ছেন। জঙ্গলে পৌঁছে আয়োজন করা হলো খাওয়া দাওয়া, এদিকে রাজকন্যা পায়ে হেঁটে বেড়িয়ে পড়লেন জঙ্গল দেখতে। যদিও আরো অনেকবার আসা হয়েছে এই জঙ্গলে তবুও রাজকন্যার কাছে আজ যেনো খুব বেশি ভালো লাগছে জঙ্গলটা। পাখিদের গান,  বাগানের সজীবতা, রঙিন ফুল আর ফুলের সুঘ্রাণে মুগ্ধ হলেন রাজকন্যা। জঙ্গলের পথে হাটতে হাটতে রাজকন্যার নজরে পড়লো পাশের একটি ফুলগাছ, গাছে দুটো সুন্দর ফুল। সেই গাছ থেকে নিজ হাতে একটা ফুল তোললেন তিনি। তখন অন্য ফুলটা বললো; আমাকেও তোলো। রাজকন্যার হাতে থাকা ফুলটা দাসীকে দিয়ে এই ফুলটা তোললেন। কাছে এনে কয়েকবার ঘ্রাণ নিলেন; আহ্ এমন ঘ্রাণ তিনি কখনো পাননি। মন থেকে আলতু করা একটা চুমু খেলেন ফুলে। সঙ্গে সঙ্গে একঝলক আলো এসে ফুল থেকে হয়ে গেলো এক সুন্দর যুবক। রাজকন্যাকে বললো ; আমি অনেকদিন তোমার অপেক্ষায় ছিলাম, আমি জানতাম তুমি আসবে আর আমাকে এখান থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে। রাজকন্যা বললো ; কে তুমি আর ফুল হলে কিভাবে? যুবক তাঁর হৃদয়ভরা দুঃখগাথা কথা রাজকন্যাকে বলতে লাগলো।
এই রাজ‍্য থেকে তিন পরে আমার রাজ‍্য, আমি এক রাজপুত্র। একদিন আমাদের প্রাসাদে এক দুষ্টু যাদুকর আসে এবং আব্বাজানের ( রাজা’র ) কাছে গিয়ে বলতে থাকে ‘ এই রাজ‍্য আমার হাতে তোলে দে, না হয় তুই আমার হাতে মারা যাবি’। আব্বাজান তার কথা শুনে প্রহরী দিয়ে তাকে প্রাসাদ থেকে বের করে এই রাজ‍্য ছাড়া করতে বলেন। প্রহরীরা তাকে রাজ‍্য ছাড়িয়ে অনেক দূরে ফেলে এসেছিলো। তবুও সেই রাতে সে আবার আসে। তাঁর যাদুশক্তি দিয়ে আমার পুরো পরিবারকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করে নেয়। আমি তখন কিশোর ছিলাম, সে আমাকে এই জঙ্গলে ফুল বানিয়ে রেখে যায়। যাবার সময় বলে যায়; শুন, এই দেশের এক রাজকন্যা আছে যে এখনো ছোট, তাঁর যখন ১৮ বছর পূর্ণ হবে সে সময়ের পরে যদি এসে তোর পাশের ফুলটা ছিঁড়ে তাহলে তুই এই কথা বলতে পারবি ‘ আমাকেও তোলো ‘। তখন তুই যদি তাকে ডেকে বলতে পারিস তবেই সে তোকে তোলবে এবং যদি তোকে চুমু খায় তুই সেদিন আবার মানুষ হতে পারবি।
তুমি ত এখন ঠিক হয়ে গেছো কিন্তু তোমার রাজ‍্যের কি হবে? রাজকন্যা বললো। তখন রাজপুত্র বললো; দুষ্টু যাদুকর বলেছি যে যদি কোনদিন তাকে কেউ বন্দি করতে পারে এবং সে আত্মসমর্পণ করে তাহলে তাঁর যাদুশক্তি চিরদিনের জন্য চলে যাবে আর তখন রাজ‍‍্য ফিরে পাবো কিন্তু আমার বাবা মা’কে পাবো না। রাজকন্যা বললো; দুঃখ করো না, আগে প্রাসাদে চলো। আব্বাকে বলে সবকিছু খোলে বলি গিয়ে।
রাজকন্যা রাজপুত্র, দাসী,  সৈন্যদের সাথে নিয়ে ফিরে এলেন এবং সবকিছু রাজাকে খোলে বললেন দুজনে। তখন রাজা তাঁর দেশের সবথেকে বড় যাদুকরকে ডাকলেন। যাদুকর এসে সবকথা শুনে বললো বুঝেছি, তিন দিন পর আমি আসবো তখন কিভাবে কি করতে হবে তখন বলবো। আর এই তিনদিনে রাজকন্যা আর রাজপুত্রের বন্ধুত্বটা খুব গভীর হলো। তিনদিন পরে যাদুকর আসলো এবং বললো, তোমার যদি ঐ যাদুকরকে বন্দি করতে চাও তহলে তোমাদের কঠিন একটা কাজ করতে হবে। সেই কাজটা হলো, ঐ যাদুকরের শরীরের পশম ( লোম ) দিয়ে যদি তোমরা তাঁর হাত পা বাঁধতে পারো সে তা খোলতে পারবে না এবং দুইবার নিজেকে মুক্ত করবার চেষ্টা করলেই তাঁর যাদুশক্তি অকেজো হয়ে যাবে। তাছাড়া আর কোনো পথ নেই। রাজকন্যা আর রাজপুত্র সারা রাত্রি না ঘুমিয়ে ভাবতে ভাবতে একটা বুদ্ধি বের করলেন। দুজনেই দুষ্টু যাদুকরের কাজে দাস-দাসী হয়ে যাবেন। রাজার অনুমতি নিয়ে দুজনে ঐ যাদুকরের প্রাসাদে পৌঁছালেন, কাজও পেলেন। যাদুকরের দেখাশোনার কাজ। দুজনে যখন ঐ যাদুকরকে দেখলেন চমকে গেলেন। কারণ  দুষ্টু যাদুকরের মাথায় চুল না থাকলেও শরীরের লোম অনেক লম্বা লম্বা। দুই-তিনটা লোমেই হাত পা বাঁধা যাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেকদিন কেটে গেলো সুযোগ পাচ্ছেন না রাজকন্যা ও রাজপুত্র। অবশেষে একদিন সুযোগ পেলেন, প্রাসাদের সবাই বাহিরে গেছেন। রাজা একা আর ঐ দুই দাস-দাসী ( রাজপুত্র ও রাজকন্যা ) সুযোগ বুঝে লোম ছিঁড়ে নিলেন দুই-তিনটা। প্রথম দুটোর টের না পেলেও শেষটায় টের পেয়ে গর্জে উঠেছে যাদুকর। কিন্তু রাজকন্যা রূপের মায়া দিয়ে চুপ করিয়ে দিলেন। আর রাজপুত্র তাঁর পা বেঁধে নিলেন। শেষে রাজকন্যা তাঁর হাত ও বেঁধে নিলেন। এবার রাজপুত্র পাশের দেয়াল থেকে তলোয়ার নিয়ে এসে গলার কাছে রেখে বললেন, তুই বন্দি আত্মসমর্পণ কর। যাদুকর তরতর কাঁপছে, কাঁপতে কাঁতপে আত্মসমর্পণ করে নিলো। রাজপুত্রের দেশের সবাই এ ঘটনা জানলেও ভয়ে কিছু বলতো না। এবার সবাই খুশি। রাজকন্যা বিদায় নিয়ে চলে গেলেন, রাজপুত্রের মন না চাইলেও তাকে যেতে দিতে হলো। এভাবে বেশ কিছুদিন যাবার পরে রাজকন্যা আর তাঁর বাবা রাজপুত্র তথা নতুন রাজার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলেন, নতুন রাজা গ্রহণ করলেন এবং তাঁদের বিয়ে হয়ে গেলো। তাঁরা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।