ঢাকা ১২:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কেন এত রিট মামলা

মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক (৭২) এলাকার কলুমা মৌজায় পৈতৃক সূত্রে ৫১ শতক জমির মালিকানা পান। দীর্ঘদিন ভোগদখলে থাকার পর ২০১২ সালের ২৩ এপ্রিল সেই জমি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে স্থানীয় প্রশাসন। সম্পত্তি ফিরে পেতে ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন তিনি। অর্পিত সম্পত্তিতে অন্তর্ভুক্তির বৈধতা নিয়ে ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর রুল দেয় হাইকোর্ট।

রিটকারীপক্ষের আইনজীবীরা জানান, ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন মুন্সীগঞ্জের স্থানীয় দেওয়ানি আদালত এই সম্পত্তি অর্পিত নয় বলে ডিক্রি দেয়। কিন্তু সেটি অর্পিত সম্পত্তিতে তালিকাভুক্ত হওয়ায় বিপাকে পড়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন শামসুল হক। রুল বিচারাধীন রয়েছে।

শামসুল হকের মতো এমন সম্পত্তির অধিকার, কিংবা নাগরিকের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার মতো সাংবিধানিক বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রিট মামলা দিন দিন বাড়ছে। সুপ্রিম কোর্টে প্রশাসন কর্মকর্তাদের থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে রিট মামলা হয়েছে ১৫ হাজার ২৫৭টি, ২০২০ সালে ১০ হাজার ৪৫৮টি, ২০২১ সালে আবেদন হয়েছে ১৩ হাজার ৩৪০টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ৯ হাজার ১২২টি রিট মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গত তিন বছর সাত মাসে হাইকোর্টে রিট মামলা হয়েছে ৪৮ হাজার ১৭৭টি। তবে এর মধ্যে কতটি মামলায় আদেশ, রুল কিংবা রিট নিষ্পত্তি হয়েছে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কোনো তথ্য থাকে না বলে জানান সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

রিট মামলা নিয়ে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ আইনবিদ এবং বেশ কয়েকজন মানবাধিকারকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের ভাষ্য, প্রচলিত মামলা ও রিট মামলার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সরকারের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংবিধানবহির্ভূত, বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় সব রিট মামলা হয়। নাগরিক তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে সংক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন।

এত বেশিসংখ্যক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এ আইনবিদ ও মানবাধিকারকর্মীরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নাগরিকের দায়িত্বে প্রতি অবহেলা রয়েছে। বিপরীতে মানুষ আইন আদালত ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে প্রতিকার পেতে আগ্রহী এটাও বোঝা যায়। তবে প্রতিকার পেতে বিলম্বের বিষয়টি যেমন অনাকাক্সিক্ষত তেমনি মামলা করে শুনানির জন্য পড়ে থাকাও সমীচীন নয় বলে মনে করেন তারা।

অন্যদিকে প্রশাসনের উদাসীনতা ও গাফিলতিতে রিট মামলা হয় এমন বক্তব্য পুরোপুরি সঠিক নয় জানিয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এএম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘গুণাগুণ ছাড়াও অনেক রিট মামলা করা হয়। কিন্তু শুনানি হয় না। অনেক আবেদন ও রুল খারিজ হয়।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রশাসন সঠিকভাবে কাজ না করলেই কিন্তু মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি হয়। আবার অতি উৎসাহী হয়ে এত মামলা হওয়াও সমীচীন নয়। আইনজীবীরা হয়তো পরামর্শ দিচ্ছেন। এজন্য মামলা হচ্ছেই।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘মামলা হতে পারে। কিন্তু সেগুলো জমে থাকবে কেন? আইনজীবী শুনানি না করলে তো ক্ষতিগ্রস্ত দাবিদার পক্ষ প্রতিকার পেলেন না। তাহলে মামলা করে লাভ কী। এভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় কোথায়?’

যে কারণ ও পদ্ধতিতে রিট মামলা : বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ থেকে ৪৩ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত আইনের দৃষ্টিতে সমতা, নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও জীবনের অধিকার, চলাফেরা, সমাবেশ, সংগঠনের অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তি রক্ষার অধিকার, গ্রেপ্তার বা আটকসংক্রান্ত রক্ষাকবচ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এসব বিস্তারিত বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে।

জ্যেষ্ঠ আইনবিদরা বলেন, সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। এর ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণের ক্ষমতা শুধুই সুপ্রিম কোর্টের। নাগরিক এসব মৌলিক অধিকার থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করলে ব্যক্তিগত ও জনস্বার্থে উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। যেকোনো নাগরিক সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অনুযায়ী হাইকোর্টে বন্দি প্রদর্শন রিট, পরমাদেশ বা হুকুমজারি রিট, প্রতিষেধক বা নিষেধাজ্ঞামূলক রিট, উৎপ্রেশন রিট এবং কারণ দর্শাও এ পাঁচ ধরনের রিট আবেদন করতে পারেন।

প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা ভুক্তভোগী শামসুল হককে আইনি সহায়তা দিচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটি। লিগ্যাল এইড প্যানেলের আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ^াস বলেন, ‘২৭ বছর আগে দেওয়ানি আদালত বলেছে, এ সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু প্রশাসনের একগুঁয়েমির কারণে সেটি অর্পিত সম্পত্তির অধীনে চলে গেল। প্রশাসন কতটুকুু উদাসীন তার উদাহরণ হলো তারা এ মামলায় এখনো রুলের জবাব দেয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকেও আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘বেশিসংখ্যক রিট মানেই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মীরা সঠিকভাবে কাজ করে না তাই রিট মামলা বেশি হয়। এর প্রথম কারণ হচ্ছে সরকারে সুশাসনের অভাব।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে যেসব সিদ্ধান্ত হয় তা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী করলেই কিন্তু আর মামলার প্রয়োজন পড়ে না। আদালতকে তো দেখানো হচ্ছে যে আইন ও সংবিধান ভঙ্গ হয়েছে। সহজ কথা হলো, যতদিন পর্যন্ত সংবিধান ও আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত কম হবে ততদিন রিট হবে।’

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ১৪ বছরের বেশি সময় আগে পর্যটক ভিসায় ভারতে গিয়ে বাদল ফরাজি নামে ১৮ বছরের এক তরুণ বেনাপোল সীমান্তে বাদল সিং হিসেবে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে গ্রেপ্তার হন। দিল্লির একটি খুনের মামলায় ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট বাদল ফরাজিকে সেখানকার একটি আদালত যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়। আপিলের পর দিল্লি হাইকোর্টেও সাজা বহাল থাকে। ২০১৮ সালের জুলাইতে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সরকারের চেষ্টায় তাকে দেশে আনার পর কারাগারে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে বাদল ফরাজিকে কারাগারে আটক রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ওই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি কারাগারে বাদল ফরাজিকে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়নি, সে বিষয়ে হাইকোর্টের সন্তুষ্টির জন্য কেন তাকে আদালতে হাজির করা হবে না জানতে চেয়ে রুল দেয় হাইকোর্ট। কিন্তু সাড়ে তিন বছরের বেশি সময়েও রুলের শুনানি শুরু হয়নি।

জানতে চাইলে আসকের আইনজীবী শাহীনুজ্জামান শাহীন বলেন, ‘মাস দেড়েক আগে বিষয়টি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আনতে হাইকোর্টের নজরে আনা হয়েছিল। শুনানির অপেক্ষায় আছি।’

আসকের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট জেডআই খান পান্না বলেন, ‘বিচার কিংবা মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা পেতে আমজনতাকে রীতিমতো লড়াই সংগ্রাম করতে হয়। কারণ এখানে সাধারণ মানুষের প্রতি প্রশাসনের অবহেলা রয়েছে। প্রশাসন বড় ধরনের চোরদের সালাম দেয়। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। তার ওপর যখনই নতুন কোনো আইন করা হয় সেটা হয় গণবিরোধী। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ তো রিট মামলার আশ্রয় নেবেই।’ তিনি বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, বিনা বিচারে কাউকে আটক রাখা, রিমান্ডের মতো বিষয়ে ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ খোলেন না। আদালতে আসেন না। সে ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় মানবাধিকারকর্মীরা এগিয়ে আসেন।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টস’র (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘প্রশাসনের অনেক কাজে মানুষ নাখোশ হন। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কোনো সিদ্ধান্তের মধ্যে মানুষ যদি গলদ, গাফিলতি ও সক্ষমতার ঘাটতি পায় তাহলে রিট মামলা করবে, এটাই স্বাভাবিক।’ তিনি মনে করেন, ব্যক্তিগত ও জনস্বার্থ নানা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দিক-নির্দেশনামূলক রায় ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথাযথ বিধি মেনে চললে এত মামলা হতো না।

সার্বিক বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘অনেক রিট মামলা বিচারাধীন রয়েছে যেগুলোতে শুনানি হয় না। কিছু ঘটনায় দেখা যায়, মামলা হওয়া উচিত দেওয়ানি আদালতে, কিন্তু রিট আবেদন চলে আসে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে খেলাপিদের জামানত বিক্রির নোটিসের বিরুদ্ধে, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি নিয়েও রিট মামলা হয়। কেউ কাউকে উচ্ছেদ করছে, হাইকোর্টে দরখাস্ত দিয়ে বলে নিষ্পত্তি করে দেন। এগুলো কি হাইকোর্টের দেখার দায়িত্ব? অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, গুণাগুণ কিছু নেই, কিন্তু হাইকোর্টে এসে মামলা করে। এরকম হাজার হাজার মামলা পড়ে আছে। এভাবে কিন্তু মামলা বাড়ছে।’

প্রশাসনের ব্যর্থতা ও উদাসীনতায় রিট মামলা হয় কি না এমন প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘যারা এটা বলছেন তারা কীভাবে কী দেখে বলছেন, এটা আমি জানি না। আমার মনে হয় আইনজীবীদের যদি এমন প্রবণতা বাড়ানো যায় যে কোনটা রিট হবে কোনটা হবে না যাচাই-বাছাই করা, তাহলে আমাদের যেমন উপকার হতো তেমনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও মামলা থেকে রেহাই পেতেন।’

Tag :

২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত্যু ২ সহস্রাধিক, আক্রান্ত সাড়ে ৬ লাখ

কেন এত রিট মামলা

প্রকাশের সময় : ০৮:২২:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২

মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক (৭২) এলাকার কলুমা মৌজায় পৈতৃক সূত্রে ৫১ শতক জমির মালিকানা পান। দীর্ঘদিন ভোগদখলে থাকার পর ২০১২ সালের ২৩ এপ্রিল সেই জমি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে স্থানীয় প্রশাসন। সম্পত্তি ফিরে পেতে ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন তিনি। অর্পিত সম্পত্তিতে অন্তর্ভুক্তির বৈধতা নিয়ে ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর রুল দেয় হাইকোর্ট।

রিটকারীপক্ষের আইনজীবীরা জানান, ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন মুন্সীগঞ্জের স্থানীয় দেওয়ানি আদালত এই সম্পত্তি অর্পিত নয় বলে ডিক্রি দেয়। কিন্তু সেটি অর্পিত সম্পত্তিতে তালিকাভুক্ত হওয়ায় বিপাকে পড়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন শামসুল হক। রুল বিচারাধীন রয়েছে।

শামসুল হকের মতো এমন সম্পত্তির অধিকার, কিংবা নাগরিকের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার মতো সাংবিধানিক বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রিট মামলা দিন দিন বাড়ছে। সুপ্রিম কোর্টে প্রশাসন কর্মকর্তাদের থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে রিট মামলা হয়েছে ১৫ হাজার ২৫৭টি, ২০২০ সালে ১০ হাজার ৪৫৮টি, ২০২১ সালে আবেদন হয়েছে ১৩ হাজার ৩৪০টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ৯ হাজার ১২২টি রিট মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গত তিন বছর সাত মাসে হাইকোর্টে রিট মামলা হয়েছে ৪৮ হাজার ১৭৭টি। তবে এর মধ্যে কতটি মামলায় আদেশ, রুল কিংবা রিট নিষ্পত্তি হয়েছে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কোনো তথ্য থাকে না বলে জানান সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

রিট মামলা নিয়ে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ আইনবিদ এবং বেশ কয়েকজন মানবাধিকারকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের ভাষ্য, প্রচলিত মামলা ও রিট মামলার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সরকারের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংবিধানবহির্ভূত, বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় সব রিট মামলা হয়। নাগরিক তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে সংক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন।

এত বেশিসংখ্যক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এ আইনবিদ ও মানবাধিকারকর্মীরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নাগরিকের দায়িত্বে প্রতি অবহেলা রয়েছে। বিপরীতে মানুষ আইন আদালত ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে প্রতিকার পেতে আগ্রহী এটাও বোঝা যায়। তবে প্রতিকার পেতে বিলম্বের বিষয়টি যেমন অনাকাক্সিক্ষত তেমনি মামলা করে শুনানির জন্য পড়ে থাকাও সমীচীন নয় বলে মনে করেন তারা।

অন্যদিকে প্রশাসনের উদাসীনতা ও গাফিলতিতে রিট মামলা হয় এমন বক্তব্য পুরোপুরি সঠিক নয় জানিয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এএম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘গুণাগুণ ছাড়াও অনেক রিট মামলা করা হয়। কিন্তু শুনানি হয় না। অনেক আবেদন ও রুল খারিজ হয়।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রশাসন সঠিকভাবে কাজ না করলেই কিন্তু মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি হয়। আবার অতি উৎসাহী হয়ে এত মামলা হওয়াও সমীচীন নয়। আইনজীবীরা হয়তো পরামর্শ দিচ্ছেন। এজন্য মামলা হচ্ছেই।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘মামলা হতে পারে। কিন্তু সেগুলো জমে থাকবে কেন? আইনজীবী শুনানি না করলে তো ক্ষতিগ্রস্ত দাবিদার পক্ষ প্রতিকার পেলেন না। তাহলে মামলা করে লাভ কী। এভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় কোথায়?’

যে কারণ ও পদ্ধতিতে রিট মামলা : বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ থেকে ৪৩ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত আইনের দৃষ্টিতে সমতা, নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও জীবনের অধিকার, চলাফেরা, সমাবেশ, সংগঠনের অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তি রক্ষার অধিকার, গ্রেপ্তার বা আটকসংক্রান্ত রক্ষাকবচ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এসব বিস্তারিত বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে।

জ্যেষ্ঠ আইনবিদরা বলেন, সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। এর ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণের ক্ষমতা শুধুই সুপ্রিম কোর্টের। নাগরিক এসব মৌলিক অধিকার থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করলে ব্যক্তিগত ও জনস্বার্থে উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। যেকোনো নাগরিক সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অনুযায়ী হাইকোর্টে বন্দি প্রদর্শন রিট, পরমাদেশ বা হুকুমজারি রিট, প্রতিষেধক বা নিষেধাজ্ঞামূলক রিট, উৎপ্রেশন রিট এবং কারণ দর্শাও এ পাঁচ ধরনের রিট আবেদন করতে পারেন।

প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা ভুক্তভোগী শামসুল হককে আইনি সহায়তা দিচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটি। লিগ্যাল এইড প্যানেলের আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ^াস বলেন, ‘২৭ বছর আগে দেওয়ানি আদালত বলেছে, এ সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু প্রশাসনের একগুঁয়েমির কারণে সেটি অর্পিত সম্পত্তির অধীনে চলে গেল। প্রশাসন কতটুকুু উদাসীন তার উদাহরণ হলো তারা এ মামলায় এখনো রুলের জবাব দেয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকেও আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘বেশিসংখ্যক রিট মানেই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মীরা সঠিকভাবে কাজ করে না তাই রিট মামলা বেশি হয়। এর প্রথম কারণ হচ্ছে সরকারে সুশাসনের অভাব।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে যেসব সিদ্ধান্ত হয় তা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী করলেই কিন্তু আর মামলার প্রয়োজন পড়ে না। আদালতকে তো দেখানো হচ্ছে যে আইন ও সংবিধান ভঙ্গ হয়েছে। সহজ কথা হলো, যতদিন পর্যন্ত সংবিধান ও আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত কম হবে ততদিন রিট হবে।’

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ১৪ বছরের বেশি সময় আগে পর্যটক ভিসায় ভারতে গিয়ে বাদল ফরাজি নামে ১৮ বছরের এক তরুণ বেনাপোল সীমান্তে বাদল সিং হিসেবে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে গ্রেপ্তার হন। দিল্লির একটি খুনের মামলায় ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট বাদল ফরাজিকে সেখানকার একটি আদালত যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়। আপিলের পর দিল্লি হাইকোর্টেও সাজা বহাল থাকে। ২০১৮ সালের জুলাইতে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সরকারের চেষ্টায় তাকে দেশে আনার পর কারাগারে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে বাদল ফরাজিকে কারাগারে আটক রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ওই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি কারাগারে বাদল ফরাজিকে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়নি, সে বিষয়ে হাইকোর্টের সন্তুষ্টির জন্য কেন তাকে আদালতে হাজির করা হবে না জানতে চেয়ে রুল দেয় হাইকোর্ট। কিন্তু সাড়ে তিন বছরের বেশি সময়েও রুলের শুনানি শুরু হয়নি।

জানতে চাইলে আসকের আইনজীবী শাহীনুজ্জামান শাহীন বলেন, ‘মাস দেড়েক আগে বিষয়টি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আনতে হাইকোর্টের নজরে আনা হয়েছিল। শুনানির অপেক্ষায় আছি।’

আসকের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট জেডআই খান পান্না বলেন, ‘বিচার কিংবা মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা পেতে আমজনতাকে রীতিমতো লড়াই সংগ্রাম করতে হয়। কারণ এখানে সাধারণ মানুষের প্রতি প্রশাসনের অবহেলা রয়েছে। প্রশাসন বড় ধরনের চোরদের সালাম দেয়। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। তার ওপর যখনই নতুন কোনো আইন করা হয় সেটা হয় গণবিরোধী। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ তো রিট মামলার আশ্রয় নেবেই।’ তিনি বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, বিনা বিচারে কাউকে আটক রাখা, রিমান্ডের মতো বিষয়ে ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ খোলেন না। আদালতে আসেন না। সে ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় মানবাধিকারকর্মীরা এগিয়ে আসেন।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টস’র (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘প্রশাসনের অনেক কাজে মানুষ নাখোশ হন। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কোনো সিদ্ধান্তের মধ্যে মানুষ যদি গলদ, গাফিলতি ও সক্ষমতার ঘাটতি পায় তাহলে রিট মামলা করবে, এটাই স্বাভাবিক।’ তিনি মনে করেন, ব্যক্তিগত ও জনস্বার্থ নানা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দিক-নির্দেশনামূলক রায় ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথাযথ বিধি মেনে চললে এত মামলা হতো না।

সার্বিক বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘অনেক রিট মামলা বিচারাধীন রয়েছে যেগুলোতে শুনানি হয় না। কিছু ঘটনায় দেখা যায়, মামলা হওয়া উচিত দেওয়ানি আদালতে, কিন্তু রিট আবেদন চলে আসে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে খেলাপিদের জামানত বিক্রির নোটিসের বিরুদ্ধে, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি নিয়েও রিট মামলা হয়। কেউ কাউকে উচ্ছেদ করছে, হাইকোর্টে দরখাস্ত দিয়ে বলে নিষ্পত্তি করে দেন। এগুলো কি হাইকোর্টের দেখার দায়িত্ব? অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, গুণাগুণ কিছু নেই, কিন্তু হাইকোর্টে এসে মামলা করে। এরকম হাজার হাজার মামলা পড়ে আছে। এভাবে কিন্তু মামলা বাড়ছে।’

প্রশাসনের ব্যর্থতা ও উদাসীনতায় রিট মামলা হয় কি না এমন প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘যারা এটা বলছেন তারা কীভাবে কী দেখে বলছেন, এটা আমি জানি না। আমার মনে হয় আইনজীবীদের যদি এমন প্রবণতা বাড়ানো যায় যে কোনটা রিট হবে কোনটা হবে না যাচাই-বাছাই করা, তাহলে আমাদের যেমন উপকার হতো তেমনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও মামলা থেকে রেহাই পেতেন।’