ঢাকা ০৫:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রাজধানীতে যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে ট্রাফিকের মামলা

‘মিরপুর থেকে কাওয়ান বাজার পর্যন্ত এসেছি। তিনবার রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র চেক করেছে ট্রাফিক পুলিশ। ট্রাফিক পুলিশ বিভিন্ন অজুহাতে মামলা দেয়, যার কারণে আমরা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই।’ কথাগুলো বলছিলেন, লাব্বাইক পরিবহনের কন্ডাক্টর ফিরোজ হোসেন।

রাস্তায় যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দেয়। একই অভিযোগ শিকড় পরিবহনের চালক জয়নাল হোসেনেরও। যানবাহনের চালকদের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশ কমিশনের আশায় বেশি বেশি মামলা দিচ্ছে। অবশ্য ট্রাফিক পুলিশ বলছে, এখানে ট্রাফিক পুলিশের কমিশন নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জরিমানার অর্থের পুরোটাই যায় সরকারের কোষাগারে।

ট্রাফিক বিভাগ বলছে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও মোটরযান আইন যথাযথ বাস্তবায়নে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারী চালক ও গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা-জরিমানা হয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই। সড়কে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে অকারণেই ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দোষী হতে হচ্ছে। চালকরা ভাবেন, ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা জরিমানার ভাগের জন্য তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেন।

জানা যায়, হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার, ট্রাফিক পুলিশের আদেশ অমান্য করা ও বাধা সৃষ্টি এবং তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, হেলমেট না পরে মোটরসাইকেল চালানো, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা, গাড়ির কাগজ আপডেট না থাকাসহ এমন অপরাধে মোটরযান আইনে মামলা হয়। এ ছাড়া গাড়ি চলন্ত অবস্থায় কালো ধোঁয়া বের হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা করতে পারেন।

ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সর্বোচ্চ মামলা হয় ডিএমপিতে। মামলার সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৫ হাজার ৯১১টি। এসব মামলায় জরিমানা আদায় হয় ৫০ কোটি ৯৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩০৩ টাকা। একই বছরে সারাদেশে মোটরযান আইনে মামলা হয়েছে মোট ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৯১২টি। এসব মামলায় ২২১ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার ৪১৪ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

আর ২০২০ সালে সারাদেশে মোটরযান আইনে মোট মামলার সংখ্যা ৬ লাখ ১৩ হাজার ১৯টি। জরিমানার পরিমাণ ৭৭ কোটি ২৭ লাখ ৮৬ হাজার ২৫৬ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সারাদেশে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ৮৯৩টি। আর জরিমানা আদায় বেড়েছে ১৪৩ কোটি ৭৯ লাখ ৪৫ হাজার ১৫৮ টাকা।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বলছে, শুধু ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের দায়ের করা মামলায় আদায় করা জরিমানা থেকে প্রতি মাসে সরকারের কোষাগারে জমা পাঁচ কোটি টাকারও বেশি।

গাড়ি চালকদের অভিযোগ, মামলা দেওয়ার জন্য ট্রাফিক পুলিশ পাগল হয়ে যায়। এসব মামলা থেকে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা টাকা পান বা কমিশন পান। এজন্য তারা গাড়ি ধরার পর মামলার জন্য বেপরোয়া হয়ে যান।

রাজধানীর বাংলামটর মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের মামলার শিকার হওয়া মোটরসাইকেল চালক ইব্রাহীম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি গত মাসে ৫ হাজার টাকার মামলা খেয়েছি।’ কীভাবে এই মামলায় পড়লেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে রাস্তায় পুলিশ দাঁড়িয়ে বলল, কাগজ দেন, এরপর আমি কাগজ দেওয়ার পরে বলে পেছনের লোক হেলমেট খুলে বসে আছে, মাথায় দেয়নি এজন্য জোর করে পল্টন মোড়ে শায়রুল নামের এক ট্রাফিক সার্জেট ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে মামলা দেয়।

পাঠাও চালক ফাহাদ হোসেন বলেন, কোরবানির ঈদের পর থেকে মোট ২টা মামলা খেয়েছি। একটি মামলা ২ হাজার টাকার, অন্যটি ৫ হাজার টাকার। একটি হলো পেছনের ব্যক্তির হেলমেট ছিল না, আর অন্যটি হলো- আমার লাইসেন্স ছিল না কাছে। তিনি বলেন, লাইসেন্স হারিয়ে যাওয়ার জিডিও ছিল না কাছে, যার জন্য মূলত মামলাটি দিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট হান্নান বলেন, আমরা সহজে কাউকে মামলা দিতে চাই না। অনেক চালক সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে এবং অনিয়ম করে এজন্য আমরা মামলা দিতে বাধ্য হয়।

ফার্মগেট এলাকায় হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন তুষার হোসেন। সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট তাকে থামিয়ে দুই হাজার টাকার মামলা দেন। দ্বিতীয়বারও একইভাবে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করায় দ্বিতীয়বার একই মামলা হয় তার বিরুদ্ধে।

আজিমপুর এলাকায় কথা ২৭ নম্বর পরিবহনের চালক লাল মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, রাস্তাঘাটে শুধু ট্রাফিক পুলিশ বিরক্ত করে এবং কাগজপত্র নিয়ে বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে মামলা দেয়।

ফার্মগেটে কথা হয় স্বাধীন পরিবহনের চালক আলামিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাজধানীতে গাড়ি চালানোর কোনো পরিবেশ নেই। ট্রাফিক পুলিশের মামলায় আমরা বিরক্ত।

শিকড় পরিবহনের চালক সেলিম বলেন, ট্রাফিকের মামলায় আমরা জর্জরিত। তাদের অত্যাচারে রাস্তায় বের হওয়া যায় না। অনেক সময় যাত্রীরা হয়রানির শিকার হয়। তিনি বলেন, যদিও আমাদের কাগজপত্র সব সঠিক আছে। তারপরও ট্রাফিক রাস্তায় ধরে সময় নষ্ট করে।

বাংলামোটর মোড়ে কথা হয় বিহঙ্গ পরিবহন লিমিটেডের চালক আশরাফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি ঢাকা প্রকাশ-কে বলেন, ট্রাফিকের অত্যাচারে জর্জরিত আমরা। তারা অনেক সময় আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে এবং মামলা দেয়। শুধু আমি না ট্রাফিকের মামলায় জর্জরিত অসংখ্য চালক। আপনি এ মামলার বিষয়টি নিয়ে চালকদের সঙ্গে কথা বলে দেখেন আমি সত্য বলছি না মিথ্যা বলছি। বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর জানা উচিত।

অবশ্য ফার্মগেটে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, চালকেরা অন্যায় বা অনিয়ম করলে আমরা মামলা দিয়ে থাকি।

ট্রাফিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ করলে তো ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি ধরবেই। নতুন আইনে মামলায় জরিমানার অঙ্ক অনেক বেড়েছে।

শাহাবাগে ডিউটিরত ট্রাফিক পুলিশের সার্জন্টে খায়রুল আলম বলেন, সরকারের অন্যান্য সংস্থা কোনোকিছু উদ্ধার করলে সেখান থেকে ৩০ শতাংশ পায়। সেটা সংশ্লিষ্ট সংস্থা তাদের খরচ বাবদ দেখাতে পারে। কিন্তু ট্রাফিক বিভাগে এমন কিছু নেই। মামলায় যদি ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের কমিশন দেওয়া হতো তাহলে আমরা শুধু মামলাই দিয়ে যেতাম। এতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মামলা দেওয়ার প্রতিযোগিতা বেড়ে যেত।

শুলশানে কথা হয় ট্রাফিক পুলিশের সদস্য সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে। এসময় তিনি বলেন, অধিকাংশ গাড়িতেই কিছু না কিছু ত্রুটি থাকে। প্রতিদিন একশো গাড়ি ধরলে ইচ্ছা করলে ৫০ শতাংশের বেশি যানবাহনে মামলা দেওয়া যায়। কিন্তু এভাবে মামলা দিলে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।

জানতে চাইলে ডিএমপি তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (ট্রাফিক) এস এম শামীম বলেন, পুলিশকে হেয় করার জন্য এই প্রচারটা চলেই আসছে। পুলিশ ইচ্ছা করে মামলা দেয় না। পুলিশ মামলা থেকে কমিশন পায় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মামলা থেকে আদায় হওয়া জরিমানা থেকে কমিশন পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা পুলিশে নেই। সেটা থাকলে সার্জেন্টরা দিনভর শুধু মামলাই দিত।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ট্রাফিক) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. মুনিবুর রহমান বলেন, মামলার কোনো টাকা ট্রাফিক পায় না। সড়কে আইন অমান্য করায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়, তারা প্রায় মন্তব্য করেন, ওই মামলা থেকে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা টাকা পান। সাধারণ মানুষের এমন অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।

তিনি বলেন, ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে পিওএস মেশিনে মামলা দিলে তা অনলাইন সিস্টেমে চলে যায়। মামলা থেকে পার্সেন্টেজের কোনো সুযোগ নেই। জরিমানার টাকা সরাসরি সরকারের তহবিলে জমা হয়।

Tag :
জনপ্রিয়

হোসেনপুর বাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যাবসায়িকদের উদ্যোগে বস্ত্র বিতরণ

রাজধানীতে যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে ট্রাফিকের মামলা

প্রকাশের সময় : ১০:৪৭:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২

‘মিরপুর থেকে কাওয়ান বাজার পর্যন্ত এসেছি। তিনবার রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র চেক করেছে ট্রাফিক পুলিশ। ট্রাফিক পুলিশ বিভিন্ন অজুহাতে মামলা দেয়, যার কারণে আমরা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই।’ কথাগুলো বলছিলেন, লাব্বাইক পরিবহনের কন্ডাক্টর ফিরোজ হোসেন।

রাস্তায় যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দেয়। একই অভিযোগ শিকড় পরিবহনের চালক জয়নাল হোসেনেরও। যানবাহনের চালকদের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশ কমিশনের আশায় বেশি বেশি মামলা দিচ্ছে। অবশ্য ট্রাফিক পুলিশ বলছে, এখানে ট্রাফিক পুলিশের কমিশন নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জরিমানার অর্থের পুরোটাই যায় সরকারের কোষাগারে।

ট্রাফিক বিভাগ বলছে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও মোটরযান আইন যথাযথ বাস্তবায়নে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারী চালক ও গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা-জরিমানা হয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই। সড়কে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে অকারণেই ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দোষী হতে হচ্ছে। চালকরা ভাবেন, ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা জরিমানার ভাগের জন্য তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেন।

জানা যায়, হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার, ট্রাফিক পুলিশের আদেশ অমান্য করা ও বাধা সৃষ্টি এবং তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, হেলমেট না পরে মোটরসাইকেল চালানো, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা, গাড়ির কাগজ আপডেট না থাকাসহ এমন অপরাধে মোটরযান আইনে মামলা হয়। এ ছাড়া গাড়ি চলন্ত অবস্থায় কালো ধোঁয়া বের হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা করতে পারেন।

ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সর্বোচ্চ মামলা হয় ডিএমপিতে। মামলার সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৫ হাজার ৯১১টি। এসব মামলায় জরিমানা আদায় হয় ৫০ কোটি ৯৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩০৩ টাকা। একই বছরে সারাদেশে মোটরযান আইনে মামলা হয়েছে মোট ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৯১২টি। এসব মামলায় ২২১ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার ৪১৪ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

আর ২০২০ সালে সারাদেশে মোটরযান আইনে মোট মামলার সংখ্যা ৬ লাখ ১৩ হাজার ১৯টি। জরিমানার পরিমাণ ৭৭ কোটি ২৭ লাখ ৮৬ হাজার ২৫৬ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সারাদেশে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ৮৯৩টি। আর জরিমানা আদায় বেড়েছে ১৪৩ কোটি ৭৯ লাখ ৪৫ হাজার ১৫৮ টাকা।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বলছে, শুধু ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের দায়ের করা মামলায় আদায় করা জরিমানা থেকে প্রতি মাসে সরকারের কোষাগারে জমা পাঁচ কোটি টাকারও বেশি।

গাড়ি চালকদের অভিযোগ, মামলা দেওয়ার জন্য ট্রাফিক পুলিশ পাগল হয়ে যায়। এসব মামলা থেকে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা টাকা পান বা কমিশন পান। এজন্য তারা গাড়ি ধরার পর মামলার জন্য বেপরোয়া হয়ে যান।

রাজধানীর বাংলামটর মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের মামলার শিকার হওয়া মোটরসাইকেল চালক ইব্রাহীম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি গত মাসে ৫ হাজার টাকার মামলা খেয়েছি।’ কীভাবে এই মামলায় পড়লেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে রাস্তায় পুলিশ দাঁড়িয়ে বলল, কাগজ দেন, এরপর আমি কাগজ দেওয়ার পরে বলে পেছনের লোক হেলমেট খুলে বসে আছে, মাথায় দেয়নি এজন্য জোর করে পল্টন মোড়ে শায়রুল নামের এক ট্রাফিক সার্জেট ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে মামলা দেয়।

পাঠাও চালক ফাহাদ হোসেন বলেন, কোরবানির ঈদের পর থেকে মোট ২টা মামলা খেয়েছি। একটি মামলা ২ হাজার টাকার, অন্যটি ৫ হাজার টাকার। একটি হলো পেছনের ব্যক্তির হেলমেট ছিল না, আর অন্যটি হলো- আমার লাইসেন্স ছিল না কাছে। তিনি বলেন, লাইসেন্স হারিয়ে যাওয়ার জিডিও ছিল না কাছে, যার জন্য মূলত মামলাটি দিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট হান্নান বলেন, আমরা সহজে কাউকে মামলা দিতে চাই না। অনেক চালক সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে এবং অনিয়ম করে এজন্য আমরা মামলা দিতে বাধ্য হয়।

ফার্মগেট এলাকায় হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন তুষার হোসেন। সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট তাকে থামিয়ে দুই হাজার টাকার মামলা দেন। দ্বিতীয়বারও একইভাবে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করায় দ্বিতীয়বার একই মামলা হয় তার বিরুদ্ধে।

আজিমপুর এলাকায় কথা ২৭ নম্বর পরিবহনের চালক লাল মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, রাস্তাঘাটে শুধু ট্রাফিক পুলিশ বিরক্ত করে এবং কাগজপত্র নিয়ে বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে মামলা দেয়।

ফার্মগেটে কথা হয় স্বাধীন পরিবহনের চালক আলামিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাজধানীতে গাড়ি চালানোর কোনো পরিবেশ নেই। ট্রাফিক পুলিশের মামলায় আমরা বিরক্ত।

শিকড় পরিবহনের চালক সেলিম বলেন, ট্রাফিকের মামলায় আমরা জর্জরিত। তাদের অত্যাচারে রাস্তায় বের হওয়া যায় না। অনেক সময় যাত্রীরা হয়রানির শিকার হয়। তিনি বলেন, যদিও আমাদের কাগজপত্র সব সঠিক আছে। তারপরও ট্রাফিক রাস্তায় ধরে সময় নষ্ট করে।

বাংলামোটর মোড়ে কথা হয় বিহঙ্গ পরিবহন লিমিটেডের চালক আশরাফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি ঢাকা প্রকাশ-কে বলেন, ট্রাফিকের অত্যাচারে জর্জরিত আমরা। তারা অনেক সময় আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে এবং মামলা দেয়। শুধু আমি না ট্রাফিকের মামলায় জর্জরিত অসংখ্য চালক। আপনি এ মামলার বিষয়টি নিয়ে চালকদের সঙ্গে কথা বলে দেখেন আমি সত্য বলছি না মিথ্যা বলছি। বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর জানা উচিত।

অবশ্য ফার্মগেটে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, চালকেরা অন্যায় বা অনিয়ম করলে আমরা মামলা দিয়ে থাকি।

ট্রাফিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ করলে তো ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি ধরবেই। নতুন আইনে মামলায় জরিমানার অঙ্ক অনেক বেড়েছে।

শাহাবাগে ডিউটিরত ট্রাফিক পুলিশের সার্জন্টে খায়রুল আলম বলেন, সরকারের অন্যান্য সংস্থা কোনোকিছু উদ্ধার করলে সেখান থেকে ৩০ শতাংশ পায়। সেটা সংশ্লিষ্ট সংস্থা তাদের খরচ বাবদ দেখাতে পারে। কিন্তু ট্রাফিক বিভাগে এমন কিছু নেই। মামলায় যদি ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের কমিশন দেওয়া হতো তাহলে আমরা শুধু মামলাই দিয়ে যেতাম। এতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মামলা দেওয়ার প্রতিযোগিতা বেড়ে যেত।

শুলশানে কথা হয় ট্রাফিক পুলিশের সদস্য সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে। এসময় তিনি বলেন, অধিকাংশ গাড়িতেই কিছু না কিছু ত্রুটি থাকে। প্রতিদিন একশো গাড়ি ধরলে ইচ্ছা করলে ৫০ শতাংশের বেশি যানবাহনে মামলা দেওয়া যায়। কিন্তু এভাবে মামলা দিলে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।

জানতে চাইলে ডিএমপি তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (ট্রাফিক) এস এম শামীম বলেন, পুলিশকে হেয় করার জন্য এই প্রচারটা চলেই আসছে। পুলিশ ইচ্ছা করে মামলা দেয় না। পুলিশ মামলা থেকে কমিশন পায় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মামলা থেকে আদায় হওয়া জরিমানা থেকে কমিশন পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা পুলিশে নেই। সেটা থাকলে সার্জেন্টরা দিনভর শুধু মামলাই দিত।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ট্রাফিক) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. মুনিবুর রহমান বলেন, মামলার কোনো টাকা ট্রাফিক পায় না। সড়কে আইন অমান্য করায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়, তারা প্রায় মন্তব্য করেন, ওই মামলা থেকে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা টাকা পান। সাধারণ মানুষের এমন অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।

তিনি বলেন, ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে পিওএস মেশিনে মামলা দিলে তা অনলাইন সিস্টেমে চলে যায়। মামলা থেকে পার্সেন্টেজের কোনো সুযোগ নেই। জরিমানার টাকা সরাসরি সরকারের তহবিলে জমা হয়।