ঢাকা ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

লাইসেন্সবিহীন স্টেশনে মিলছে গ্যাস!

রাজধানীর প্রায় সব এলাকায় চলছে গ্যাস সংকট। অনেক এলাকায় চুলা জ্বলছে না বললেই চলে। কিন্তু লাইসেন্সবিহীন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস মিলছে। অবৈধ স্টেশনগুলোতে সমঝোতার মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তিতাসের কর্মকর্তারা। অবৈধ সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন তা বন্ধে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন থেকে আট দফায় চিঠি দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তিতাস।

রাষ্ট্রীয় এ কোম্পানিটির দুর্নীতির বিষয়ে দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) সার্বিক অনুসন্ধান পরিচালনা করে। দুদকের এপ্রিলে প্রকাশিত ওই রিপোর্টে তিতাসের দুর্নীতির ২২টি খাত চিহ্নিত করে এর মধ্যে ১২ দফা সুপারিশ প্রদান করে। তারপরও থেমে নেই দুর্নীতি। বিইআরসির আদেশ ছাড়াই প্রি-পেইড মিটারের মাসিক ভাড়া ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করেছেন। পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা মূল্যে যে প্রি-পেইড মিটার পাওয়া যেতো, সেই মিটার ২৩ হাজার টাকা করে ক্রয় করা হয়েছে।

তিতাস গ্যাসের অনৈতিক আবদার অবহেলা করে আইন দেখাতে গিয়েছেন তো আপনি শেষ। শিল্পকারখানা চালানো তো দূরের কথা নিজের মূলধন রক্ষা করা কঠিন। তিতাসের এমনই গ্যাঁড়াকলে পড়ে অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ রোষানলে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে রয়েছেন। তিতাস গ্যাসে সেবার মান বাড়েনি। বাড়ছে শুধু গ্রাহকদের হয়রানি। পেট্রোবাংলার এক প্রতিবেদন সূত্রে এমনটাই জানা গেছে।

বিইআরসির সদস্য মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, বিইআরসি আইন-২০০৩ ও গ্যাস আইন-২০১০ অনুযায়ী বিইআরসির লাইসেন্স ছাড়া সিএনজি স্টেশন পরিচালনা করার কোনো ?সুযোগ নেই। লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে শতাধিক ফিলিং স্টেশন। ওইসব সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২০১৪ সালে প্রথম চিঠি দেয়া হয়। এরপরও দফায় দফায় চিঠি দেয়া হলেও তিতাসের সাড়া মিলছে না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, কদিন আগেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিবহনে অরাজকতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, রাজধানীর বাসাবাড়িতে গ্যাসের তীব্র সংকট। চুলা জ্বলছে টিমটিম করে, অনেক এলাকায় চুলা জ্বলছে না বললেই চলে। গ্যাসের সংকট দূর করতে মাসের পর মাস গ্যাস সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের আশ্বস্ত করলেও সুফল আসছে না। অথচ লাইসেন্সবিহীন সিএনজি ফিলিং স্টেশন গ্যাস সরবরাহ করে সমঝোতার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তিতাসের কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশীদ মোল্লাহ বলেন, আমরা চিঠি দিয়েছি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। তাদেরকে ১০ দিনের সময় দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে লাইসেন্স না নিলে লাইন কেটে দেয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৪ সাল থেকে আট দফায় চিঠি দিয়েছে। বিইআরসি নিজেও তো লাইন কাটতে পারে, আমাদের ওপর ঠেলে দেয় কেন। তিতাস গ্যাস হচ্ছে বিতরণ কোম্পানি, বিইআরসি কি পারে লাইন কাটতে এমন প্রশ্নের জবাবে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, তারা তো জরিমানা করতে পারে। জরিমানা করে না কেন। এখন মামলাও করা হচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তা মিথ্যা বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চিঠিতে বলা হয়, আপনাকে সর্বশেষ চিঠি দেয়া হয় চলতি বছরের ২০ জুন। স্মারক-২৭১৯-তে বলা হয়, এর আগে একই ইস্যুতে ২০২১ সালে তিন দফায় চিঠি গত ২৭ জানুয়ারি, ২১ জুন ও ২১ সেপ্টেম্বর দেয়া হয়েছিল, তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। গত ২০২০, ২০১৮ ও ২০১৫ সালেও চিঠি দেয়া হয়। এরপরও তিতাস গ্যাস কোনো উদ্যোগ নেয়নি। যে কারণে বেআইনিভাবে শতাধিক সিএনজি ফিলিং স্টেশন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানিটির অধীনে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন রয়েছে ৩৯৬টি।

রেগুলেটরি কমিশনের আইন ২০০৩ এর ধারা ২৭(১) অনুযায়ী সিএনজি মজুতকরণ ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিইআরসি থেকে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক। তাছাড়া গ্যাস আইন-২০১০ এর ধারা ৮(১) অনুযায়ী কমিশনের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণপূর্বক সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনের ব্যবসা শুরু করতে পারবে মর্মে নির্দেশনা রয়েছে। ফলে অনেক সিএনজি ব্যবসায়ী লাইসেন্স গ্রহণ করলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যবসায়ী লাইসেন্স গ্রহণ করেননি। যা বিইআরসি ও গ্যাস আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যা একই আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

চিঠির সঙ্গে ঢাকার ৪০টি, নারায়ণগঞ্জের ১৫টি, নরসিংদীর ১০টি, গাজীপুরের ১০টি, মুন্সীগঞ্জের দুটিসহ তিতাসের মোট ৭৯টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের নাম উল্লেখ করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। তারপরও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছে বিইআরসির কর্মকর্তারা। তিতাস গ্যাস এখন দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাস সংযোগ বন্ধে সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

পূর্বের সংযোগে ঢালাওভাবে লোড বৃদ্ধিসহ নতুন নতুন সংযোগ প্রদান করে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তিতাসের বিরুদ্ধে। এতে করে সরকার দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, দুই গ্যাসের অপচয়। ক্যাপটিভে এক মিলিয়ন গ্যাস দিয়ে চার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। একই পরিমাণ গ্যাস কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা গেলে ছয় মেগাওয়ার্ট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।

আয়মান টেক্সটাইল অ্যান্ড হোসিয়ারি লিমিটেড। তিতাসের ওই শিল্প গ্রাহকের ঘটনা কল্প কাহিনীকেও হার মানায়। কোম্পানিটির আইনজীবী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম সরকার বলেন, ঘটনা ২০১৫ সালের দিকে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ঠিকমতো বয়লার ও জেনারেটর চালানো যাচ্ছিল না। কোম্পানির পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও তিতাস কোনো প্রতিকারের ?উদ্যোগ নেয়নি। ওই সময় কোম্পানিটি কারখানা ঠিকমতো চালাতে ব্যর্থ হয়।

এতে করে বায়ারকে ঠিকমতো অর্ডার সাপ্লাই দিতে না পেরে রুগ্ন হয়ে পড়ে। এ কারণে গ্যাস বিল বকেয়ার কারণে ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। আমরা যখন কিস্তি করে দেয়ার প্রস্তাব দেই তখন তারা এতে সাড়া দেয়নি। কয়েক দফায় আবেদন দিলেও তারা তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। তিতাস ১২ শতাংশ সারচার্জসহ বিলম্ব মাশুল ছয় কোটি ৪১ লাখ একবারে দেয়ার নির্দেশ দেয়। আমরা বাধ্য হয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হই।

হাইকোর্ট ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর একটি আদেশ জারি করে, এতে প্রথম কিস্তিতে এক কোটি টাকা ও অবশিষ্ট বকেয়া প্রতিমাসের বিলের সঙ্গে ২০ লাখ টাকার কিস্তিতে গ্রহণের নির্দেশ দেয়। আমরা পরদিনই টাকা দেয়ার জন্য তিতাসের কাছে গেলে তারা গ্রহণ করেনি। উল্টো তারা আপিল করে, সেখানে প্রায় বছরখানেক বিষয়টি পড়ে থাকে।

পরে আপিল বিভাগ প্রথম কিস্তি এক কোটি টাকা অপরিবর্তিত রেখে মাসিক কিস্তির অংক ৪০ লাখ টাকা করে দেয়। এবার কোর্টের মাধ্যমে এক কোটি টাকা জমা দেয়ার উদ্যোগ নিলে তারা উল্টো গিয়ে রিভিউ আবেদন করে। শেষে রিভিউয়েও হেরে যায় তিতাস। এক কোটি টাকা জমা দিয়ে দুই মাস আগে সংযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু এবার দেখেন তাদের নতুন হয়রানি।

মাসিক বিলের সঙ্গে প্রথম মাসে ২৮ লাখ ৩১ হাজার ২৬৬ টাকা ও দ্বিতীয় মাসে ২৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা ৩৭ টাকা সারচার্জ দাবি করে। বিল অনাদায়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করারও হুমকি দেয়। আমরা তিতাসের এমডি বরাবর চিঠি দিয়ে সারচার্জের কারণ জানতে চাই। কোনো সদুত্তর পাইনি। বাধ্য হয়ে লিখিত চিঠি দিলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। এরপর তিন দিনের সময় দিয়ে লিগ্যাল নোটিস দিয়েছি। সেই নোটিসেরও কোনো জবাব দেয়নি। মৌখিকভাবে জানতে পেরেছি ওই ৫২ লাখ টাকা হচ্ছে বকেয়া বিলের সারচার্জ। অথচ বকেয়া ছয় কোটি ৪১ লাখ টাকা সারচার্জসহ এসেছে। সারচার্জের ওপর সারচার্জ হয় নাকি। হাইকোর্ট টাকার অংক চূড়ান্ত করে দিয়েছে। সেই অর্ডারও মানতে চায় না তিতাস।

গ্যাস বিতরণের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় এই কোম্পানিটির এমন সব দুর্নীতি সামনে এসেছে যা পুরোপুরি অভিনব ও কল্পনাতীত। বৈধ সংযোগ বন্ধ ঘোষণা করলেও তখনো সংযোগ দেয়া হয়েছে। আবার সেসব গ্রাহকের আস্থা সৃষ্টি করার জন্য ভুয়া কাগজপত্র তুলে দেয়া হয়। ভুয়া ওই গ্রাহকরা যথারীতি পে-স্লিপের মাধ্যমে ব্যাংকে ১০০ কোটি টাকা জমা করেন। তিতাসের আবাসিক গ্রাহকরা যেসব ব্যাংকে প্রতি মাসে গ্যাসের বিল জমা দেন, সেই ব্যাংকগুলো থেকে ওই বাড়তি টাকার হিসাব কোম্পানির কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগে আসে। কিন্তু এই টাকা তিতাসের হিসাবে জমা দিতে না পেরে পোস্টিং না হওয়ায় বেকায়দায় পড়ে তিতাস।

আরেকটি অভিনব ঘটনা ঘটে, গভীর রাতে সার্ভারে ঢুকে অবৈধ গ্রাহককে বৈধ করার। রাতের আঁধারে কোম্পানির সার্ভারে এন্ট্রি দিয়ে বৈধ করার দায়ে আট কর্মকর্তা-কর্মচারী ধরা পড়ে। আবার এমন ঘটনা ঘটেছে গ্রাহকরা বিল জমা দিয়েছেন কিন্তু সেই বিল জমা হয়নি লেজারে। কিছু অসাধু কর্মকর্তা গ্রাহকদের এসব টাকা মেরে দিয়েছেন।

গত ২৫ মে পাঠানো সেই বিজ্ঞপ্তিতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর বাঘাবন্দি (বাঘাইয়াকান্দি) গ্রামের নাম লেখা হয়। কিন্তু গ্রামবাসী দাবি করেছেন তাদের এলাকায় কখনো লাইন ছিল না। তাহলে কাটল কিভাবে। এই ঘটনায় বেশ হাস্যকর ঘটনার জন্ম দেয়।

আয়মান টেক্সটাইল অ্যান্ড হোসিয়ারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাহাউদ্দিন মাহমুদ ইউসুফ বলেন, বলার ভাষা নেই। আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়া হয়েছে। কোর্টের মীমাংসিত বিষয়ে আবার প্যাঁচ লাগিয়ে দিয়েছে।

একজন শিল্প গ্রাহক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তার মিটারে সমস্যা দেখা দিলে তিতাস গ্যাসকে অবহিত করেন। একাধিক দফায় যোগাযোগ করার পর দুই মাস পর তারা এসে মিটার খুলে নিয়ে যান। আর সেই মিটার পরীক্ষা করতে সময় নেন ছয় মাস। তাহলে বুঝতে পারছেন তাদের সেবার নমুনা।

Tag :
জনপ্রিয়

সাটুরিয়ায় নিয়োগ বাতিলের দাবীতে মানববন্ধন

লাইসেন্সবিহীন স্টেশনে মিলছে গ্যাস!

প্রকাশের সময় : ১১:১১:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

রাজধানীর প্রায় সব এলাকায় চলছে গ্যাস সংকট। অনেক এলাকায় চুলা জ্বলছে না বললেই চলে। কিন্তু লাইসেন্সবিহীন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস মিলছে। অবৈধ স্টেশনগুলোতে সমঝোতার মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তিতাসের কর্মকর্তারা। অবৈধ সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন তা বন্ধে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন থেকে আট দফায় চিঠি দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তিতাস।

রাষ্ট্রীয় এ কোম্পানিটির দুর্নীতির বিষয়ে দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) সার্বিক অনুসন্ধান পরিচালনা করে। দুদকের এপ্রিলে প্রকাশিত ওই রিপোর্টে তিতাসের দুর্নীতির ২২টি খাত চিহ্নিত করে এর মধ্যে ১২ দফা সুপারিশ প্রদান করে। তারপরও থেমে নেই দুর্নীতি। বিইআরসির আদেশ ছাড়াই প্রি-পেইড মিটারের মাসিক ভাড়া ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করেছেন। পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা মূল্যে যে প্রি-পেইড মিটার পাওয়া যেতো, সেই মিটার ২৩ হাজার টাকা করে ক্রয় করা হয়েছে।

তিতাস গ্যাসের অনৈতিক আবদার অবহেলা করে আইন দেখাতে গিয়েছেন তো আপনি শেষ। শিল্পকারখানা চালানো তো দূরের কথা নিজের মূলধন রক্ষা করা কঠিন। তিতাসের এমনই গ্যাঁড়াকলে পড়ে অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ রোষানলে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে রয়েছেন। তিতাস গ্যাসে সেবার মান বাড়েনি। বাড়ছে শুধু গ্রাহকদের হয়রানি। পেট্রোবাংলার এক প্রতিবেদন সূত্রে এমনটাই জানা গেছে।

বিইআরসির সদস্য মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, বিইআরসি আইন-২০০৩ ও গ্যাস আইন-২০১০ অনুযায়ী বিইআরসির লাইসেন্স ছাড়া সিএনজি স্টেশন পরিচালনা করার কোনো ?সুযোগ নেই। লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে শতাধিক ফিলিং স্টেশন। ওইসব সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২০১৪ সালে প্রথম চিঠি দেয়া হয়। এরপরও দফায় দফায় চিঠি দেয়া হলেও তিতাসের সাড়া মিলছে না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, কদিন আগেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিবহনে অরাজকতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, রাজধানীর বাসাবাড়িতে গ্যাসের তীব্র সংকট। চুলা জ্বলছে টিমটিম করে, অনেক এলাকায় চুলা জ্বলছে না বললেই চলে। গ্যাসের সংকট দূর করতে মাসের পর মাস গ্যাস সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের আশ্বস্ত করলেও সুফল আসছে না। অথচ লাইসেন্সবিহীন সিএনজি ফিলিং স্টেশন গ্যাস সরবরাহ করে সমঝোতার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তিতাসের কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশীদ মোল্লাহ বলেন, আমরা চিঠি দিয়েছি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। তাদেরকে ১০ দিনের সময় দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে লাইসেন্স না নিলে লাইন কেটে দেয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৪ সাল থেকে আট দফায় চিঠি দিয়েছে। বিইআরসি নিজেও তো লাইন কাটতে পারে, আমাদের ওপর ঠেলে দেয় কেন। তিতাস গ্যাস হচ্ছে বিতরণ কোম্পানি, বিইআরসি কি পারে লাইন কাটতে এমন প্রশ্নের জবাবে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, তারা তো জরিমানা করতে পারে। জরিমানা করে না কেন। এখন মামলাও করা হচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তা মিথ্যা বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চিঠিতে বলা হয়, আপনাকে সর্বশেষ চিঠি দেয়া হয় চলতি বছরের ২০ জুন। স্মারক-২৭১৯-তে বলা হয়, এর আগে একই ইস্যুতে ২০২১ সালে তিন দফায় চিঠি গত ২৭ জানুয়ারি, ২১ জুন ও ২১ সেপ্টেম্বর দেয়া হয়েছিল, তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। গত ২০২০, ২০১৮ ও ২০১৫ সালেও চিঠি দেয়া হয়। এরপরও তিতাস গ্যাস কোনো উদ্যোগ নেয়নি। যে কারণে বেআইনিভাবে শতাধিক সিএনজি ফিলিং স্টেশন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানিটির অধীনে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন রয়েছে ৩৯৬টি।

রেগুলেটরি কমিশনের আইন ২০০৩ এর ধারা ২৭(১) অনুযায়ী সিএনজি মজুতকরণ ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিইআরসি থেকে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক। তাছাড়া গ্যাস আইন-২০১০ এর ধারা ৮(১) অনুযায়ী কমিশনের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণপূর্বক সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনের ব্যবসা শুরু করতে পারবে মর্মে নির্দেশনা রয়েছে। ফলে অনেক সিএনজি ব্যবসায়ী লাইসেন্স গ্রহণ করলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যবসায়ী লাইসেন্স গ্রহণ করেননি। যা বিইআরসি ও গ্যাস আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যা একই আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

চিঠির সঙ্গে ঢাকার ৪০টি, নারায়ণগঞ্জের ১৫টি, নরসিংদীর ১০টি, গাজীপুরের ১০টি, মুন্সীগঞ্জের দুটিসহ তিতাসের মোট ৭৯টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের নাম উল্লেখ করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। তারপরও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছে বিইআরসির কর্মকর্তারা। তিতাস গ্যাস এখন দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাস সংযোগ বন্ধে সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

পূর্বের সংযোগে ঢালাওভাবে লোড বৃদ্ধিসহ নতুন নতুন সংযোগ প্রদান করে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তিতাসের বিরুদ্ধে। এতে করে সরকার দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, দুই গ্যাসের অপচয়। ক্যাপটিভে এক মিলিয়ন গ্যাস দিয়ে চার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। একই পরিমাণ গ্যাস কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা গেলে ছয় মেগাওয়ার্ট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।

আয়মান টেক্সটাইল অ্যান্ড হোসিয়ারি লিমিটেড। তিতাসের ওই শিল্প গ্রাহকের ঘটনা কল্প কাহিনীকেও হার মানায়। কোম্পানিটির আইনজীবী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম সরকার বলেন, ঘটনা ২০১৫ সালের দিকে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ঠিকমতো বয়লার ও জেনারেটর চালানো যাচ্ছিল না। কোম্পানির পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও তিতাস কোনো প্রতিকারের ?উদ্যোগ নেয়নি। ওই সময় কোম্পানিটি কারখানা ঠিকমতো চালাতে ব্যর্থ হয়।

এতে করে বায়ারকে ঠিকমতো অর্ডার সাপ্লাই দিতে না পেরে রুগ্ন হয়ে পড়ে। এ কারণে গ্যাস বিল বকেয়ার কারণে ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। আমরা যখন কিস্তি করে দেয়ার প্রস্তাব দেই তখন তারা এতে সাড়া দেয়নি। কয়েক দফায় আবেদন দিলেও তারা তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। তিতাস ১২ শতাংশ সারচার্জসহ বিলম্ব মাশুল ছয় কোটি ৪১ লাখ একবারে দেয়ার নির্দেশ দেয়। আমরা বাধ্য হয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হই।

হাইকোর্ট ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর একটি আদেশ জারি করে, এতে প্রথম কিস্তিতে এক কোটি টাকা ও অবশিষ্ট বকেয়া প্রতিমাসের বিলের সঙ্গে ২০ লাখ টাকার কিস্তিতে গ্রহণের নির্দেশ দেয়। আমরা পরদিনই টাকা দেয়ার জন্য তিতাসের কাছে গেলে তারা গ্রহণ করেনি। উল্টো তারা আপিল করে, সেখানে প্রায় বছরখানেক বিষয়টি পড়ে থাকে।

পরে আপিল বিভাগ প্রথম কিস্তি এক কোটি টাকা অপরিবর্তিত রেখে মাসিক কিস্তির অংক ৪০ লাখ টাকা করে দেয়। এবার কোর্টের মাধ্যমে এক কোটি টাকা জমা দেয়ার উদ্যোগ নিলে তারা উল্টো গিয়ে রিভিউ আবেদন করে। শেষে রিভিউয়েও হেরে যায় তিতাস। এক কোটি টাকা জমা দিয়ে দুই মাস আগে সংযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু এবার দেখেন তাদের নতুন হয়রানি।

মাসিক বিলের সঙ্গে প্রথম মাসে ২৮ লাখ ৩১ হাজার ২৬৬ টাকা ও দ্বিতীয় মাসে ২৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা ৩৭ টাকা সারচার্জ দাবি করে। বিল অনাদায়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করারও হুমকি দেয়। আমরা তিতাসের এমডি বরাবর চিঠি দিয়ে সারচার্জের কারণ জানতে চাই। কোনো সদুত্তর পাইনি। বাধ্য হয়ে লিখিত চিঠি দিলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। এরপর তিন দিনের সময় দিয়ে লিগ্যাল নোটিস দিয়েছি। সেই নোটিসেরও কোনো জবাব দেয়নি। মৌখিকভাবে জানতে পেরেছি ওই ৫২ লাখ টাকা হচ্ছে বকেয়া বিলের সারচার্জ। অথচ বকেয়া ছয় কোটি ৪১ লাখ টাকা সারচার্জসহ এসেছে। সারচার্জের ওপর সারচার্জ হয় নাকি। হাইকোর্ট টাকার অংক চূড়ান্ত করে দিয়েছে। সেই অর্ডারও মানতে চায় না তিতাস।

গ্যাস বিতরণের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় এই কোম্পানিটির এমন সব দুর্নীতি সামনে এসেছে যা পুরোপুরি অভিনব ও কল্পনাতীত। বৈধ সংযোগ বন্ধ ঘোষণা করলেও তখনো সংযোগ দেয়া হয়েছে। আবার সেসব গ্রাহকের আস্থা সৃষ্টি করার জন্য ভুয়া কাগজপত্র তুলে দেয়া হয়। ভুয়া ওই গ্রাহকরা যথারীতি পে-স্লিপের মাধ্যমে ব্যাংকে ১০০ কোটি টাকা জমা করেন। তিতাসের আবাসিক গ্রাহকরা যেসব ব্যাংকে প্রতি মাসে গ্যাসের বিল জমা দেন, সেই ব্যাংকগুলো থেকে ওই বাড়তি টাকার হিসাব কোম্পানির কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগে আসে। কিন্তু এই টাকা তিতাসের হিসাবে জমা দিতে না পেরে পোস্টিং না হওয়ায় বেকায়দায় পড়ে তিতাস।

আরেকটি অভিনব ঘটনা ঘটে, গভীর রাতে সার্ভারে ঢুকে অবৈধ গ্রাহককে বৈধ করার। রাতের আঁধারে কোম্পানির সার্ভারে এন্ট্রি দিয়ে বৈধ করার দায়ে আট কর্মকর্তা-কর্মচারী ধরা পড়ে। আবার এমন ঘটনা ঘটেছে গ্রাহকরা বিল জমা দিয়েছেন কিন্তু সেই বিল জমা হয়নি লেজারে। কিছু অসাধু কর্মকর্তা গ্রাহকদের এসব টাকা মেরে দিয়েছেন।

গত ২৫ মে পাঠানো সেই বিজ্ঞপ্তিতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর বাঘাবন্দি (বাঘাইয়াকান্দি) গ্রামের নাম লেখা হয়। কিন্তু গ্রামবাসী দাবি করেছেন তাদের এলাকায় কখনো লাইন ছিল না। তাহলে কাটল কিভাবে। এই ঘটনায় বেশ হাস্যকর ঘটনার জন্ম দেয়।

আয়মান টেক্সটাইল অ্যান্ড হোসিয়ারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাহাউদ্দিন মাহমুদ ইউসুফ বলেন, বলার ভাষা নেই। আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়া হয়েছে। কোর্টের মীমাংসিত বিষয়ে আবার প্যাঁচ লাগিয়ে দিয়েছে।

একজন শিল্প গ্রাহক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তার মিটারে সমস্যা দেখা দিলে তিতাস গ্যাসকে অবহিত করেন। একাধিক দফায় যোগাযোগ করার পর দুই মাস পর তারা এসে মিটার খুলে নিয়ে যান। আর সেই মিটার পরীক্ষা করতে সময় নেন ছয় মাস। তাহলে বুঝতে পারছেন তাদের সেবার নমুনা।