ঢাকা ১০:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রতীক ধ্বংসের পথে

ঝিনাইদহ শহরতলির মুরারীদাহ গ্রামে জমিদারপুত্র সেলিম চৌধুরীর ‘স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রতীক’ ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘আশরাফুন্নেসা’ ভবনটি এখন ধ্বংসের পথে। ইতিহাসের সাক্ষী এ ভবনটির দেয়ালে খোদাই করে নানা কারুকার্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাড়িটি দেখলে মনে হয় এটি নবগঙ্গা নদীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চুন-সুরকি-ইটের গাঁথুনিতে নির্মাণ করা বাড়িটির দেয়াল ২৫ ইঞ্চি পুরু। উত্তর-দক্ষিণে দৈর্ঘ্য ৮২ ফুট, পূর্ব-পশ্চিমে ৬৬ ফুট। এ ভবনে ছোট-বড় ১৬টি কক্ষ রয়েছে। দ্বিতীয় তলার ছাদের ওপর রয়েছে চিলেকোঠা। শ্বেতপাথরে আচ্ছাদিত চিলেকোঠা নামাজ ঘর হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল বলে ধারণা। ঐতিহ্যবাহী এ বাড়িটি এ পর্যন্ত সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

কথিত আছে, বাংলা ১২২৯ সালের দিকে বাড়িটির নির্মাণ শুরু হয়। সাত বছর ধরে ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। এ ভবনটি ঝিনাইদহবাসীর কাছে মিয়ার দালান নামে পরিচিত। সেলিম চৌধুরী তার স্ত্রী আশরাফুন্নেসার নামে বাড়িটির নামকরণ করেন। বাড়িটির দক্ষিণে দুইতলার বারান্দাটি নদীর মধ্য পর্যন্ত বিস্তৃৃত ছিল। এটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অপরূপ কারুকার্য খচিত দ্বিতল ভবনটি ওই সময়কার নির্মাণশৈলীর এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
কথিত আছে, সেলিম চৌধুরী মাগুরা জেলার শ্রীপুরের এক অঞ্চলের জমিদারের পুত্র ছিলেন। তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী এক সুন্দরীর প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করেন। পরিবার এ বিয়ে মেনে না নিয়ে বাড়ি থেকে তাকে বের করে দেয়। মনের দুঃখে তিনি গভীর রাতে স্ত্রীকে নিয়ে বজরা যোগে নবগঙ্গা নদী দিয়ে কলকাতার উদ্দেশে নিজ ভূমি ত্যাগ করেন। পথে মুরারীদাহ গ্রামে এসে এলাকাটি তার পছন্দ হয়। তিনি সেখানে স্থায়ী বসবাসের চিন্তায় নদীর মধ্য ও উত্তরপাড়ে ভবনটি নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি ও তার স্ত্রী আমৃত্যু বাস করেছেন। তাদের কোনো সন্তান ছিল না। এ বাড়িতে তাদের দুজনের কবরস্থান রয়েছে। সেলিম চৌধুরীর স্ত্রী নাম ছিল মুরারী। পরে ধর্মান্তরিত হলে নাম হয় আশরাফুন্নেসা। সেলিম চৌধুরী স্ত্রীর নামে গ্রামের নাম ‘মুরারীদাহ’ করেন। স্ত্রী মুরারীর প্রতি ভালোবাসার প্রতীক এই বাড়িটির নাম দেন ‘আশরাফুন্নেসা’ ভবন। যা এখন কালের সাক্ষী হয়ে আছে। বাড়িটি ভগ্নপ্রায়। এটা ঝিনাইদহ জেলার দর্শনীয় স্থান ও ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রতিদিন এ বাড়িটি দেখতে শত শত লোক ভিড় জমায়। পয়লা বৈশাখ, ইংরেজি নববর্ষ, ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ৩০-৩৫ হাজার লোকের সমাগম হয়। এ ছাড়াও বিশেষ কোনো উপলক্ষে লোকজন এ বাড়িতে ভিড় করেন। বাড়িটি ফিরোজ নামে এক ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করছেন। ক্রয়সূত্রে দালানটির মালিকানা ফিরোজ মিয়া দাবি করেন। বলেন, ১৯৪৭ সালে তার পিতা বদরউদ্দিন মিয়া ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে রাজিং সিংয়ের কাছ থেকে ৩২ বিঘা জমিসহ বাড়িটি কিনে নেন। তিনি আরও বলেন, এখন এই বাড়িটির সার্বিক দায়িত্বে রয়েছেন তার চাচাতো ভাই স্বপন মিয়া। তিনি ঢাকায় থাকেন। দালানটি পাহারা দেওয়ার জন্য তাকে একটি টিনশেড বাড়ি করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাড়িটি পাহারা দিয়ে আসেছি। তবে ভাই স্বপনের কাছ থেকে জেনেছি সরকার যদি মিয়ার দালানটি উপযুক্ত মূল্যে কিনে নিয়ে পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে তোলে তাতে আমাদের আপত্তি নেই।’

এলাকাবাসীর মতে, এই জমির মালিকানা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, বাড়িটি সংস্কার করে পর্যটন স্থান করা হলে সরকার অনেক রাজস্ব পাবে। তেমনি ঝিনাইদহবাসীও মনোরম একটি স্থান পাবে।

Tag :
জনপ্রিয়

রামপালে বিএনপির ২০ নেতাকর্মীর নামে মামলা আটক-৬

স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রতীক ধ্বংসের পথে

প্রকাশের সময় : ১১:১০:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

ঝিনাইদহ শহরতলির মুরারীদাহ গ্রামে জমিদারপুত্র সেলিম চৌধুরীর ‘স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রতীক’ ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘আশরাফুন্নেসা’ ভবনটি এখন ধ্বংসের পথে। ইতিহাসের সাক্ষী এ ভবনটির দেয়ালে খোদাই করে নানা কারুকার্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাড়িটি দেখলে মনে হয় এটি নবগঙ্গা নদীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চুন-সুরকি-ইটের গাঁথুনিতে নির্মাণ করা বাড়িটির দেয়াল ২৫ ইঞ্চি পুরু। উত্তর-দক্ষিণে দৈর্ঘ্য ৮২ ফুট, পূর্ব-পশ্চিমে ৬৬ ফুট। এ ভবনে ছোট-বড় ১৬টি কক্ষ রয়েছে। দ্বিতীয় তলার ছাদের ওপর রয়েছে চিলেকোঠা। শ্বেতপাথরে আচ্ছাদিত চিলেকোঠা নামাজ ঘর হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল বলে ধারণা। ঐতিহ্যবাহী এ বাড়িটি এ পর্যন্ত সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

কথিত আছে, বাংলা ১২২৯ সালের দিকে বাড়িটির নির্মাণ শুরু হয়। সাত বছর ধরে ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। এ ভবনটি ঝিনাইদহবাসীর কাছে মিয়ার দালান নামে পরিচিত। সেলিম চৌধুরী তার স্ত্রী আশরাফুন্নেসার নামে বাড়িটির নামকরণ করেন। বাড়িটির দক্ষিণে দুইতলার বারান্দাটি নদীর মধ্য পর্যন্ত বিস্তৃৃত ছিল। এটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অপরূপ কারুকার্য খচিত দ্বিতল ভবনটি ওই সময়কার নির্মাণশৈলীর এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
কথিত আছে, সেলিম চৌধুরী মাগুরা জেলার শ্রীপুরের এক অঞ্চলের জমিদারের পুত্র ছিলেন। তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী এক সুন্দরীর প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করেন। পরিবার এ বিয়ে মেনে না নিয়ে বাড়ি থেকে তাকে বের করে দেয়। মনের দুঃখে তিনি গভীর রাতে স্ত্রীকে নিয়ে বজরা যোগে নবগঙ্গা নদী দিয়ে কলকাতার উদ্দেশে নিজ ভূমি ত্যাগ করেন। পথে মুরারীদাহ গ্রামে এসে এলাকাটি তার পছন্দ হয়। তিনি সেখানে স্থায়ী বসবাসের চিন্তায় নদীর মধ্য ও উত্তরপাড়ে ভবনটি নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি ও তার স্ত্রী আমৃত্যু বাস করেছেন। তাদের কোনো সন্তান ছিল না। এ বাড়িতে তাদের দুজনের কবরস্থান রয়েছে। সেলিম চৌধুরীর স্ত্রী নাম ছিল মুরারী। পরে ধর্মান্তরিত হলে নাম হয় আশরাফুন্নেসা। সেলিম চৌধুরী স্ত্রীর নামে গ্রামের নাম ‘মুরারীদাহ’ করেন। স্ত্রী মুরারীর প্রতি ভালোবাসার প্রতীক এই বাড়িটির নাম দেন ‘আশরাফুন্নেসা’ ভবন। যা এখন কালের সাক্ষী হয়ে আছে। বাড়িটি ভগ্নপ্রায়। এটা ঝিনাইদহ জেলার দর্শনীয় স্থান ও ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রতিদিন এ বাড়িটি দেখতে শত শত লোক ভিড় জমায়। পয়লা বৈশাখ, ইংরেজি নববর্ষ, ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ৩০-৩৫ হাজার লোকের সমাগম হয়। এ ছাড়াও বিশেষ কোনো উপলক্ষে লোকজন এ বাড়িতে ভিড় করেন। বাড়িটি ফিরোজ নামে এক ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করছেন। ক্রয়সূত্রে দালানটির মালিকানা ফিরোজ মিয়া দাবি করেন। বলেন, ১৯৪৭ সালে তার পিতা বদরউদ্দিন মিয়া ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে রাজিং সিংয়ের কাছ থেকে ৩২ বিঘা জমিসহ বাড়িটি কিনে নেন। তিনি আরও বলেন, এখন এই বাড়িটির সার্বিক দায়িত্বে রয়েছেন তার চাচাতো ভাই স্বপন মিয়া। তিনি ঢাকায় থাকেন। দালানটি পাহারা দেওয়ার জন্য তাকে একটি টিনশেড বাড়ি করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাড়িটি পাহারা দিয়ে আসেছি। তবে ভাই স্বপনের কাছ থেকে জেনেছি সরকার যদি মিয়ার দালানটি উপযুক্ত মূল্যে কিনে নিয়ে পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে তোলে তাতে আমাদের আপত্তি নেই।’

এলাকাবাসীর মতে, এই জমির মালিকানা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, বাড়িটি সংস্কার করে পর্যটন স্থান করা হলে সরকার অনেক রাজস্ব পাবে। তেমনি ঝিনাইদহবাসীও মনোরম একটি স্থান পাবে।