ঢাকা ০৯:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সমাজে সমুন্নত হোক গ্রামীণ নারীর অবদান

রুবেল মিয়া নাহিদ

রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে পিরোজপুর জেলার আমড়াগাছিয়া গ্রাম। আজও সেখানে তেমন আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। অধিকাংশ মানুষের পেশাই কৃষি। ইউসুফ ও তাসলিমা বেগম এই গ্রামেরই দম্পতি। দুই মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। কৃষিকাজ ছাড়াও এই পরিবারের অন্যতম আয়ের উৎস গরু ও মুরগি পালন। আয়ের এই উৎসটি গড়ে তুলেছেন তাসলিমা বেগম।

শুধু তাসলিমা বেগম নন, গ্রামীণ অধিকাংশ নারীর শ্রমই এভাবে ঘর-গৃহস্থালির আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। কৃষি উৎপাদন, গবাদি পশু ও হাঁস মুরগি পালন, সবজি ও মৎস্য চাষ, বনায়নসহ নানা কাজে পুরুষের পাশাপাশি সমান অবদান রাখছেন গ্রামীণ নারীরা। তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে। নারীদের অবদান আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। তবে পরিবার ও সমাজে এর স্বীকৃতি নেই বললেই চলে।

রাজনীতি, কৃষি, অর্থনীতি, গবেষণা থেকে শুরু করে বর্তমানে প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে গ্রামের নারীরা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণে আজ দেশের দৃশ্যপট পাল্টে দিচ্ছে। ত্বরান্বিত হচ্ছে জাতীয় উন্নয়ন। কিন্তু এখনও গ্রামে নারীদের কাজের মূল্যায়ন নেই।

গ্রামীণ অধিকাংশ নারীর শ্রমই ঘর-গৃহস্থালির আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। ছবি: লেখক

গ্রামীণ অধিকাংশ নারীর শ্রমই ঘর-গৃহস্থালির আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। ছবি: লেখক

কথায় আছে ‘যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে’। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত এই কথাটির আদি প্রেক্ষাপট জানা নেই। কিন্তু এখনকার সমাজে এটি সর্বাংশে সত্য। এ দেশের নারী সমাজ এগিয়ে চলেছে, সব ধরনের কাজেই নিজেকে সম্পৃক্ত করছে। পরিবারের অভাবশূন্য করতে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ করে চলেছে। সংসার, স্বামী-সন্তানও সামাল দিচ্ছে।

কৃষি, শিল্প ও সেবা— এই তিন খাতে বর্তমানে এক কোটি ৬৮ লাখ বাংলাদেশি নারী কাজ করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, বর্তমানে কৃষিখাতে নিয়োজিত আছেন ৯০ লাখ এর বেশি নারী। এ ছাড়া শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করেন যথাক্রমে ৪০ লাখ ৯০ হাজার ও ৩৭ লাখ নারী।

কৃষি, শিল্প ও সেবা— এই তিন খাতে বর্তমানে এক কোটি ৬৮ লাখ বাংলাদেশি নারী কাজ করছেন।

কৃষি, শিল্প ও সেবা— এই তিন খাতে বর্তমানে এক কোটি ৬৮ লাখ বাংলাদেশি নারী কাজ করছেন।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের কলকারখানায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে এক লাখ বেশি। বিভিন্ন কারখানায় বর্তমানে ২১ লাখ ১ হাজার ৮৩০ জন নারী শ্রমিক কাজ করছেন। কেবল যে আয়ের মধ্য দিয়ে নারীরা ক্ষমতায়নের জায়গায় পৌঁছাচ্ছেন, তা নয়। বাজার অর্থনীতিতে নারীরা নতুন নতুন চাহিদা তৈরিতেও অবদান রাখছেন বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই নারী। তাই তাদের বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে নারীর অবদানও সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি অর্থনীতিতে অবদান বাড়ানোর জন্য কর্মক্ষেত্রে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

পুরুষের পাশাপাশি একজন নারী শ্রমিক দিনান্তে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। ছবি: সংগৃহীত

পুরুষের পাশাপাশি একজন নারী শ্রমিক দিনান্তে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। ছবি: সংগৃহীত

গ্রামীণ নারী ও পুরুষের ওপর করা ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ১টি কাজে ব্যয় করেন ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা। পুরুষ ২ দশমিক ৭ টিতে করেন ২ দশমিক ৫ ঘণ্টা। অর্থাৎ পুরুষের তুলনায় নারী তিনগুণ কাজ করেন। তাই নারীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো আজ সময়ের দাবি।

পুরুষের পাশাপাশি একজন নারী শ্রমিক দিনান্তে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। সেই খাটুনির পর যে আয় হয়, তা দিয়ে চলে সংসারের চাকা। গতি পায় আমাদের দেশের অর্থনীতিও। কঠিন পরিশ্রমের পর দিনশেষে তারা যেন স্বপ্ন বুনে চলেন, সমাজে সমুন্নত হবে তাদের অবদান। হোক এমন কিছুই, যেভাবে সকল নারীর শ্রমই মূল্যায়িত হবে সমাজের চোখে।

Tag :
জনপ্রিয়

করোনা মোকাবিলার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্যখাতের মানোন্নয়ন করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

সমাজে সমুন্নত হোক গ্রামীণ নারীর অবদান

প্রকাশের সময় : ১০:৫২:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

রুবেল মিয়া নাহিদ

রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে পিরোজপুর জেলার আমড়াগাছিয়া গ্রাম। আজও সেখানে তেমন আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। অধিকাংশ মানুষের পেশাই কৃষি। ইউসুফ ও তাসলিমা বেগম এই গ্রামেরই দম্পতি। দুই মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। কৃষিকাজ ছাড়াও এই পরিবারের অন্যতম আয়ের উৎস গরু ও মুরগি পালন। আয়ের এই উৎসটি গড়ে তুলেছেন তাসলিমা বেগম।

শুধু তাসলিমা বেগম নন, গ্রামীণ অধিকাংশ নারীর শ্রমই এভাবে ঘর-গৃহস্থালির আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। কৃষি উৎপাদন, গবাদি পশু ও হাঁস মুরগি পালন, সবজি ও মৎস্য চাষ, বনায়নসহ নানা কাজে পুরুষের পাশাপাশি সমান অবদান রাখছেন গ্রামীণ নারীরা। তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে। নারীদের অবদান আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। তবে পরিবার ও সমাজে এর স্বীকৃতি নেই বললেই চলে।

রাজনীতি, কৃষি, অর্থনীতি, গবেষণা থেকে শুরু করে বর্তমানে প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে গ্রামের নারীরা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণে আজ দেশের দৃশ্যপট পাল্টে দিচ্ছে। ত্বরান্বিত হচ্ছে জাতীয় উন্নয়ন। কিন্তু এখনও গ্রামে নারীদের কাজের মূল্যায়ন নেই।

গ্রামীণ অধিকাংশ নারীর শ্রমই ঘর-গৃহস্থালির আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। ছবি: লেখক

গ্রামীণ অধিকাংশ নারীর শ্রমই ঘর-গৃহস্থালির আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। ছবি: লেখক

কথায় আছে ‘যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে’। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত এই কথাটির আদি প্রেক্ষাপট জানা নেই। কিন্তু এখনকার সমাজে এটি সর্বাংশে সত্য। এ দেশের নারী সমাজ এগিয়ে চলেছে, সব ধরনের কাজেই নিজেকে সম্পৃক্ত করছে। পরিবারের অভাবশূন্য করতে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ করে চলেছে। সংসার, স্বামী-সন্তানও সামাল দিচ্ছে।

কৃষি, শিল্প ও সেবা— এই তিন খাতে বর্তমানে এক কোটি ৬৮ লাখ বাংলাদেশি নারী কাজ করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, বর্তমানে কৃষিখাতে নিয়োজিত আছেন ৯০ লাখ এর বেশি নারী। এ ছাড়া শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করেন যথাক্রমে ৪০ লাখ ৯০ হাজার ও ৩৭ লাখ নারী।

কৃষি, শিল্প ও সেবা— এই তিন খাতে বর্তমানে এক কোটি ৬৮ লাখ বাংলাদেশি নারী কাজ করছেন।

কৃষি, শিল্প ও সেবা— এই তিন খাতে বর্তমানে এক কোটি ৬৮ লাখ বাংলাদেশি নারী কাজ করছেন।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের কলকারখানায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে এক লাখ বেশি। বিভিন্ন কারখানায় বর্তমানে ২১ লাখ ১ হাজার ৮৩০ জন নারী শ্রমিক কাজ করছেন। কেবল যে আয়ের মধ্য দিয়ে নারীরা ক্ষমতায়নের জায়গায় পৌঁছাচ্ছেন, তা নয়। বাজার অর্থনীতিতে নারীরা নতুন নতুন চাহিদা তৈরিতেও অবদান রাখছেন বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই নারী। তাই তাদের বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে নারীর অবদানও সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি অর্থনীতিতে অবদান বাড়ানোর জন্য কর্মক্ষেত্রে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

পুরুষের পাশাপাশি একজন নারী শ্রমিক দিনান্তে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। ছবি: সংগৃহীত

পুরুষের পাশাপাশি একজন নারী শ্রমিক দিনান্তে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। ছবি: সংগৃহীত

গ্রামীণ নারী ও পুরুষের ওপর করা ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ১টি কাজে ব্যয় করেন ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা। পুরুষ ২ দশমিক ৭ টিতে করেন ২ দশমিক ৫ ঘণ্টা। অর্থাৎ পুরুষের তুলনায় নারী তিনগুণ কাজ করেন। তাই নারীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো আজ সময়ের দাবি।

পুরুষের পাশাপাশি একজন নারী শ্রমিক দিনান্তে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। সেই খাটুনির পর যে আয় হয়, তা দিয়ে চলে সংসারের চাকা। গতি পায় আমাদের দেশের অর্থনীতিও। কঠিন পরিশ্রমের পর দিনশেষে তারা যেন স্বপ্ন বুনে চলেন, সমাজে সমুন্নত হবে তাদের অবদান। হোক এমন কিছুই, যেভাবে সকল নারীর শ্রমই মূল্যায়িত হবে সমাজের চোখে।