ঢাকা ০৮:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মিয়ানমারের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে

সন্দীপ রায়

গত ২৬ আগস্ট বিবিসি বাংলা ভারতের মিজোরাম রাজ্যে বসবাসকারী শিন শরণার্থীদের ওপর একটি প্রতিবেদন করেছে। বিবিসির প্রতিবেদক শুভজ্যোতি ঘোষ বেশ কয়েকটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন এবং জানিয়েছেন যে প্রায় ৩১ হাজার শিন, যারা জাতিগতভাবে মিজোরামের মিজো জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত, গত বছর মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর শিন রাজ্য থেকে প্রতিবেশী মিজোরামে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

মিয়ানমারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোয়ে তাল্লুই সেসব শরণার্থীর মধ্যে একজন, যারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। তিনি মিয়ানমারের সেই লক্ষাধিক মানুষের একজন, যাদের ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতেও একই ধরনের স্বপ্ন হারানোর গল্প পাওয়া যায়।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বাশেলেত গত ১৬ আগস্ট কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। একজন রোহিঙ্গা শিক্ষক কমিশনারকে বলেছিলেন যে কিভাবে তিনি মিয়ানমারের স্কুলে ভালো ফল অর্জন করেছিলেন এবং ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে নিজ দেশ থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত হওয়ার পর গত পাঁচ বছর তিনি শরণার্থী শিবিরে কাটিয়েছেন। তিনি বাশেলেতকে বলেন, ‘আমি এখনো রাতে যখন আমার স্বপ্নের কথা ভাবি তখন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। আমার বৌদ্ধ বন্ধুরা এখন মিয়ানমারে চিকিৎসক। ’

সাধারণত একটি দেশের সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য বহিরাগত হুমকি থেকে দেশকে রক্ষা করা; যদিও অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের নিজেদের জনগণকে টার্গেট করে হত্যা করছে। সামরিক বাহিনী এমনভাবে কাজ করে চলেছে যেন তারা নিজেরাই একটি রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র। সাধারণত তাদের জনগণের সেবক হওয়ার কথা, অথচ ক্ষমতার জন্য তারা ক্ষুধার্ত এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজের লোকদের হত্যা করতে প্রস্তুত।

ইতিহাস আমাদের দেখায় যে আধিপত্যের এই আকাঙ্ক্ষা একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর দ্বারা উদ্ভূত হয়, যেমন—মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের খলনায়ক সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং, যিনি পরবর্তী সময়ে তাঁর ও সমগোত্রীয়দের নিজস্ব স্বার্থকে এগিয়ে নিতে অন্যদের কাজে লাগান।

সামরিক দখলের পর থেকে জান্তা কমপক্ষে দুই হাজার ২৪৯ জনকে হত্যা করেছে, আটক করেছে ১৫ হাজার জনকে এবং ২৮ হাজারেরও বেশি বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ যে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এবং ঐতিহ্যগতভাবে যাদের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সংখ্যায় বেশি হয়, সে বামার গোষ্ঠীরই অনেকে এখন সহিংসতার শিকার। সেনাবাহিনীর চলমান সহিংসতা ও বর্বরতা এখন অতুলনীয়।

সেনাবাহিনীর সহিংসতায় মিয়ানমারের জনগণের আশা ভেঙে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা তাদের পড়ালেখা যথাযথভাবে চালিয়ে যেতে পারছে না। অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থনকারী শিক্ষকদের আটক, এমনকি হত্যা করা হয়েছে। সামরিক শাসকদের দ্বারা কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রায় আট লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তারা কখন তাদের সাধারণ জীবন শুরু করতে পারবে সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। জনগণকে ভয় দেখাতে এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনী (পিডিএফ) ও বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ত্রাণকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার দেখতে পেয়েছেন যে জান্তা নিয়মিতভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের উল্লেখযোগ্য এবং গুরুতর লঙ্ঘন করছে।

বামারদের কেন্দ্রস্থল সাগাইং ও ম্যাগওয়ে অঞ্চল এবং শিন, কারেন ও কায়াহ রাজ্যে সামরিক বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির সর্বদা অবনতি হচ্ছে। বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে বিমান ও কামান হামলা ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এখন যেহেতু রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে, দেশের শেষ অঞ্চলটি যেটি তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল তা এখন সশস্ত্র সংঘাতের আবাসে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

রোহিঙ্গা সম্প্রদায় নিয়মিত সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে যুদ্ধের মাঝখানে পড়ে সহিংসতার শিকার হয়। এ ছাড়া বিশেষভাবে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। উত্তর রাখাইনে এখনো ছয় লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। তাদের বেশির ভাগই অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত শিবিরে দিন কাটায়, যেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কঠোরতার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাজ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাখাইনে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে স্থানীয়রা সাগাইং ও ম্যাগওয়ে অঞ্চল এবং শিন, কারেন ও কায়াহ রাজ্যের বেসামরিক নাগরিকদের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।

তাহলে মিয়ানমারের জনগণ কিভাবে সেই সামরিক বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাবে, যেটি নরখাদকের মতো নিজেদের খায় এবং যার ফলে পুরো দেশ ধ্বংসের মুখে পড়ে? একটাই সমাধান, আর তা হলো সামরিক প্রতিষ্ঠান থেকে সব ধরনের অমানবিকতা নির্মূল করা। একটি ঐক্যবদ্ধ মিয়ানমার তার যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মন্দকে ধ্বংস করতে পারে। বামার, কাচিন, কারেন, শান, কারেন্নি, আরাকানি এবং মিয়ানমারের সব জাতিগোষ্ঠীর জন্য একত্র হয়ে সামরিক স্বৈরাচারের অত্যাচার উত্খাত করার মুহূর্ত এসেছে।

মিয়ানমারের সৌন্দর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে যদি আপনি এটিকে একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ হিসেবে চিত্রিত করেন। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সহাবস্থান করে। সব মানুষ ও ধর্মের মধ্যে সমতা বেসামরিক জাতীয় ঐক্য সরকারের (এনইউজি) একটি বিবৃত লক্ষ্য। হয়তো একদিন প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমার দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে সক্ষম হবে।

একটি অখণ্ড মিয়ানমার গঠন মিয়ানমারের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাবে। আমরা আশা করি, মিয়ানমারের জনগণ তাদের হারিয়ে যাওয়া ভাই-বোনদের জন্য তাদের দুঃখকে শক্তিতে পরিণত করে সামরিক নিপীড়কদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ঐক্যবদ্ধ হবে। তবেই তারা বিজয় অর্জন করবে এবং তাদের স্বাধীনতা ফিরে পাবে।

সূত্র : মিয়ানমারের ‘দি ইরাবতী’

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Tag :
জনপ্রিয়

সংবাদ প্রকাশের জেরে তিন সাংবাদিকসহ ৫জনের নামে চোরাকারবারির মামলা

মিয়ানমারের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে

প্রকাশের সময় : ০৮:৫৭:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

সন্দীপ রায়

গত ২৬ আগস্ট বিবিসি বাংলা ভারতের মিজোরাম রাজ্যে বসবাসকারী শিন শরণার্থীদের ওপর একটি প্রতিবেদন করেছে। বিবিসির প্রতিবেদক শুভজ্যোতি ঘোষ বেশ কয়েকটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন এবং জানিয়েছেন যে প্রায় ৩১ হাজার শিন, যারা জাতিগতভাবে মিজোরামের মিজো জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত, গত বছর মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর শিন রাজ্য থেকে প্রতিবেশী মিজোরামে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

মিয়ানমারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোয়ে তাল্লুই সেসব শরণার্থীর মধ্যে একজন, যারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। তিনি মিয়ানমারের সেই লক্ষাধিক মানুষের একজন, যাদের ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতেও একই ধরনের স্বপ্ন হারানোর গল্প পাওয়া যায়।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বাশেলেত গত ১৬ আগস্ট কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। একজন রোহিঙ্গা শিক্ষক কমিশনারকে বলেছিলেন যে কিভাবে তিনি মিয়ানমারের স্কুলে ভালো ফল অর্জন করেছিলেন এবং ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে নিজ দেশ থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত হওয়ার পর গত পাঁচ বছর তিনি শরণার্থী শিবিরে কাটিয়েছেন। তিনি বাশেলেতকে বলেন, ‘আমি এখনো রাতে যখন আমার স্বপ্নের কথা ভাবি তখন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। আমার বৌদ্ধ বন্ধুরা এখন মিয়ানমারে চিকিৎসক। ’

সাধারণত একটি দেশের সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য বহিরাগত হুমকি থেকে দেশকে রক্ষা করা; যদিও অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের নিজেদের জনগণকে টার্গেট করে হত্যা করছে। সামরিক বাহিনী এমনভাবে কাজ করে চলেছে যেন তারা নিজেরাই একটি রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র। সাধারণত তাদের জনগণের সেবক হওয়ার কথা, অথচ ক্ষমতার জন্য তারা ক্ষুধার্ত এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজের লোকদের হত্যা করতে প্রস্তুত।

ইতিহাস আমাদের দেখায় যে আধিপত্যের এই আকাঙ্ক্ষা একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর দ্বারা উদ্ভূত হয়, যেমন—মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের খলনায়ক সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং, যিনি পরবর্তী সময়ে তাঁর ও সমগোত্রীয়দের নিজস্ব স্বার্থকে এগিয়ে নিতে অন্যদের কাজে লাগান।

সামরিক দখলের পর থেকে জান্তা কমপক্ষে দুই হাজার ২৪৯ জনকে হত্যা করেছে, আটক করেছে ১৫ হাজার জনকে এবং ২৮ হাজারেরও বেশি বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ যে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এবং ঐতিহ্যগতভাবে যাদের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সংখ্যায় বেশি হয়, সে বামার গোষ্ঠীরই অনেকে এখন সহিংসতার শিকার। সেনাবাহিনীর চলমান সহিংসতা ও বর্বরতা এখন অতুলনীয়।

সেনাবাহিনীর সহিংসতায় মিয়ানমারের জনগণের আশা ভেঙে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা তাদের পড়ালেখা যথাযথভাবে চালিয়ে যেতে পারছে না। অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থনকারী শিক্ষকদের আটক, এমনকি হত্যা করা হয়েছে। সামরিক শাসকদের দ্বারা কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রায় আট লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তারা কখন তাদের সাধারণ জীবন শুরু করতে পারবে সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। জনগণকে ভয় দেখাতে এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনী (পিডিএফ) ও বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ত্রাণকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার দেখতে পেয়েছেন যে জান্তা নিয়মিতভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের উল্লেখযোগ্য এবং গুরুতর লঙ্ঘন করছে।

বামারদের কেন্দ্রস্থল সাগাইং ও ম্যাগওয়ে অঞ্চল এবং শিন, কারেন ও কায়াহ রাজ্যে সামরিক বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির সর্বদা অবনতি হচ্ছে। বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে বিমান ও কামান হামলা ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এখন যেহেতু রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে, দেশের শেষ অঞ্চলটি যেটি তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল তা এখন সশস্ত্র সংঘাতের আবাসে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

রোহিঙ্গা সম্প্রদায় নিয়মিত সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে যুদ্ধের মাঝখানে পড়ে সহিংসতার শিকার হয়। এ ছাড়া বিশেষভাবে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। উত্তর রাখাইনে এখনো ছয় লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। তাদের বেশির ভাগই অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত শিবিরে দিন কাটায়, যেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কঠোরতার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাজ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাখাইনে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে স্থানীয়রা সাগাইং ও ম্যাগওয়ে অঞ্চল এবং শিন, কারেন ও কায়াহ রাজ্যের বেসামরিক নাগরিকদের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।

তাহলে মিয়ানমারের জনগণ কিভাবে সেই সামরিক বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাবে, যেটি নরখাদকের মতো নিজেদের খায় এবং যার ফলে পুরো দেশ ধ্বংসের মুখে পড়ে? একটাই সমাধান, আর তা হলো সামরিক প্রতিষ্ঠান থেকে সব ধরনের অমানবিকতা নির্মূল করা। একটি ঐক্যবদ্ধ মিয়ানমার তার যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মন্দকে ধ্বংস করতে পারে। বামার, কাচিন, কারেন, শান, কারেন্নি, আরাকানি এবং মিয়ানমারের সব জাতিগোষ্ঠীর জন্য একত্র হয়ে সামরিক স্বৈরাচারের অত্যাচার উত্খাত করার মুহূর্ত এসেছে।

মিয়ানমারের সৌন্দর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে যদি আপনি এটিকে একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ হিসেবে চিত্রিত করেন। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সহাবস্থান করে। সব মানুষ ও ধর্মের মধ্যে সমতা বেসামরিক জাতীয় ঐক্য সরকারের (এনইউজি) একটি বিবৃত লক্ষ্য। হয়তো একদিন প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমার দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে সক্ষম হবে।

একটি অখণ্ড মিয়ানমার গঠন মিয়ানমারের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাবে। আমরা আশা করি, মিয়ানমারের জনগণ তাদের হারিয়ে যাওয়া ভাই-বোনদের জন্য তাদের দুঃখকে শক্তিতে পরিণত করে সামরিক নিপীড়কদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ঐক্যবদ্ধ হবে। তবেই তারা বিজয় অর্জন করবে এবং তাদের স্বাধীনতা ফিরে পাবে।

সূত্র : মিয়ানমারের ‘দি ইরাবতী’

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক