ঢাকা ১০:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শিশুশ্রম-বাল্যবিয়ের নেপথ্যে অসহায় পরিবারের নীরব কান্না

মাহবুব আলম প্রিয়

শিশুর হাতে সংসারের হাল ধরতে শ্রমিক হওয়া আর শিশুবয়সে সংসার গড়তে বিয়ের পিঁড়িতে বসা উভয় বাংলাদেশের আইনে নিষিদ্ধ। এদেশের শ্রম আইন ২০০৬ এ বলা আছে, ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নেওয়া যাবে না তথা তাদের শ্রম নিষিদ্ধ। তাছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি পূর্ণ কাজে নিয়োগ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আবার ছেলের বয়স ২১ আর মেয়ের বয়স ১৮ না হলে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ করতে আইনে নিষেধ রয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ ও বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী- ১৮ বছরের চেয়ে কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের শিশু হিসাবে ধরা হয়েছে।

আইনে আছে, শিশুদেরকে বেতন, মুনাফা বা বিনা বেতনে কোনো পারিবারিক খামার, উদ্যোগ বা সংস্থায় কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া বা কাজ করিয়ে নেওয়াকে শিশুশ্রম হিসাবে বিবেচনা করা হয়। অথবা, শিশুশ্রম বলতে শ্রমের সময় প্রত্যক্ষভাবে উৎপাদন কাজে এবং পরোক্ষভাবে গার্হস্থ্য কাজে শ্রম ব্যয় করা। বিশেষজ্ঞদের মতানুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সকল ক্ষেত্রে শিশুর জন্য শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক দিক থেকে ক্ষতিকর এবং শিশুর প্রয়োজন ও অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বঞ্চনামূলক শ্রমই হলো শিশু শ্রম।

এবার আসি আমাদের সমাজে শিশুরা কেন কাজ করে তা বুঝতে চেষ্টা করব। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি শিশু শ্রমিক পাওয়া যায় টেক্সটাইল, পোশাক শিল্প, চামড়া শিল্প, ইট ভাটা ও জুতার কারখানায়। হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ গুলোতেও রয়েছে শিশু শ্রমিকদের কর্মতৎপরতা। বর্তমানে অনেক শিশুকে ঢাকাও আশপাশের সড়ক মহাসড়কে রাস্তায় রিক্সা চালাতেও দেখা যায়।

এছাড়াও মাঝারি যানবাহন-লেগুনা, টেম্পোতে চলন্ত অবস্থায় ঝুঁকির মধ্যে যাত্রী ওঠানো, ভাড়া আদায় করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে থাকে। তবে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন দোকান-পাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর ক্যান্টিন গুলাতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা আরও বেশি দেখি বাদ নেই শিল্পী হিসেবে কাজ করার কারিগর থেকেও। এমন প্রায় ১০ জনের অধিক শিশুদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তাদের কারো বাবা মা নেই। কারো মা-বাবা থাকলেও রোগগ্রস্ত।

কারও পরিবারের বেসরকারি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দেউলিয়া হয়ে বাধ্য হয়ে শিশুকে কাজে পাঠিয়েছেন দরিদ্র পিতা মাতা। কেউ বা নদী ভাঙনের শিকার হয়ে অসহায় পরিবারকে সহায়তা করতে কাজে নেমেছে। আরও গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় দরিদ্রতার কষাঘাতে নিরুপায় হয়ে আদরের শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হয় পরিবার। আবার শিশুরাও তাদের চাহিদা পূরণে পিতা মাতাকে সহযোগিতা করতে কাজে নামে।

ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সন্তানরা তাদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, শিশু থাকাতে কাজদাতারাও তাদেরকে অধিক সময় কাজ করতে বাধ্য করে থাকে। রয়েছে নির্যাতনের ঘটনাও। ফলে নানাভাবে তারা তাদের মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে।

বিবিএসের সাম্প্রতিক এক প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে। তার মধ্যে সাড়ে ৯ লাখ ছেলে ও সাড়ে ৭ লাখের অধিক মেয়ে শিশু। অথচ শিশুদের স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করতে দরকার ছিল রাষ্ট্রীয় ভূমিকার। অনেক অভাবগ্রস্ত পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্যও শিশুরা নিজেদের শ্রমিক হিসাবে গড়ে তুলছে।

এবার আসি আমাদের দেশের শিশু বিবাহ বা বাল্য বিয়ে নিয়ে। সময়ের ব্যবধানে শিশু বিবাহ গত ২০ বছরে কিছুটা কমেছে। কিন্তু লুকোচুরি থামেনি। বিয়ের ঘটনা ঘটছেই। আইন তা থামাতে পারছে না। স্থানীয় প্রশাসনের কঠোরতায় দু’চারটি বিয়ে বন্ধ করা গেলেও বাস্তবে নানা কৌশলে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। আর শিশু বিয়ের পেছনে রয়েছে দরিদ্র পরিবারের নানা অজুহাত কিংবা বাধ্যগত কারণ।

দারিদ্র ও অশিক্ষার ফলে এটি হয় বলে সমাজ ধারণা করেন। কিন্তু আরও কারণ রয়েছে যার সমাধান জটিল। ৫০ শতাংশের অধিক বাংলাদেশের নারী যাদের বয়স ২০ এর মাঝামাঝি তাদের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হবার আগেই বিয়ে হয়েছে। প্রায় ১৮ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের নিচে।

কারণ পরিবারের একজন মেয়ে শিশু যখন যৌবনপ্রাপ্ত হয়, তাদের পিতা-মাতা তখন তাদের সতীত্ব রক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে। বাল্যবিবাহ রোধ করার ক্ষেত্রে এটি হলো মূল বাধা। কারণ পিতা-মাতা মেয়েকে বিদ্যালয়ে বা ঘরের বাইরে শিক্ষা বা নানা জরুরি প্রয়োজনে পাঠালেও নিরাপদ বোধ করেন না।

ইভটিজিং, অসম প্রেমের প্রস্তাব ও সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া ও অপহরণ জাতীয় নানা ভয় পেয়ে থাকেন। ফলে মেয়ে শিশুদের কোনো ভালো বিয়ের প্রস্তাব এলে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। এক দিকে শুধুমাত্র মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিবাহের সিদ্ধান্ত যেমন নেন অভিভাবকরা। তেমনি বুঝে ওঠতে পারেন না যে, বিবাহের পর কতটুকু উপযুক্ত হয় তার শিশু মেয়েটি।

সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে ‘পবিত্রতা’ ও ‘সম্মান’- জড়িয়ে থাকে নারী ও শিশুদের বেলায়। সমাজে নারীরা দুর্ঘটনাবশত কোনো যৌন হেনস্থার শিকার হলে ভাবা হয় ‘কলঙ্কিনী’। এ কলঙ্কের আতঙ্ক থেকে বাঁচতে নীরবে বহু পরিবার বাল্যবিয়েতে জড়িয়ে নেয় আদরের মেয়েকে। মেয়েদের নিয়ে বলছি এ কারণে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরাই বাল্য বিয়েতে জড়ায় বেশি। তবে ছেলেরাও কম নয়।

অথচ শিশুদের বিয়ে দেয়া এক ধরনের যৌন নির্যাতন তা জানেন না সংশ্লিষ্ট সমাজ ও পরিবারের লোকজন।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশে এখনো ৬৬ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার৷ কিন্তু বাল্যবিবাহের এত বিপুল সংখ্যক ঘটনা কেন ঘটছে? তারই কিছু কারণ বাস্তবিক কারণ রয়েছে। বাল্যবিবাহের প্রথম কারণ দারিদ্র্য। আর দ্বিতীয় কারণ অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব।

শুধু যে দরিদ্র বা অল্প শিক্ষিত পরিবারে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে, তা নয়। এমনকি শহরে অনেক শিক্ষিত পরিবারেও বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে। পাত্র ভালো বা স্বাবলম্বী উপযুক্ত মনে হলে বয়স বিবেচনা না করেই দিয়ে দেয় অভিভাবকেরা।”

শিশুশ্রম আর শিশুবিয়ে সমাজের জন্য কঠোর নিয়তি। যা সমূলে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন বড় অংকের বাজেট। দরিদ্রতা দূরীকরণের পাশাপাশি সুশিক্ষিত করার অভাব থেকে এ সংকট তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে নারীদের নিরাপত্তায়। তাই, কোনো রকম ঝামেলা থেকে বাঁচতে মেয়েদেরকে অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেয় বাবা-মায়েরা। আবার বাজারের পণ্য মূল্যের বিক্রেতা ও ক্রেতার তফাৎ থাকায় বাধ্য হয় শিশুশ্রমে যুক্ত করতে।

শিশু শ্রমিকের বেশিরভাগই ছেলে শিশু। ছেলেদের কর্মসংস্থান যেমন একটি পরিবারের প্রথম চাওয়া তেমনি অবিবাহিত মেয়ের কোনো রকম অঘটন ঘটলে তার বিয়ে হওয়া নিয়ে বিরাট ঝামেলা হয় এমন দুশ্চিন্তায় থাকাও পরিবারের অন্যতম ভয়। দেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন থাকলেও, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাবা-মায়েরা অনেক সময় কাজিদেরকে মেয়ের বয়স বাড়িয়ে বলেন। ওই মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়তেই এমন সিদ্ধান্ত নেন।

অথচ যে শিশুটি খেলায়, লেখা পড়ায় আর পারিবারিক নানা বিনোদনে সময় কাটানোর কথা কিংবা কৈশোরে যে মেয়ের স্কুলে যাবার বয়স ঠিক তখনই তাকে বসতে হচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে। নিজের জীবনকে চিনতে না চিনতেই, স্বপ্নগুলো সাজাতে না সাজাতেই বউ সেজে সে যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। শারীরিক ও মানসিকভাবে উপযুক্ত হবার আগেই বাল্যবিবাহ মেয়েটির কাঁধে পুরো সংসার।

মোদ্দাকথা হলো, শারীরিকভাবে উপযুক্ত হবার আগেই সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যেও পড়ে মেয়েরা। আর সংসারের হাল ধরতে গিয়ে শারীরিক গঠনে বাড়ন্ত ছেলেটা কাজের চাপে অকালে হয়ে যায় জীর্ণ শীর্ণ। বয়স বাড়লে বাড়ে নানা রোগ বালাই। এর প্রভাব পড়ে পুরে সমাজে। ফলে আগামী প্রজন্মকে রক্ষায়, দেশের সুস্বাস্থসেবা ও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠায় এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে সুশীল সমাজ, আইন প্রণেতা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, শিক্ষক ও অভিভাবকদের পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক- মাহবুব আলম প্রিয়, লেখক ও সাংবাদিক।

Tag :

পঞ্চগড়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো দূর্গা পূজা

শিশুশ্রম-বাল্যবিয়ের নেপথ্যে অসহায় পরিবারের নীরব কান্না

প্রকাশের সময় : ১০:৫২:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

মাহবুব আলম প্রিয়

শিশুর হাতে সংসারের হাল ধরতে শ্রমিক হওয়া আর শিশুবয়সে সংসার গড়তে বিয়ের পিঁড়িতে বসা উভয় বাংলাদেশের আইনে নিষিদ্ধ। এদেশের শ্রম আইন ২০০৬ এ বলা আছে, ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নেওয়া যাবে না তথা তাদের শ্রম নিষিদ্ধ। তাছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি পূর্ণ কাজে নিয়োগ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আবার ছেলের বয়স ২১ আর মেয়ের বয়স ১৮ না হলে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ করতে আইনে নিষেধ রয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ ও বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী- ১৮ বছরের চেয়ে কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের শিশু হিসাবে ধরা হয়েছে।

আইনে আছে, শিশুদেরকে বেতন, মুনাফা বা বিনা বেতনে কোনো পারিবারিক খামার, উদ্যোগ বা সংস্থায় কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া বা কাজ করিয়ে নেওয়াকে শিশুশ্রম হিসাবে বিবেচনা করা হয়। অথবা, শিশুশ্রম বলতে শ্রমের সময় প্রত্যক্ষভাবে উৎপাদন কাজে এবং পরোক্ষভাবে গার্হস্থ্য কাজে শ্রম ব্যয় করা। বিশেষজ্ঞদের মতানুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সকল ক্ষেত্রে শিশুর জন্য শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক দিক থেকে ক্ষতিকর এবং শিশুর প্রয়োজন ও অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বঞ্চনামূলক শ্রমই হলো শিশু শ্রম।

এবার আসি আমাদের সমাজে শিশুরা কেন কাজ করে তা বুঝতে চেষ্টা করব। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি শিশু শ্রমিক পাওয়া যায় টেক্সটাইল, পোশাক শিল্প, চামড়া শিল্প, ইট ভাটা ও জুতার কারখানায়। হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ গুলোতেও রয়েছে শিশু শ্রমিকদের কর্মতৎপরতা। বর্তমানে অনেক শিশুকে ঢাকাও আশপাশের সড়ক মহাসড়কে রাস্তায় রিক্সা চালাতেও দেখা যায়।

এছাড়াও মাঝারি যানবাহন-লেগুনা, টেম্পোতে চলন্ত অবস্থায় ঝুঁকির মধ্যে যাত্রী ওঠানো, ভাড়া আদায় করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে থাকে। তবে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন দোকান-পাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর ক্যান্টিন গুলাতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা আরও বেশি দেখি বাদ নেই শিল্পী হিসেবে কাজ করার কারিগর থেকেও। এমন প্রায় ১০ জনের অধিক শিশুদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তাদের কারো বাবা মা নেই। কারো মা-বাবা থাকলেও রোগগ্রস্ত।

কারও পরিবারের বেসরকারি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দেউলিয়া হয়ে বাধ্য হয়ে শিশুকে কাজে পাঠিয়েছেন দরিদ্র পিতা মাতা। কেউ বা নদী ভাঙনের শিকার হয়ে অসহায় পরিবারকে সহায়তা করতে কাজে নেমেছে। আরও গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় দরিদ্রতার কষাঘাতে নিরুপায় হয়ে আদরের শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হয় পরিবার। আবার শিশুরাও তাদের চাহিদা পূরণে পিতা মাতাকে সহযোগিতা করতে কাজে নামে।

ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সন্তানরা তাদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, শিশু থাকাতে কাজদাতারাও তাদেরকে অধিক সময় কাজ করতে বাধ্য করে থাকে। রয়েছে নির্যাতনের ঘটনাও। ফলে নানাভাবে তারা তাদের মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে।

বিবিএসের সাম্প্রতিক এক প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে। তার মধ্যে সাড়ে ৯ লাখ ছেলে ও সাড়ে ৭ লাখের অধিক মেয়ে শিশু। অথচ শিশুদের স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করতে দরকার ছিল রাষ্ট্রীয় ভূমিকার। অনেক অভাবগ্রস্ত পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্যও শিশুরা নিজেদের শ্রমিক হিসাবে গড়ে তুলছে।

এবার আসি আমাদের দেশের শিশু বিবাহ বা বাল্য বিয়ে নিয়ে। সময়ের ব্যবধানে শিশু বিবাহ গত ২০ বছরে কিছুটা কমেছে। কিন্তু লুকোচুরি থামেনি। বিয়ের ঘটনা ঘটছেই। আইন তা থামাতে পারছে না। স্থানীয় প্রশাসনের কঠোরতায় দু’চারটি বিয়ে বন্ধ করা গেলেও বাস্তবে নানা কৌশলে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। আর শিশু বিয়ের পেছনে রয়েছে দরিদ্র পরিবারের নানা অজুহাত কিংবা বাধ্যগত কারণ।

দারিদ্র ও অশিক্ষার ফলে এটি হয় বলে সমাজ ধারণা করেন। কিন্তু আরও কারণ রয়েছে যার সমাধান জটিল। ৫০ শতাংশের অধিক বাংলাদেশের নারী যাদের বয়স ২০ এর মাঝামাঝি তাদের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হবার আগেই বিয়ে হয়েছে। প্রায় ১৮ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের নিচে।

কারণ পরিবারের একজন মেয়ে শিশু যখন যৌবনপ্রাপ্ত হয়, তাদের পিতা-মাতা তখন তাদের সতীত্ব রক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে। বাল্যবিবাহ রোধ করার ক্ষেত্রে এটি হলো মূল বাধা। কারণ পিতা-মাতা মেয়েকে বিদ্যালয়ে বা ঘরের বাইরে শিক্ষা বা নানা জরুরি প্রয়োজনে পাঠালেও নিরাপদ বোধ করেন না।

ইভটিজিং, অসম প্রেমের প্রস্তাব ও সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া ও অপহরণ জাতীয় নানা ভয় পেয়ে থাকেন। ফলে মেয়ে শিশুদের কোনো ভালো বিয়ের প্রস্তাব এলে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। এক দিকে শুধুমাত্র মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিবাহের সিদ্ধান্ত যেমন নেন অভিভাবকরা। তেমনি বুঝে ওঠতে পারেন না যে, বিবাহের পর কতটুকু উপযুক্ত হয় তার শিশু মেয়েটি।

সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে ‘পবিত্রতা’ ও ‘সম্মান’- জড়িয়ে থাকে নারী ও শিশুদের বেলায়। সমাজে নারীরা দুর্ঘটনাবশত কোনো যৌন হেনস্থার শিকার হলে ভাবা হয় ‘কলঙ্কিনী’। এ কলঙ্কের আতঙ্ক থেকে বাঁচতে নীরবে বহু পরিবার বাল্যবিয়েতে জড়িয়ে নেয় আদরের মেয়েকে। মেয়েদের নিয়ে বলছি এ কারণে যে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরাই বাল্য বিয়েতে জড়ায় বেশি। তবে ছেলেরাও কম নয়।

অথচ শিশুদের বিয়ে দেয়া এক ধরনের যৌন নির্যাতন তা জানেন না সংশ্লিষ্ট সমাজ ও পরিবারের লোকজন।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশে এখনো ৬৬ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার৷ কিন্তু বাল্যবিবাহের এত বিপুল সংখ্যক ঘটনা কেন ঘটছে? তারই কিছু কারণ বাস্তবিক কারণ রয়েছে। বাল্যবিবাহের প্রথম কারণ দারিদ্র্য। আর দ্বিতীয় কারণ অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব।

শুধু যে দরিদ্র বা অল্প শিক্ষিত পরিবারে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে, তা নয়। এমনকি শহরে অনেক শিক্ষিত পরিবারেও বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে। পাত্র ভালো বা স্বাবলম্বী উপযুক্ত মনে হলে বয়স বিবেচনা না করেই দিয়ে দেয় অভিভাবকেরা।”

শিশুশ্রম আর শিশুবিয়ে সমাজের জন্য কঠোর নিয়তি। যা সমূলে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন বড় অংকের বাজেট। দরিদ্রতা দূরীকরণের পাশাপাশি সুশিক্ষিত করার অভাব থেকে এ সংকট তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে নারীদের নিরাপত্তায়। তাই, কোনো রকম ঝামেলা থেকে বাঁচতে মেয়েদেরকে অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেয় বাবা-মায়েরা। আবার বাজারের পণ্য মূল্যের বিক্রেতা ও ক্রেতার তফাৎ থাকায় বাধ্য হয় শিশুশ্রমে যুক্ত করতে।

শিশু শ্রমিকের বেশিরভাগই ছেলে শিশু। ছেলেদের কর্মসংস্থান যেমন একটি পরিবারের প্রথম চাওয়া তেমনি অবিবাহিত মেয়ের কোনো রকম অঘটন ঘটলে তার বিয়ে হওয়া নিয়ে বিরাট ঝামেলা হয় এমন দুশ্চিন্তায় থাকাও পরিবারের অন্যতম ভয়। দেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন থাকলেও, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাবা-মায়েরা অনেক সময় কাজিদেরকে মেয়ের বয়স বাড়িয়ে বলেন। ওই মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়তেই এমন সিদ্ধান্ত নেন।

অথচ যে শিশুটি খেলায়, লেখা পড়ায় আর পারিবারিক নানা বিনোদনে সময় কাটানোর কথা কিংবা কৈশোরে যে মেয়ের স্কুলে যাবার বয়স ঠিক তখনই তাকে বসতে হচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে। নিজের জীবনকে চিনতে না চিনতেই, স্বপ্নগুলো সাজাতে না সাজাতেই বউ সেজে সে যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। শারীরিক ও মানসিকভাবে উপযুক্ত হবার আগেই বাল্যবিবাহ মেয়েটির কাঁধে পুরো সংসার।

মোদ্দাকথা হলো, শারীরিকভাবে উপযুক্ত হবার আগেই সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যেও পড়ে মেয়েরা। আর সংসারের হাল ধরতে গিয়ে শারীরিক গঠনে বাড়ন্ত ছেলেটা কাজের চাপে অকালে হয়ে যায় জীর্ণ শীর্ণ। বয়স বাড়লে বাড়ে নানা রোগ বালাই। এর প্রভাব পড়ে পুরে সমাজে। ফলে আগামী প্রজন্মকে রক্ষায়, দেশের সুস্বাস্থসেবা ও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠায় এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে সুশীল সমাজ, আইন প্রণেতা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, শিক্ষক ও অভিভাবকদের পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক- মাহবুব আলম প্রিয়, লেখক ও সাংবাদিক।