ঢাকা ১০:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

গুদামে পাহাড়, বাজারে হাহাকার

সারের দাম কিছুটা বাড়লেও কৃষকের চলতি মৌসুমের চাহিদা অনুযায়ী কোনো ঘাটতি নেই। খোদ কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। আমনের মৌসুম শুরুর পর থেকেই বাজারে হাহাকার চলছে। চড়া দাম দিয়ে সার কিনতে কৃষক নানা জায়গায় ছোটাছুটি করছেন। অথচ ডিলার ও সাব ডিলাররা তাদের গুদামে সারের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিবহণ ঠিকাদার ও ডিলারদের নানা কারসাজিতে সারের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। কৃষকের কাছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করতেই তারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির ফাঁদ পেতেছে। এ সিন্ডিকেট শক্তিশালী হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ধরপাকড় ও জরিমানা করেও তাদের লাগাম টানা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে ভর মৌসুমে সার না পেয়ে দেশে কৃষকদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। যেকোনো সময় তাদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছেন। কৃষকরা সময়মতো সার না পাওয়ায় খাদ্যশস্যের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। আগামীতে যার বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের উচ্চমূল্য পরিস্থিতিতে আমদানি আরও বাড়াতে হলে নানামুখী সংকট দেখা দেবে।

অন্যদিকে বাজারে সারের হাহাকার দেখা দিলেও দেশে যে সারের সংকট নেই, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া মজুতের তথ্যে তা স্পষ্ট। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, শুধু চলতি আমনের মৌসুমেই নয়, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সারের মজুতে কোনো সমস্যা নেই। গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। একই সঙ্গে গত বছরের তুলনায় এ বছর বরাদ্দও বেশি দেওয়া হয়েছে। এরপরও বাজারে সার সংকটের যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে তা অনাকাঙ্ক্ষিত। ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মাঠ প্রশাসন বা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কেউ কোনো কারসাজির সঙ্গে জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের দাবি, সারের কৃত্রিম সংকট ও কারসাজি রোধে সারাদেশে আগস্টে ৩৮৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত ৩৮৩ জন ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীকে

৫৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ অভিযান চলমান রয়েছে। প্রয়োজনে তা আরও জোরদার করা হবে। সরকার সার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির পরিমাণ বাড়ানোরও চিন্তাভাবনা করছে।

বাজারে এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) সারের সংকট বেশি দেখা গেলেও এর পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা খোদ কৃষিমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছেন। মন্ত্রী জানান, গত আগস্ট মাস পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত ১ লাখ ৮০ হাজার টন এমওপি সার দেশে পৌঁছেছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও ১ লাখ ১৬ হাজার টন সার দেশে পৌঁছবে। অথচ সেপ্টেম্বরে ৫১ হাজার টন ও অক্টোবরে ৭০ হাজার টন এমওপি সারের চাহিদা রয়েছে। ফলে চাহিদার চেয়ে মজুত অনেক বেশি।

উলেস্নখ্য, শুধু এমওপি-ই নয়, চাহিদার বিপরীতে দেশে সব রকমের সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বর্তমানে ইউরিয়া সারের মজুত ৬ লাখ ৫৬ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৯৪ হাজার টন, ডিএপি ৮ লাখ ২৩ হাজার টন, এমওপি ২ লাখ ৭৩ হাজার টন। সারের বর্তমান মজুতের বিপরীতে আমন মৌসুমে (আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত) সারের চাহিদা হলো ইউরিয়া ৬ লাখ ১৯ হাজার টন, টিএসপি ১ লাখ ১৯ হাজার টন, ডিএপি ২ লাখ ২৫ হাজার টন, এমওপি ১ লাখ ৩৭ হাজার টন।

এদিকে সরকারি তথ্য-উপাত্তে দেশে পর্যাপ্ত সার মজুতের হিসাব মিললেও মাত্র দুদিন আগে (৫ সেপ্টেম্বর) জামালপুর সদর উপজেলার নান্দিনায় সার না পেয়ে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। স্থানীয়রা জানান, সাত দিন ধরে সার কিনতে এসে না পেয়ে কৃষকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা নান্দিনা বাজার এলাকায় জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

সেখানকার কৃষকদের অভিযোগ, খোলাবাজারে সার পাচ্ছেন না, ডিলারেরা তাদের বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে রাতের আঁধারে সার বিক্রি করছেন। প্রচন্ড খরায় এমনিতেই আবাদ পিছিয়ে গেছে। সময়মতো সার না পেলে তাদের না খেয়ে থাকতে হবে।

শুধু জামালপুরেই নয়, সার না পেয়ে যশোর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রামসহ দেশের অধিকাংশ জেলাতেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন স্থানীয় কৃষকরা। অনেক জায়গায় পথে নেমেছেন তারা। কোথাও বা ডিলার, সাব-ডিলার ও কর্মকর্তাদের ঘেরাও এবং লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে।

অন্যদিকে বাজারে সারের হাহাকার থাকলেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বেশকিছু গুদাম থেকে অবৈধভাবে মজুতকৃত হাজার হাজার বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে। গত ৭ আগস্ট বগুড়ায় অবৈধভাবে মজুত ১২ হাজার বস্তা সার জব্দ করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী সদর উপজেলার ইউএনও সমর কুমার পাল জানান, বগুড়া সদর উপজেলায় যেসব সার বিক্রয়কারী ডিলার রয়েছেন তার মধ্যে নাজমুল পারভেজ কনকের নাম নেই। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই ব্যবসায়ীর গোডাউনে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করা আনুমানিক ১২ হাজার বস্তা ডিএপি ও ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়।

২০ আগস্ট নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় কালোবাজারে বিক্রির সময় পিকআপভ্যানসহ দুই হাজার ২৫০ কেজি সার জব্দ করা হয়। জানা গেছে, নরোত্তমপুর ইউনিয়নের ডিলার মিলন বরাদ্দকৃত সার তুলে বাইরে বিক্রি করে দেন। রাতের আঁধারে করমবক্স বাজারের গুদাম থেকে ওই সার বেগমগঞ্জের পাক মুন্সিরহাট বাজারে পাঠানো হচ্ছিল।

২৯ আগস্ট মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুর বাজারের সার ও বীজের পরিবেশক জগদীশ কুন্ডু ট্রেডার্সে অবৈধভাবে মজুতকৃত ৮২৭ বস্তা ইউরিয়া, ডিএসপি ও পটাশ সার জব্দ করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত জানায়, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতেই এই সার অবৈধভাবে মজুত করা হয়েছিল।

এর আগে ২৪ আগস্ট নাটোরের সিংড়ায় তিন প্রতিষ্ঠানের গুদাম থেকে ১ হাজার ২৭০ বস্তা ইউরিয়া ও পটাশ সার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছাতারবাড়িয়া বাজারের শাকিলা ট্রেডার্স থেকে ৮৭০ বস্তা, কালীগঞ্জ বাজারের মেসার্স কৃষি বিতান থেকে ২০০ বস্তা ও আলহাজ ট্রেডার্স থেকে ২০০ বস্তা ইউরিয়া ও পটাশ সার জব্দ করা হয়।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অবৈধ মজুত সামান্য কিছু সার জব্দ হলেও তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে সারের কৃত্রিম সংকটের চাঞ্চল্যকর তথ্য। এর নেপথ্যে কারা তাদের মুখোশও উন্মোচিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সার আমদানির পর চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো হয়। এই দুটি বন্দর থেকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তালিকাভুক্ত পরিবহণ ঠিকাদাররা এ সার বিভিন্ন জেলার সরকারি গোডাউনে পৌঁছে দেন। তবে এই পরিবহণ ঠিকাদাররা দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেট করে আসছেন। তাদের সঙ্গে আছেন বিএডিসির কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের কিছু ডিলার।

জানা গেছে, আমদানির সার দেশে পৌঁছালেও তা সঠিক সময়ে সরকারি গোডাউনে ঢোকে না। এমন তথ্যের প্রমাণ মিলেছে বিএডিসির খুলনা কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক মো. লিয়াকত আলীর এক চিঠিতে। ১ আগস্ট সার পরিবহণ কোম্পানি মেসার্স পোটন ট্রেডার্সকে চিঠি দেন তিনি। ওই চিঠিতে বলা হয়, পোটন ট্রেডার্সের হেফাজতে থাকা সাতটি জাহাজের বিপরীতে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৪৪ টন সারের বিপরীতে ৩৩ হাজার টন পরিবহণ করেছে। ওই প্রতিষ্ঠানের হেফাজতে পশ্চিমাঞ্চলের বিপরীতে এখনো ৯২ হাজার ২৯৩ টন এমওপি সার গুদামে যায়নি। এ ছাড়া চারটি জাহাজে করে আসা এমওপি সারেরও হদিস নেই। এ ব্যাপারে খুলনার বিএডিসির (সার) যুগ্ম পরিচালক বলেন, চিঠি দেওয়ার পর পোটন ট্রেডার্স কিছু সার দিয়েছে। এখনো প্রায় ৭৩ হাজার টন সারের হদিস নেই।

যদিও এ ব্যাপারে পোটন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী কামরুল আশরাফ খান পোটন খোঁড়া যুক্তি দেখিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইউরিয়া সারের সংকট থাকায় তা পরিবহণ করতে গিয়ে এমওপি সার পরিবহণে দেরি হয়েছে।

অন্যদিকে কুষ্টিয়া ট্রেডিং নামে আরেক প্রতিষ্ঠানও ঠিক সময়ে সার সরকারি গুদামে পৌঁছে দেয়নি। ১২ হাজার টন সার পরিবহণের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত ৬ হাজার টন গুদামে পৌঁছে দিয়েছে। গোয়েন্দাদের অভিযোগ, এ রকম বেশ কিছু পরিবহণ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ঠিক সময়ে সার সরবরাহ না করার অভিযোগ রয়েছে। আর এর নেপথ্যেই সিন্ডিকেটের কারসাজির প্রমাণ মিলেছে।

অন্যদিকে গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে গোডাউন ও বিক্রয় কেন্দ্র নেই এমন অনেক ডিলারেরও সন্ধান মিলেছে। তারা ডিও কেনাবেচা করেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে।

Tag :

প্রতিমায় রং তুলির আঁচড়ে ব্যস্ত কারিগররা

গুদামে পাহাড়, বাজারে হাহাকার

প্রকাশের সময় : ০৭:৩৩:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

সারের দাম কিছুটা বাড়লেও কৃষকের চলতি মৌসুমের চাহিদা অনুযায়ী কোনো ঘাটতি নেই। খোদ কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। আমনের মৌসুম শুরুর পর থেকেই বাজারে হাহাকার চলছে। চড়া দাম দিয়ে সার কিনতে কৃষক নানা জায়গায় ছোটাছুটি করছেন। অথচ ডিলার ও সাব ডিলাররা তাদের গুদামে সারের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিবহণ ঠিকাদার ও ডিলারদের নানা কারসাজিতে সারের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। কৃষকের কাছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করতেই তারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির ফাঁদ পেতেছে। এ সিন্ডিকেট শক্তিশালী হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ধরপাকড় ও জরিমানা করেও তাদের লাগাম টানা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে ভর মৌসুমে সার না পেয়ে দেশে কৃষকদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। যেকোনো সময় তাদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছেন। কৃষকরা সময়মতো সার না পাওয়ায় খাদ্যশস্যের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। আগামীতে যার বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের উচ্চমূল্য পরিস্থিতিতে আমদানি আরও বাড়াতে হলে নানামুখী সংকট দেখা দেবে।

অন্যদিকে বাজারে সারের হাহাকার দেখা দিলেও দেশে যে সারের সংকট নেই, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া মজুতের তথ্যে তা স্পষ্ট। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, শুধু চলতি আমনের মৌসুমেই নয়, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সারের মজুতে কোনো সমস্যা নেই। গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। একই সঙ্গে গত বছরের তুলনায় এ বছর বরাদ্দও বেশি দেওয়া হয়েছে। এরপরও বাজারে সার সংকটের যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে তা অনাকাঙ্ক্ষিত। ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মাঠ প্রশাসন বা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কেউ কোনো কারসাজির সঙ্গে জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের দাবি, সারের কৃত্রিম সংকট ও কারসাজি রোধে সারাদেশে আগস্টে ৩৮৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত ৩৮৩ জন ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীকে

৫৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ অভিযান চলমান রয়েছে। প্রয়োজনে তা আরও জোরদার করা হবে। সরকার সার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির পরিমাণ বাড়ানোরও চিন্তাভাবনা করছে।

বাজারে এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) সারের সংকট বেশি দেখা গেলেও এর পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা খোদ কৃষিমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছেন। মন্ত্রী জানান, গত আগস্ট মাস পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত ১ লাখ ৮০ হাজার টন এমওপি সার দেশে পৌঁছেছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও ১ লাখ ১৬ হাজার টন সার দেশে পৌঁছবে। অথচ সেপ্টেম্বরে ৫১ হাজার টন ও অক্টোবরে ৭০ হাজার টন এমওপি সারের চাহিদা রয়েছে। ফলে চাহিদার চেয়ে মজুত অনেক বেশি।

উলেস্নখ্য, শুধু এমওপি-ই নয়, চাহিদার বিপরীতে দেশে সব রকমের সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বর্তমানে ইউরিয়া সারের মজুত ৬ লাখ ৫৬ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৯৪ হাজার টন, ডিএপি ৮ লাখ ২৩ হাজার টন, এমওপি ২ লাখ ৭৩ হাজার টন। সারের বর্তমান মজুতের বিপরীতে আমন মৌসুমে (আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত) সারের চাহিদা হলো ইউরিয়া ৬ লাখ ১৯ হাজার টন, টিএসপি ১ লাখ ১৯ হাজার টন, ডিএপি ২ লাখ ২৫ হাজার টন, এমওপি ১ লাখ ৩৭ হাজার টন।

এদিকে সরকারি তথ্য-উপাত্তে দেশে পর্যাপ্ত সার মজুতের হিসাব মিললেও মাত্র দুদিন আগে (৫ সেপ্টেম্বর) জামালপুর সদর উপজেলার নান্দিনায় সার না পেয়ে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। স্থানীয়রা জানান, সাত দিন ধরে সার কিনতে এসে না পেয়ে কৃষকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা নান্দিনা বাজার এলাকায় জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

সেখানকার কৃষকদের অভিযোগ, খোলাবাজারে সার পাচ্ছেন না, ডিলারেরা তাদের বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে রাতের আঁধারে সার বিক্রি করছেন। প্রচন্ড খরায় এমনিতেই আবাদ পিছিয়ে গেছে। সময়মতো সার না পেলে তাদের না খেয়ে থাকতে হবে।

শুধু জামালপুরেই নয়, সার না পেয়ে যশোর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রামসহ দেশের অধিকাংশ জেলাতেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন স্থানীয় কৃষকরা। অনেক জায়গায় পথে নেমেছেন তারা। কোথাও বা ডিলার, সাব-ডিলার ও কর্মকর্তাদের ঘেরাও এবং লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে।

অন্যদিকে বাজারে সারের হাহাকার থাকলেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বেশকিছু গুদাম থেকে অবৈধভাবে মজুতকৃত হাজার হাজার বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে। গত ৭ আগস্ট বগুড়ায় অবৈধভাবে মজুত ১২ হাজার বস্তা সার জব্দ করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী সদর উপজেলার ইউএনও সমর কুমার পাল জানান, বগুড়া সদর উপজেলায় যেসব সার বিক্রয়কারী ডিলার রয়েছেন তার মধ্যে নাজমুল পারভেজ কনকের নাম নেই। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই ব্যবসায়ীর গোডাউনে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করা আনুমানিক ১২ হাজার বস্তা ডিএপি ও ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়।

২০ আগস্ট নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় কালোবাজারে বিক্রির সময় পিকআপভ্যানসহ দুই হাজার ২৫০ কেজি সার জব্দ করা হয়। জানা গেছে, নরোত্তমপুর ইউনিয়নের ডিলার মিলন বরাদ্দকৃত সার তুলে বাইরে বিক্রি করে দেন। রাতের আঁধারে করমবক্স বাজারের গুদাম থেকে ওই সার বেগমগঞ্জের পাক মুন্সিরহাট বাজারে পাঠানো হচ্ছিল।

২৯ আগস্ট মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুর বাজারের সার ও বীজের পরিবেশক জগদীশ কুন্ডু ট্রেডার্সে অবৈধভাবে মজুতকৃত ৮২৭ বস্তা ইউরিয়া, ডিএসপি ও পটাশ সার জব্দ করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত জানায়, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতেই এই সার অবৈধভাবে মজুত করা হয়েছিল।

এর আগে ২৪ আগস্ট নাটোরের সিংড়ায় তিন প্রতিষ্ঠানের গুদাম থেকে ১ হাজার ২৭০ বস্তা ইউরিয়া ও পটাশ সার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছাতারবাড়িয়া বাজারের শাকিলা ট্রেডার্স থেকে ৮৭০ বস্তা, কালীগঞ্জ বাজারের মেসার্স কৃষি বিতান থেকে ২০০ বস্তা ও আলহাজ ট্রেডার্স থেকে ২০০ বস্তা ইউরিয়া ও পটাশ সার জব্দ করা হয়।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অবৈধ মজুত সামান্য কিছু সার জব্দ হলেও তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে সারের কৃত্রিম সংকটের চাঞ্চল্যকর তথ্য। এর নেপথ্যে কারা তাদের মুখোশও উন্মোচিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সার আমদানির পর চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো হয়। এই দুটি বন্দর থেকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তালিকাভুক্ত পরিবহণ ঠিকাদাররা এ সার বিভিন্ন জেলার সরকারি গোডাউনে পৌঁছে দেন। তবে এই পরিবহণ ঠিকাদাররা দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেট করে আসছেন। তাদের সঙ্গে আছেন বিএডিসির কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের কিছু ডিলার।

জানা গেছে, আমদানির সার দেশে পৌঁছালেও তা সঠিক সময়ে সরকারি গোডাউনে ঢোকে না। এমন তথ্যের প্রমাণ মিলেছে বিএডিসির খুলনা কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক মো. লিয়াকত আলীর এক চিঠিতে। ১ আগস্ট সার পরিবহণ কোম্পানি মেসার্স পোটন ট্রেডার্সকে চিঠি দেন তিনি। ওই চিঠিতে বলা হয়, পোটন ট্রেডার্সের হেফাজতে থাকা সাতটি জাহাজের বিপরীতে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৪৪ টন সারের বিপরীতে ৩৩ হাজার টন পরিবহণ করেছে। ওই প্রতিষ্ঠানের হেফাজতে পশ্চিমাঞ্চলের বিপরীতে এখনো ৯২ হাজার ২৯৩ টন এমওপি সার গুদামে যায়নি। এ ছাড়া চারটি জাহাজে করে আসা এমওপি সারেরও হদিস নেই। এ ব্যাপারে খুলনার বিএডিসির (সার) যুগ্ম পরিচালক বলেন, চিঠি দেওয়ার পর পোটন ট্রেডার্স কিছু সার দিয়েছে। এখনো প্রায় ৭৩ হাজার টন সারের হদিস নেই।

যদিও এ ব্যাপারে পোটন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী কামরুল আশরাফ খান পোটন খোঁড়া যুক্তি দেখিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইউরিয়া সারের সংকট থাকায় তা পরিবহণ করতে গিয়ে এমওপি সার পরিবহণে দেরি হয়েছে।

অন্যদিকে কুষ্টিয়া ট্রেডিং নামে আরেক প্রতিষ্ঠানও ঠিক সময়ে সার সরকারি গুদামে পৌঁছে দেয়নি। ১২ হাজার টন সার পরিবহণের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত ৬ হাজার টন গুদামে পৌঁছে দিয়েছে। গোয়েন্দাদের অভিযোগ, এ রকম বেশ কিছু পরিবহণ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ঠিক সময়ে সার সরবরাহ না করার অভিযোগ রয়েছে। আর এর নেপথ্যেই সিন্ডিকেটের কারসাজির প্রমাণ মিলেছে।

অন্যদিকে গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে গোডাউন ও বিক্রয় কেন্দ্র নেই এমন অনেক ডিলারেরও সন্ধান মিলেছে। তারা ডিও কেনাবেচা করেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে।