রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

সোমবার ১৪ জুন ২০২১, ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

০৯:৫৫ অপরাহ্ণ

স্মৃতিচারণ : আমাদের পূর্বপুরুষ

মনির মোহাম্মদ

প্রকাশিত : ১২:১৩ PM, ২৬ মে ২০২১ বুধবার ৬৮ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

আমাদের পূর্বপুরুষ
মনির মোহাম্মদ

চার ক্লাসের ছাত্র তখন। মাথায় সারাদিন ঘুরত ছড়া আর কবিতা। আর স্কুল ছুটি হলেই কে কার আগে বাড়ি পৌঁছাবে তার প্রতিযোগিতা। ‘কাজলা দিদি’ পড়ে প্রথম কবিতার প্রেমে পড়ি। তারপর মাথায় লেখার ভূত চেপে বসল। জীবনের প্রথম নিজের লেখা একটা কবিতা পড়ে আব্বাকে শুনালাম। আব্বা বলল অসাধারণ! আমি জানতাম না ওটা আদৌ কোনো কবিতা হয়েছিল কিনা? কিন্তু আগ্রহ বাড়তে থাকে। তখনকার সময় প্রতি শুক্রবার সকালে ‘কল কাকলি বিভাগ’ নামে রেডিওতে একটা অনু্ষ্ঠান হত। প্রতি সপ্তাহে কবিতা লিখে ডাক যোগে জমা দিতাম, আর মুখ হা করে অপেক্ষায় থাকতাম, আমার লেখাটা কি পড়বে?

আমরা একান্নবর্তী পরিবারে বড় হয়েছি। আমার দাদার এক ডজনের মত সন্তান ছিল। চাচা-চাচী , ফুফুরা সবার একই টিন সেডের নিচে বাস। চাচারা বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেন নি। সংসারের নানাবিধ কাজে ব্যস্ত থাকতো। তখনকার কঠিন সময়ে আমার আব্বা কিভাবে জানি বি.এ পাশ করে ফেলল। সরকারি চাকুরীতে শিক্ষকতায় যোগদান করলেন। আব্বার গল্পগুলো শুনেছি দাদীর মুখে। আমার মা শহরের মেয়ে। কিন্তু গ্রামের সাথে অদ্ভুত একটা ভালোবাসা ছিল আম্মার। বিদুৎ এর আলোতে বড় হওয়া একজন মানুষ কিভাবে প্রতি সন্ধ্যায় হারিকেনের চিমনি পরিষ্কার করে? সকালে উঠুন ঝাড়ু দেওয়া, কাটি দিয়ে টিউবলের নাক লাগিয়ে চাপ দিয়ে পানি নিয়ে আসা, এক হাঁড়িতে ২৫ জনের রান্না করা, রীতিমত প্রতি বেলায় এক একটা ছোট খাট বিয়ের অনুষ্ঠানের মত।

তখন বুঝতাম না, কিন্তু এখন বুঝি আর বসে বসে চিন্তা করি। আজকালের তরুনীরা হয়ত মুখ হা করে থাকবেন গল্পটা শুনে। আমার মা তখনকার সময়ের কলেজ পড়ুয়া নারী ছিলেন। আম্মাকে নিয়ে বিস্তর আলোচনা আরেক দিন করব ইনশাল্লাহ!

হারিকেন এর মিটিমিটি আলোতে বড় হওয়া প্রজন্ম আমরা। বাড়িতে বিনোদন বলতে দাদার টু ইন ওয়ান রেডিও আর আব্বার নিয়ে আসা বাসি খবরের কাগজ। গল্পের বই যোগাড় করতাম অনেক কষ্ট করে। আমাদের গ্রামে শিক্ষার আলো ছিল হাতে গোনা। একদিন আব্বা চাচাকে বাল্য শিক্ষার একটা বই এনে দিলেন। আর বয়স্ক শিক্ষায় নাম লেখালেন। পড়ানোর দায়িত্ব ছিল আমার উপর। নিজের পড়া শেষ করে প্রতি রাত্রে অক্ষর শেখানোর কাজ করতাম। আহারে কী মজার পড়া! ঘুমঘুম চোখে প্রতি রাতে চাচাকে পড়াতাম। অবাক হয়ে লক্ষ করেছি কী তাদের পড়ার আগ্রহ! হঠাৎ তাদের বললাম কেন, কারণ চাচার সাথে আরো অনেকেই পড়ত তখন।

প্রথমে একটা কবিতার কথা বলেছিলাম। যখন ঘুম পেত তখন চাচাদের কবিতা শোনাতাম। “বাঁশ বাগানে মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ”। অবাক হয়ে লক্ষ করেছি, তারা আমার সাথে সাথে কবিতা পড়ছে, আহাঃ কী দরদ! সারাদিন কাজ করে, আর দিন শেষে কবিতা আর অক্ষর নিয়ে খেলা করে। সেদিনই বুঝেছিলাম কবিতা, গল্প সবাইকে ভাবায় সবাইকে হাসায়,কাঁদায়। পল্লী কবি জসীম উদ্দিন এর ‘কবর’ কবিতাটা প্রথম শুনেছিলাম আব্বার মুখে। মনে আছে কবিতাটি শুনে সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। চোখের জল আটকে রাখতে পারতাম না! আহারে আমার প্রিয় শৈশব আরেকবার যদি পেতাম, আর যাই হতাম, কখনও বড় হতে চাইতাম না।

এবার কিছু কঠিন কথা বলব,যা আমরা সবাই জানি। ভাই মনে আছে আমাদের একটা ফসল ছিল আখ/উঁক নামে? সবাই হয়ত বলবেন আমাদের আখ চিনাতে আসছেন? না ভাই আখ চিনাতে আসেনি। আজ আমদের আখ শষ্যটা কোথায় গেল? আমি নিজে দেখেছি আমাদের এলাকায় প্রচুর আখের চাষ হত। চাচাদের দেখতাম নিজ হাতে কেরকি নামক একটা যন্ত্র ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রস বের করে ,সেই রস জাল দিয়ে ধুলো চিনি বানাতে। ধুলো চিনি আমাদের এই প্রজন্মের কাছে দিল্লিকা লাডু, কোনদিন চোখেও দেখেনি।
আসুন আবার গল্পে ফিরে যাই…… …

দেখেছি ধান কাটা শেষ হলে আমাদের বাড়ির উঠুনে পুঁথি পাঠ হত, আবার কেউ কেউ পুঁথির সুরে তাল মেলাত গড়গড় শব্দে হুক্কা টেনে আর খকখক করে কেশে। বাড়ির ভিতর থেকে কানে আসত ঢেঁকির ধুপধাপ আওয়াজ। যারা সারাদিন ক্ষেতে কাজ করেছে তাদের অনেককেই দেখেছি রাতের বেলায় লাট্রু মার্কা লুঙ্গী আর টেট্রন কাপড়ের চকচকে শার্ট পড়ে হাতে করতাল বাজিয়ে জারী গান গাইতে। আজ তাদের অনেকেই বেঁচে নেই, কিন্তু জমিনের পরতে পরতে আজো পাওয়া যায় তাদের কাপড়ের টুকরোগুলোর অংশ বিশেষ।

তাদের কথাগুলো, গল্পগুলো আজও মনে গেঁথে আছে। আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে এগুলো রুপকথা মনে হতে পারে। আগামী প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যাচ্ছি। এগুলো ওদের জানতে হবে, জানাতে হবে। কিভাবে একান্নবর্তী পরিবারে এক সাথে সবাইকে নিয়ে ভালবাসার নিপুণ বন্ধনে জড়ানো যায়। কেমন ছিল আমাদের পূর্ব পুরুষদের ভাবনা। তাদের জীবন যাপন। আমাদের পূর্ব পুরুষদের নিয়ে দীর্ঘ একটা উপন্যাস লিখেছি এগারসিন্ধুর নামে ২০১৯ সালে । এখন উপন্যাসটির ৩য় মুদ্রণ চলছে। পাঠকদের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়েছি বারবার। আপনাদের এই ভালোবাসাই আমার আগামী দিনের প্রেরণা।
“চন্দে যদি গ্রহণ লাগে নদীত লাগে টান,
মনে যদি গ্রহণ লাগে চক্ষে নামে বান।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT