রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

বৃহস্পতিবার ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শ্বাসরুদ্ধকর ১২ ঘণ্টা

প্রকাশিত : 02:11 AM, 28 November 2019 Thursday ১৫ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :
alokitosakal

১ জুলাই ২০১৬। শুক্রবার। রোজার ঈদের সপ্তাহখানেক বাকি। পুরো দেশ ঈদের আমেজে। ঠিক এই সময় গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় ঘটে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার ঘটনা, যে ঘটনায় ১৭ বিদেশিসহ ২০ জন প্রাণ হারান।

হামলা ঠেকাতে গিয়ে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। ভয়ঙ্কর সেই রাতের নৃশংস হামলা নাড়া দেয় পুরো বাংলাদেশকে। পুরো জাতি স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। সেই রাতটি দেশবাসীর কাটে চরম উদ্বেগ উৎকণ্ঠায়। নিরাপত্তা নিয়ে চারিদিকে শুরু হয় আতঙ্ক।

সেই রাতে চারিদিকে সুনসান নীরবতার মধ্যেই শুরু হয় প্রশিক্ষিত ৫ জঙ্গির আক্রমণ। রাত আনুমানিক পৌনে ৯টায় ‘আল্লাহু আকবর’ বলে হামলা শুরু করে জঙ্গিরা। গ্রেনেড-গুলিতে কেঁপে ওঠে গুলশান। ১২ ঘণ্টা পর কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে সেই সংকটের রক্তাক্ত অবসান ঘটে।

হলি আর্টিজানে জঙ্গিদের হামলা শুরুর পর দ্রুত ঘটনাস্থলে এগিয়ে আসেন ওই এলাকায় টহলে থাকা গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাসসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। তারা সেখানে এসেই দেখতে পান হলি আর্টিজানের ভেতরে গুলি ও বোমাবাজি চলছে। তারা হামলাকারীদের প্রতিহতের চেষ্টা করেন। এ সময় গুলি চালানোর পাশাপাশি পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়তে থাকে জঙ্গিরা। তখনও পুলিশ বুঝতে পারেনি হামলাকারী কারা, কী উদ্দেশ্যে হামলা করছে। তাৎক্ষণিক পুলিশের টহল দলটি ওয়াকিটকিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খবরটি জানায়। তাদের খবরে দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হন বনানী থানার ওসি মো. সালাউদ্দিন খান, গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলামের টিমসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা।

হামলাকারীদের গুলিতে শুরুতেই এসআই ফারুক হোসেন, কনস্টেবল প্রদীপ চন্দ্র দাস, আলমগীর হোসেন এবং রাজ্জাক নামের এক পথচারী আহত হন। এর কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে পৌঁছেন বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এসি রবিউল ইসলাম। তারা জঙ্গিদের প্রতিহত করতে গিয়ে হামলায় গুরুতর আহত হন। তাদের সঙ্গে আরও অসংখ্য পুলিশ সদস্য রক্তাক্ত হন। এর পরই বড় ঘটনা আঁচ করতে পেরে র‌্যাব-পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্য ৭৯ নম্বর সড়কের আশপাশ ঘিরে ফেলেন। ওই এলাকায় যাওয়ার সব পথ বন্ধ করে দেন। ঘিরে ফেলা হয় হলি আর্টিজান বেকারি এলাকা।

ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ঢাকার তখনকার পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, কাউন্টার টেররিজম বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা ঘটনাস্থলের পাশেই একটি অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম খোলেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ হলি আর্টিজানে আটকে পড়া নারী, পুরুষ ও শিশুদের উদ্ধারে অগ্রসর হয়। এ সময় আবারও জঙ্গি-পুলিশ ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়। হামলাকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে কয়েকটি গ্রেনেড ছোড়ে। তখন সেখানে প্রায় অর্ধশত পুলিশ সদস্য আহত হন। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বেকারির ভেতরের পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেন। ততক্ষণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জেনে গেছে ভেতরে প্রশিক্ষিত জঙ্গিরা অবস্থান করছে। তাদের কাছে অস্ত্রের পাশাপাশি গ্রেনেডও রয়েছে।

রাত আনুমানিক ১১টায় ওসি সালাহউদ্দিন ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর কিছুক্ষণ পর রবিউল ইসলামের মৃত্যুর খবর আসে। হামলার ভয়াবহতা তখনও পুরোপুরি আঁচ করতে পারেনি মানুষ। ৭৯ নম্বর সড়কের মাথায় পুলিশের ব্যারিকেডের কাছে ভিড় করে উৎসুক জনতা। ঘটনাস্থলে ছুটে যান গণমাধ্যমকর্মীরাও।

হামলার মধ্যেই হলি আর্টিজানের দোতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে বাইরে আসতে সক্ষম হন রেস্তোরাঁর সুপারভাইজার সুমন রেজাসহ কয়েকজন কর্মী। পুলিশের ব্যারিকেডের কাছে সুমন রেজা গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, কয়েক যুবক হঠাৎ রেস্তোরাঁয় ঢুকে ভেতরে থাকা দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করেছে। যুবকদের ছিল পিস্তল, সাব মেশিনগান ও ধারালো অস্ত্র।

রাত ১১টার দিকে র‌্যাবের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের বলেন, কয়েকজন অস্ত্রধারী রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করেছে। তারা বেশ কয়েকজনকে সেখানে জিম্মি করেছে। তিনি সেই খবর সরাসরি সম্প্রচার না করতে অনুরোধ জানান। এর পর টেলিভিশনগুলো ওই রাস্তা থেকে সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। ততক্ষণে সারাবিশ্বের নজর নিবদ্ধ হয় গুলশানের জিম্মি সংকটের দিকে। বিবিসি, সিএসএনসহ বিশ্বের নেতৃস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো গুলশান হামলার খবরের আপডেট দিতে শুরু করে। রাত ১২টার দিকে জঙ্গি কর্মকা-ের ওপর নজরদারি করা যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ হলি আর্টিজানে হামলাকারী হিসেবে পাঁচ তরুণের ছবি প্রকাশ করে। রেস্তোরাঁর বাইরে পুলিশের অস্থায়ী কন্ট্রোল রুমে র‌্যাব-পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা করণীয় নিয়ে বৈঠকে বসেন। তারা ভেতরে থাকা জঙ্গিদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা শুরু করেন।

মধ্যরাতের পর থেকে গুলি ও বিস্ফোরণের ঘটনা কমে আসে এবং পরিস্থিতি থমথমে হয়ে ওঠে। রাত ১টার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় নৌবাহিনীর একটি কমান্ডো দল। আসে সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধি দল। ৭৯ নম্বর সড়কের মোড়ে পুলিশের কয়েকটি সাঁজোয়া যান এনে রাখা হয়। অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি প্রস্তুত রাখা হয় ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের গাড়ি। ঘটনাস্থলের পাশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমকর্মীদের। একদিকে ঘটনাস্থলে চলছিল অভিযানের প্রস্তুতি, আরেক দিকে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক। ওই বৈঠক শেষে তৎকালীন পুলিশপ্রধান একেএম শহীদুল হক, র‌্যাবপ্রধান বেনজীর আহমেদসহ বিভিন্ন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ফেরেন। ভোর ৫টার দিকে হ্যান্ডমাইকে সাধারণ পোশাকের সবাইকে ঘটনাস্থল থেকে সরে যেতে বলা হয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা সাদা পোশাকে ছিলেন, তাদের সবাইকে বাহিনীর ভেস্ট পরতে নির্দেশ দেওয়া হয়। হলি আর্টিজানের চারপাশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা হয়। প্রস্তুত করা হয় সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান ও প্যারাকমান্ডোদের।

সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে শুরু হয় সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। এ সময় দূর থেকে গুলির পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। রেস্তোরাঁর দেয়াল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান। তাদের অভিযান শেষে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা ফায়ার এক্সটিংগুইশার নিয়ে ভবনে প্রবেশ করেন। কিছু সময় পর একদল চিকিৎসকও স্ট্রেচার নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেনা অভিযানে রেস্তোরার ভেতরে হামলাকারী ৫ জঙ্গি এবং এক পাচক নিহত হয়। এর মধ্য দিয়ে শ^াসরুদ্ধকর ১২ ঘণ্টার অবসান ঘটে। মুক্তি পান জিম্মিরা।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT