রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

সোমবার ১০ মে ২০২১, ২৭শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ

ভারতজুড়ে এনআরসি আতঙ্ক

রোহিঙ্গা স্টাইলে গড়াচ্ছে অনুপ্রবেশ

প্রকাশিত : ০৬:০২ AM, ২১ নভেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার ১৮৫ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

এনআরসি আতঙ্কে রোহিঙ্গা স্টাইলে গত কয়েকদিনে বাংলাদেশ সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কেউ কেউ বলছেন, ভারতে অনিশ্চিত নাগরিকত্বের গ্যাড়াকলে পড়া ১৯ লাখ বাসিন্দারাই অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে।

কিন্তু অনুপ্রবেশকারীরা দাবি করছে, তারা বাংলাদেশরই নাগরিক। নিজেদের পরিচয় এবং ঠিকানা নিশ্চিতের জন্য আটককারী সংস্থা বিজিবিকে যে তথ্য দিচ্ছে অনুপ্রবেশকারীরা, তা যাচাই-বাছাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজিবি সূত্র বলছে, তাদের দেওয়া ঠিকানা দুর্গম এলাকায় হওয়ায় যাচাই-বাছাই করাও কঠিন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগে অনুপ্রবেশকারীদের পরিচয় ও তাদের দেয়া ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অনুপ্রবেশকারীরা কোন দেশের নাগরিক তা নিশ্চিত করেই ব্যবস্থা গ্রহণ করার মোক্ষম সময় এখন।

গত ১৫ দিনে কেবল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা সীমান্ত দিয়েই অনুপ্রবেশ করেছে ১৫৭ জন। সর্বশেষ হিসাবে গত দুই সপ্তাহে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে দুই শতাধিক। অনুপ্রবেশকারীরা নিজেদের বাংলাদেশি বলে দাবি করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে বলে জানায়। তাদের আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারেও পাঠানো হয়েছে ইতোমধ্যে। খালিশপুরস্থ ৫৮ বিজিবির সদস্যরা ভারতীয় এসব অনুপ্রবেশকারীকে আটক করে।

গত ১৫ দিনের হিসেবে, ৭৫ নারী, ৬৪ পুরুষ ও ৬৪ জন শিশু অনুপ্রবেশকারীকে আটক করা হয় বলেও জানায় বিজিবি। যার মধ্যে সর্বশেষ গত মঙ্গলবার আটক হয় চারজন। এছাড়া চলতি নভেম্বরের ১৫ দিনে আটক ১৫৭ জনকে মহেশপুর থানার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হয়েছে। চলতি মাসের ১৩ নভেম্বর ৩৩ জন ও ১৪ নভেম্বর ৪৯ জনসহ মোট ৮২ জনকে আটক করে বিজিবি। এটাই বিজিবির হাতে আটক হওয়া বড় সংখ্যার অনুপ্রবেশকারী দল বলে জানায় বিজিবি।

এ হিসেবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় প্রতিদিনই অবৈধ অনুপ্রবেশ বেড়েই চলেছে। যা রোহিঙ্গা সমস্যার মতো বাংলাদেশের জন্য আরও একটি বড় সমস্যার ইঙ্গিত করছে বলেই মনে করছেন তারা। এরআগে ভারতের নাগরিক পঞ্জিকা থেকে ১৯ লাখ বাসিন্দা বাদ পড়ার ঘটনার পর চলতি বছরের ২০ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরে আসেন এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং (বাংলাদেশের জন্য) কোন সমস্যা হবে না— এমনটি জানিয়েই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, এ বিষয়ে ভারতের আশ্বাসের প্রতি বাংলাদেশের বিশ্বাস রয়েছে।

কিন্তু ভারতের আশ্বাসের পরও নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়াদের অবৈধ অনুপ্রবেশ শুরু হওয়ার বিষয়ে জানতে চেয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে অবদুুল মোমেনের মুঠোফোনে ফোন করা হলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত রয়েছেন বলে জানান মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী।

তবে তিনি কথা বলার প্রসঙ্গ জেনেছেন এবং মন্ত্রী মহোদয়কে জানাবেন বলে জানান। কিন্তু দীর্ঘসময় পর গতকাল রাতে সংবাদ প্রকাশের পূর্বে পুনরায় ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এনআরসি ইস্যু আলোচনায় আসার পর গণমাধ্যমকে বলেছেন, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং এ বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চান না।

তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মতোই অনুপ্রেবেশের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় তার বক্তব্য জানতে চেয়ে ফোন করলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন কল কেটে দেন।

এদিকে যে সংখ্যক অনুপ্রবেশকারী আটকের কথা বলছে বিজিবি, সে সংখ্যা তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি বলে দাবি করছে স্থানীয়রা। বিজিবি সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়েই অনুপ্রবেশ করছে বলেও জানায় তারা।

স্থানীয়দের দাবি, এনআরসি আতঙ্কে ভারত থেকে পালিয়ে নাগরিকরা রোহিঙ্গাদের মতোই বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ শুরু করেছে। তাদের দাবি, এটা বন্ধে এখনি কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রোহিঙ্গা সমস্যার মতো আরও একটি বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে বাংলাদেশ। স্থানীয়দের কেউ কেউ এ ও বলছেন, রোহিঙ্গাদের মতো যাতে ভারতে থেকেও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ঢল নামতে না পারে সে জন্য স্থানীয়রাও রয়েছে সক্রিয় অবস্থানে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ঘনবসতির দেশ। ইতোমধ্যে এদেশেই রোহিঙ্গাদের জায়গা দেয়া হয়েছে মানবিক কারণে। এভাবে যদি আবার ভারত থেকেও মানুষ চলে আসে তাহলে আরও একটা সমস্যা সৃষ্টি হবে। তারা অনেকেই সম্পত্তি বিক্রি করে চলে গিয়েছিলেন। এখন ফিরে এসে তারা কর্মসংস্থান না পেয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এছাড়া যারা ভারত থেকে আসছে তারা কোনো মারাত্মক রোগ বা এইচআইভি বহন করছে কি-না এটাও বড় চিন্তার বিষয়। তারা দেশ থেকে চলে গিয়ে দীর্ঘদিন সেখানে ছিলেন। তাদেরকে এখন অবৈধভাবে আমাদের দেশে আসতে দেয়া যায় না। ভারত বাংলাদেশের বন্ধু দেশ এই বিষয়ে আলোচনা করে সমাধান করা যেতে পারে।

এদিকে বিজিবি বলছে, যারা অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে তাদের বেশির ভাগই মুসলমান। এরা এনআরসি আতঙ্ক ও স্থানীয় নির্যাতনে ভারত ছেড়ে আসছেন। তারা আর ভারতে যাবেন না বলে বিজিবির কাছে জানিয়েছেন। সহায়-সম্বল নিয়ে তারা এদেশে চলে এসেছেন। মহেশপুর উপজেলার জলুলী, পলিয়ানপুর, খোসালপুর সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে বলেও জানায় বিজিবির একটি সূত্র।

মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল আলম বলেন, এখন পর্যন্ত শিশু বাদ দিয়ে এক থেকে দেড়শ জনকে আটক করে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। যাদের আটক করেছে বিজিবি সদস্যরা। তিনি বলেন, এরা সবাই বাংলাদেশি। পাঁচ-ছয় বছর আগে কেউ কেউ কাজের সন্ধানে ভারতে গেছে। তবে আটকদের সংখ্যা শিশুসহ আর বেশি বলেও জানান ওসি রাশেদুল আলম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আমেনা মহসীন বলেন, এনআরসির কারণে নাকি অন্য কোনো কারণে অনুপ্রবেশ করছে তা আগে খতিয়ে দেখতে হবে। যারা অনুপ্রবেশ করছে, তারা যদি বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকে এবং অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে থাকে তাহলে এটা ভিন্ন ব্যাপার। তাদরেকে অবশ্যই ফেরত আসতে হবে। কিন্তু এদের মধ্যে যদি ভারতীয় নাগরিক থাকে তাহলে সীমান্তবর্তী জেলা প্রশাসন ও সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে যে তারা আসলে কোন দেশের নাগরিক।

তবে আটক অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা নিশ্চিত না করে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ বলেন, অনুপ্রবেশকারীরা নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করেছেন। তবে বিজিবি ৫৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল আহসানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT