রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

১০:৫০ অপরাহ্ণ

শিরোনাম
◈ চরফ্যাসনে গৃহবধুকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন, থানায় সমঝোতা ◈ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা একজন শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী ◈ উলিপুরে গুনাইগাছে ১১৫ জন দুস্থ নারীর মাঝে ফুট প্যাকেজ বিতরণ ◈ নীলফামারীতে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরকারী বরাদ্দের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ◈ হাজার বছর নয়-সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান —পুলিশ সুপার, নওগাঁ ◈ লালমনিরহাটে বার্তা বাজার এর ৭ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত ◈ রূপগঞ্জে জালিয়াতি করে কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা ◈ কুড়িগ্রামে বিআরটিসি বাস ও প্রাইভেটকার মুখোমুখি সংঘর্ষে  নিহত ৪ ◈ সিরাজগঞ্জে অটোরিকশা চালককে শ্বাসরোধ করে হত্যা ◈ পত্নীতলায় ফেন্সিডিল ও মটরসাইকেলসহ ১ যুবক আটক

রাষ্ট্রযন্ত্রে পিষ্ট পাটকল শ্রমিকের হাজার স্বপ্ন

প্রকাশিত : ১২:০৫ AM, ১২ জুলাই ২০২০ Sunday ১২২ বার পঠিত

সাজেদুর ‍আবেদিন, সাহিত্য প্রতিনিধ:
alokitosakal

সাধারণত গ্রামের ছেলে হিসেবে গ্রামের আলো বাতাস, গন্ধেই বেড়ে ওঠা। সেজন্যই পাটের সাথে সখ্যতা বেশ পুরনো। আরো ভালো করে বলতে গেলে মাধ্যমিকে কওমী জুট মিলস হাইস্কুলে পড়ার সুবাদে পাটের গন্ধ, চটের গন্ধ, মেশিনের খটখট শব্দ, শ্রমিকের জীবনধারা, আন্দোলন-সংগ্রাম, শ্রমিকের ছেলে মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব এসবই আমাকে পাটের সাথে জানাশোনা বাড়িয়ে দেয় আরো কয়েকগুণ। সেই ভালোবাসা থেকেই নিজেও যখন “উদ্যেক্তা সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প” এর অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি তখনও পাট পণ্য নিয়েই উদ্যেক্তা হবার আগ্রহ প্রকাশ ও “সোনালী স্বপ্ন” নামে কর্মপরিকল্পনা জমা দেই। এত মমতার কারণ হয়তো পাঠ্যবইয়ে পাটকে সোনালি আঁশ হিসাবে চেনার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনের পটে কৃষক-শ্রমিকের হাসিও একে নিয়েছিলাম সেই শৈশবেই। সুতরাং বলতেই পারেন পাট নিয়ে আমার আগ্রহের শেষ নেই। এই কর্মপরিকল্পনা সাজাতে গিয়ে পাটজাত পণ্যের এত রকমের বৈচিত্র্য থাকতে পারে, সেসব প্রথম আবিষ্কার করেছিলাম। ব্যাগ, শাড়ি, পর্দা, সোফা, গিফট বক্স, গয়না, ল্যাম্পশেড, কার্পেট, থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর নানান রকম উপকরণ ও শিশুদের খেলনায় এত বৈচিত্র আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করে। বহুদিন ধরেই শুনে আসছিলাম সারা বিশ্বে পরিবেশ বান্ধব পাটের উপকরণের চাহিদা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি আইন করেই ইউরোপ সহ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো পণ্য বাজারজাত করণে পাটের ব্যাগ ব্যাবহারের কথা বলছে। তাই আমি আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম পাটের ভবিষ্যৎ নিয়ে। এই আশাবাদের কারণ শুধু এই নয় যে, বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে বিশ্বের কাছে নতুন করে পরিচিত হবে, এই আশাবাদের কারণ ছিল এর মধ্যে দিয়ে অতীতের ধ্বংস হয়ে যাওয়া কর্মসংস্থানগুলো নতুন করে ফিরে আসবে। দেশের শ্রমিকদের মুখে হাসি ফুটবে আর প্রতিটি পণ্যের বুননে বুননে সেই হাসি উদ্ভাসিত হতে থাকবে। পাট বললেই এর পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এর পেছনে কৃষক-শ্রমিকদের জীবন জীবিকা দেখতে পাই। কিন্তু স্বাধীনতার এতো বছর পরেও আমরা দেশীয় ও বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে পাট পণ্যের ডিজাইন ও মানের মধ্যে বৈচিত্র্য আনতে পারিনি। যার ফলে হারিয়েছি আন্তর্জাতিক বাজার ও স্বাধীনতাকালীন সময়ে ৭০ টি পাটকল বন্ধ হতে হতে এখন ২৫ টিতে ঠেকেও শেষমেষ শূন্য হয়ে গেলো।
মাধ্যমিকে পড়ার সময় খুব কাছ থেকে আজ অবধি পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া আদায়ের দাবিতে রাস্তায় নামতে দেখেছি, ভুখা মিছিল করতে দেখেছি, নিজেদের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে অনশন করতে দেখেছি। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জেনেছি, দীর্ঘদিন তাঁদের বেতন দেওয়া হয়নি লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে। এমনকি এই করোনাকালেও যখন বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছিলো, তখনও তাঁদের ওপর গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। আর সম্প্রতি আমরা লক্ষ করলাম ১ জুলাই ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দিলো সরকার। স্বাভাবিক ভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, দেশ-বিদেশে যখন পাটের চাহিদা বেড়ে চলেছে, তখন ঠিক এই মহামারির মধ্যে এই পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়ার উদ্দেশ্য কী? কিছুদিন আগেও না পড়লাম চামড়াশিল্পকে পেছনে ফেলে পাটশিল্প এগিয়ে? অনেকেই ভাবছেন, চারদিকে অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, লোকসান হচ্ছে, তাই টিকে থাকতে না পেরে করোনাকালে হয়তো এই পাটকলগুলোও লোকসানের কারণে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। কিন্তু যা ভাবানোর চেষ্টা করা হয়, তার পেছনেও আরও কিছু থাকে, যা সহজ চোখে ধরা পড়ে না। অর্থাৎ লোকসানের অজুহাতটি মোটেই এত সহজ ও সাধারণ নয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই লোকসান করে আসছিল। লোকসানের কারণগুলোও বহুদিন ধরেই জানা। বিভিন্ন সময়ে লোকসানের কারণ হিসাবে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা, পাট ক্রয়ে সিন্ডিকেটের প্রভাব, আধুনিকায়নে গাফিলতি, বাজারজাতকরণে উদ্যোগের অভাব এগুলোকে চিহ্নিত করা হলেও এই ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে বিভিন্ন সময় শ্রমিকের বকেয়া বেতন দেওয়া হয়নি, পেনশনের অর্থ আটকে দেওয়া হয়েছে এবং পাটকল বন্ধ করে তা বেসরকারীকরণ করা হয়েছে। এত দিন ধরে যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করা হয়ে ওঠেনি। ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করলে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বর্তমানে কর্মরত ২৪ হাজার ৮৮৬ জন শ্রমিকের প্রাপ্য বকেয়া মজুরি, শ্রমিকদের পিএফ জমা, গ্র্যাচুইটি এবং সেই সঙ্গে গ্র্যাচুইটির সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ হারে অবসায়নের সুবিধা একসঙ্গে শতভাগ পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। গোল্ডেন হ্যান্ডশেক ও ২০১৪ সাল থেকে অবসরপ্রাপ্ত ৮ হাজার ৯৫৪ জন শ্রমিকের প্রাপ্য সব বকেয়া পরিশোধ বাবদ সরকারি বাজেট থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে। এতে শুধু প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হবেন না, এর সঙ্গে জড়িত অস্থায়ী শ্রমিক ও অন্যান্য মানুষের জীবন জীবিকা হুমকির সম্মুখীন হবে। কর্মহীন হয়ে যাওয়া এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে আশ্বস্ত করতে গিয়ে পাটমন্ত্রী জানিয়েছেন, গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দেওয়ার পর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে উৎপাদনমুখী করা হবে। তখন এসব শ্রমিক সেখানে চাকরি করার সুযোগ পাবেন। সাধারণভাবে দেখলে মনে হবে, শ্রমিকদের নিশ্চয়তা তো দেওয়াই হলো, আর বন্ধ করার মানে হলো নতুন করে চালু হওয়া। কিন্তু আবারো জানিয়ে রাখি এই আশা দেখানো মোটেই এত সরল নয়।
প্রথমত, যেই কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে পাটকলের শ্রমিকদের সময়মতো বকেয়া বেতন পরিশোধ করতেই ব্যর্থ হয়েছে সিন্ডিকেটের চক্র ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে, প্রতিবাদ সমাবেশ দমনে পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে, সেই কর্তৃপক্ষের এ ধরনের প্রতিশ্রুতির ওপর শ্রমিকেরা ভরসা করবে কী করে?
দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে যে নতুন পাটকলে চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে বলা হয়েছে, তার অর্থ আসলে কী? বিদ্যমান বেসরকারি পাটগুলো বেশির ভাগই অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের মাধ্যমে ও কম মজুরি দিয়ে খরচ কমিয়ে থাকে। বেসরকারি খাতে মাসিক মজুরি মাত্র ২ হাজার ৭০০ টাকা। অন্যদিকে, ২০১৫ সালে মজুরি কমিশন বিজেএমসির অন্তর্ভুক্ত পাটকলগুলোর মূল বেতন ৮ হাজার ৭০০ টাকা নির্ধারণের পর এ বছর থেকে ২৬টি পাটকলের শ্রমিকদের ৮ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতন পাওয়ার কথা। অর্থাৎ বিজেএমসির শ্রমিকেরা চাকরিচ্যুত হলে বেসরকারি পাটকলে অস্থায়ীভাবে কাজ করতে হবে এবং তখন তাঁদের বেতন প্রায় তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসবে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটশিল্প বেসরকারীকরণ করা হলেই যে সব অব্যবস্থাপনা দূর হয়ে যাবে, লাভ হবে, এ ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যায় কি? এর আগে পাটকল ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার নাম করে সস্তায় জমি ও যন্ত্রপাতি লুটপাট করা, বিশাল জমি দেখিয়ে ব্যাংকঋণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে না পারার নজির স্থাপন করা হয়েছে। এ রকম তিনটি পাটকল যেমন এজ্যাক্স, সোনালি, মহসিন পাটকল বন্ধের কথা সব শ্রমিকই জানেন। কাজেই এই বেসরকারীকরণের ওপর স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের আস্থা নেই। তাহলে দিনশেষে আমরা যে সহজ সমীকরণ হিসেবটি দেখছি সেটি আসলেই কি সরল? মোটেও নয়। বাংলাদেশের যখন পাট খাতকে শ্রমিকবান্ধব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে পাট খাত সম্প্রসারণের কথা, তখন করোনাকালে বাংলাদেশ একে সংকুচিত করে, শ্রমিকদের কর্মহীন করে ভুল নীতির দিকে এগোচ্ছে।
আমি আজকে শ্রমিকদের পরিস্থিতি দেখে অনুধাবন করতে বাধ্য হচ্ছি যে পাটশিল্প বিকাশের নামে সরকারগৃহীত নীতি কোনোভাবেই শ্রমিকবান্ধব নয়। ২৬টি পাটকল বন্ধের পেছনে রয়েছে শ্রমিক শোষণের এক মহাপরিকল্পনা। সোনালি আঁশের বুননে শ্রমিকের হাসির বদলে খুঁজে পাচ্ছি শ্রমিক পিতাদের শিশুকে মুখে পর্যাপ্ত খাদ্য দিতে না পারার তীব্র যন্ত্রণা। একজন সচ্ছল পিতা যখন পাটের ব্যাগ ভর্তি করে নিজের শিশুর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য কিনবেন আর পাটের ব্যাগের পেছনের কারিগরেরা যখন সন্তানের জন্য সবচেয়ে সস্তা পুঁটি মাছটাও কিনতে না পেরে খালি ব্যাগ নিয়ে ঘরে ফিরবেন তখন উন্নয়ন-চাকচিক্য এক নিমেষে বিলীন হয়ে যাবে।

এম এম মেহেরুল
লেখক ও সাবেক চেয়ারম্যান, আলোর প্রদীপ।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT