রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

বৃহস্পতিবার ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রানী দুর্গার ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর

প্রকাশিত : 07:03 PM, 13 October 2019 Sunday ৭৪ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :
alokitosakal

ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা প্রাচীন চন্দ্রদ্বীপ বরিশাল। এ জেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান হচ্ছে রানী দুর্গাবতীর দুর্গাসাগর। বরিশালের বাবুগঞ্জের মাধবপাশা ইউপির বানারীপাড়া-বরিশাল সড়কের পাশে অবস্থিত। দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তম দীঘি এটি।

এ দীঘির মোট জমির আয়তন ৪৫.৫৫ একর। এর মধ্যে ২৭.৩৮ একর জায়গা ঘিরে মূল দীঘি। রানী দুর্গার নামের সঙ্গে মিল রেখে এবং সাগর নাম যুক্ত করে এর বিশালত্ব বুঝিয়ে দীঘিটির নামকরণ হয়েছে।

মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে ভরপুর এ দীঘি পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্থান। দর্শনার্থীরা প্রতিনিয়তই এ দীঘির সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসেন। দীঘির চারপাশে ও মাঝখানের দ্বীপটিতে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, ওষধি ও বনজ বৃক্ষ রয়েছে। দীঘির চারপাশে ১.৬ কিলোমিটার হাঁটাপথ রয়েছে। বিশাল এ দীঘির মাঝখানে সুন্দর জঙ্গলপূর্ণ ছোট্ট দ্বীপের মতো একটি টিলা রয়েছে। দর্শনার্থীর অন্যতম আকর্ষণ মাঝখানের দ্বীপটির সৌন্দর্য। তবে পাড় থেকে দ্বীপে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না।

দীঘির মাঝখানের দ্বীপটি সারাক্ষণ পাখিদের কলকাকলিতে মুখর থাকে। এখানে আছে সুবিশাল সিমেন্টের তিনটি প্রশস্ত ঘাটলা। দীঘির পাড়ে সরু সড়ক, মাঝে মধ্যে বসার জন্য বেঞ্চ, সবুজ বৃক্ষরাজি, পাখির কলকাকলি, মাতাল হাওয়া ইত্যাদির পাশাপাশি দুর্গাসাগরের অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মোহিত করে পর্যটক ও প্রকৃতি প্রেমীদের।

বাতাসের বেগ একটু বেশি হলেই দুর্গাসাগরে ঢেউ ওঠে। প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে এ দীঘি অনাবিল প্রশান্তির অন্যতম কেন্দ্র। সম্পূর্ণ দীঘিটি উঁচু সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। শখের মৎস্য শিকারিরাও এখানে আসেন, বিশাল আকৃতির মাছ ধরার জন্য। বছরে অন্তত দুইবার টিকিট কেটে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সুযোগ রয়েছে এখানে। এছাড়াও চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পবিত্র স্নানের উদ্দেশ্যে এখানে সমবেত হন। স্নান উৎসবের সময় এখানে বড় মেলা বসে।

কথিত আছে, সাগরঘেঁষা প্রাচীন চন্দ্রদ্বীপ বারবার বর্মি আর পর্তুগিজ জলদস্যুদের অবাধ লুণ্ঠন ক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় শ্রীনগর তথা মাধবপাশায় চন্দ্রদ্বীপের রাজধানী স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করেন চন্দ্রদ্বীপ রাজবংশের পঞ্চদশ রাজা শিবনারায়ণ। যদিও রাজবাড়ির কিছুই অবশিষ্ট নেই। বেশকিছু দীঘি থাকলেও তার অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। যা রয়েছে তা এখন শুধুই কালের সাক্ষী। রাজবংশের উত্তরসূরিরা এখন ভারতে বসবাস করছেন।

১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রজাদের খাবার পানির কষ্ট লাঘবের জন্য শিব নারায়ণের স্ত্রী রানী দুর্গাবতী বিশাল এ দীঘিটি খনন করান। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী ও প্রজাবৎসল। তার নামেই দীঘিটি দুর্গাসাগর নামে পরিচিত। জনশ্রুতি আছে, রানী সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি একবারে যতটুকু জমিতে হাঁটতে পারবেন, দীঘি ততোটুকু খনন করা হবে এবং তাই করা হয়েছে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে জৌলুস হারাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর। ১৯৭৫ সালে আবদুর রব সেরনিয়াবাত সর্বশেষ দীঘিটি পুনঃখনন ও সংস্কার করেছিলেন। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত দীঘিটির সংস্কার বা উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

দুর্গাসাগরের প্রধান প্রবেশদ্বার ‘আবদুর রব সেরনিয়াবাত’ ফটকের রঙ ও পলেস্তারা খসে পড়লেও আজ পর্যন্ত তা মেরামত বা রং করা হয়নি। এছাড়া স্থানীয় উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা দুর্গাসাগরের প্রধান প্রবেশদ্বারের পাশেই সীমানা দেয়াল ভেঙে ফেলেছে, যা মেরামতের কোনো উদ্যোগই নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে সন্ধ্যা হলেই দুর্গাসাগর নেশাখোরদের দখলে চলে যাচ্ছে। এছাড়া দিনের বেলায় বখাটেদের উৎপাত তো আছেই।

সীমানা দেয়াল ভাঙা থাকায় দর্শনার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। দীঘি এলাকায় নিষেধ থাকা সত্ত্বেও অবাধে গবাদিপশু চড়ায় স্থানীয়রা। এতে যেমন দর্শনীয় এ স্থানটির সৌন্দর্য ম্লান হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। কয়েক বছর আগেও শীত মৌসুমে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি দুর্গাসাগরে ভিড় করতো। কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয় ও শিকারিদের উৎপাতে অতিথি পাখিরাও এখন আর আসে না।

বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক হাজার পাখির কলকাকলিতে যে দীঘি মুখরিত থাকত, সেখানে এখন বিরানভাব বিরাজ করে। পর্যটনের অন্যতম স্থান হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ দীঘিটির উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ২৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ দীঘিটির সংস্কার ও উন্নয়নে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হলে দুর্গাসাগর তার হারানো জৌলুস ফিরে পেয়ে হয়ে উঠতে পারে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান।

আলোকিত সকাল/ফাহাদ

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই বিভাগের জনপ্রিয়

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT