রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

বুধবার ১৭ আগস্ট ২০২২, ২রা ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

০৬:৪০ অপরাহ্ণ

রতনের ইদ || মোঃ সাইফুল ইসলাম 

প্রকাশিত : 09:06 PM, 9 July 2022 Saturday 28 বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

রতনের ইদ
মোঃ সাইফুল ইসলাম 
বছর ঘুরেই ইদ আসে৷ প্রতিটি জীবনে বয়ে আনে আনন্দ ও খুশির মাত্রা, দিয়ে যায় নতুনত্বের ডাক! কেউ খুশি নতুন জামা-কাপড়, ঘুরাফেরা আর আয়েস ভোজনে। আবার কেউ খুশি এক বেলা দুমুঠো ভাত পেট  ভরে  খেয়ে পেটের জ্বালা মিটিয়ে! রতন সেই দুমুঠো ভাত খেয়ে পেটের জ্বালা মিটিয়ে ঈদের আনন্দ ভোগ করার দলেরই একজন। রতনের বয়স এগারো  বছর।  জন্মের আগেই গাড়ি এক্সিডেন্টে বাবাকে হারিয়েছে। পৈত্রিক কোনো সম্পত্তি নেই। রুগ্ন মায়ের ঘরে এক বস্তিতে তার জন্ম৷ বাপ মরা রতনই তার মায়ের একমাত্র সম্বল, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।  তাই জন্মের পর সখ করে তার নাম রেখেছিল রতন। জীর্ণশীর্ণ বস্তিতেই বেড়ে উঠছে রতন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দীক্ষা নেই, তবে রয়েছে মায়ের শিখানো সততা, ন্যায়পরায়ণতা মনুষ্যত্বের গুনাবলি! পেটের দায়ে  রতন ফুটপাতের টোকাই। এ থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে রতন ও তার মায়ের  আহার জোগায়। রতনের রুগ্ন মায়ের অনেক দিনের ইচ্ছা গরুর গোস্ত দিয়ে ভাত খাবে। রতনের যে উপার্জন তা দিয়ে গরুর গোস্ত কিনার সামর্থ্য তার নেই৷ প্রায় সময় মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় রতনের অন্তর কাঁদে। আসলে  সবার জীবনের ইচ্ছেগুলো তো  চাহিবামাত্রই পূরণ হয় না! অনেকের দামি পোশাক-আসাক ,আয়েস ভোজনের ইচ্ছেগুলো অভাবের বেড়াজালে চাপা দিয়ে রাখতে হয়৷ রতনও তার ব্যাতিক্রম নই।  অর্থের অভাবে রতন তার মায়ের ইচ্ছেটুকু পূরণ করতে পারছে না। এদিকে  কুরবানির ইদ চলে আসছে৷ আর দু’দিন বাকি। রতনের ইচ্ছে জাগে নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা পড়ে সবার মতো  ইদগাহে যেতে। নতুন কাপড় পড়ে ঈদগাহে যাওয়ার আগে মাকে সালাম করে যেতে, মায়ের জন্য নতুন শাড়ি কিনে আনতে৷ তার উপার্জন থেকে নতুন শাড়ি কিনে মায়ের সামনে দাঁড়ালে মা কতই না খুশি হতো!  আহ, কতই না সুখময় হতো সেই মূহুর্তটা! যেন জান্নাতি আমেজে ভরে যেত আমাদের জীর্ণশীর্ণ কুঁড়েঘরটি! এসব ভাবতে গিয়ে মনের অজান্তেই  রতনের চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়লো। আগামীকাল কুরবানির ইদ৷ তার সপ্তাখানেক আগ থেকেই সামর্থবানরা কুরবানির জন্য গরু, ছাগল বেচাকেনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন । চারদিকে গরুর হাম্বা-হাম্বা ডাক কুরবানির ইদের আমেজ বয়ে আনে! ইদের আগেরদিন রাতে বিশেষ করে কম বয়সী ছেলে মেয়েদের আনন্দের সীমা থাকে না! সবাই মেহেদীর রঙে হাত রাঙায়। বন্ধু-বান্ধের আড্ডা জমায়।
সেদিন রাতে রতন ফুটপাত দিয়ে হেটে যাচ্ছে৷ দেখল একটু দূরে তার মতো কিছু  মানুষের ভীড়, সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কী হচ্ছে দেখার জন্য রতন সামনে এগিয়ে গেল । দেখল সফিক নামের এক ভদ্রলোক ইদের আনন্দ সবার মাঝে ভাগাভাগি করার জন্য অসহায় মানুষের মাঝে নতুন কাপড়, আর নগদ ৫০০ টাকা করে বিতরণ করছে এবং সবাইকে ইদের দিন দুপুর বারটার দিকে তার বাসা থেকে সবাইকে গোস্ত নিয়ে যেতে বলতেছে। রতন সবার মতো লাইনে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোকটির দেওয়া ইদ উপহার গ্রহণ করে লোকটিকে সালাম দিয়ে বলবো, ❝স্যার, আপনে অনেক ভালা মানুষ, আপনের মতো সক্কলে যদি আমগো মতো গরীব মাইন্সের পাশে দাঁড়াইয়া ইদের খুশি ভাগাভাগি কইরা নিত তাইলে আমরা মা বাপ লইয়া খুশিতে ইদ কাটাইতে পারতাম। কিছু কিছু মানুষ আছে ইদের দিন যেদের বাইত গোস্ত চাইতে গেলে কেউ কেউ দেয় আবার কেউ কেউ দুই-এক টুকরা দিয়া তাড়াই দেয়। স্যার, আমরাও তো মানুষ, আল্লাহ আমরারে গরীব বানাইছে দেইখা আপনাগো কাছে হাত বাড়াই। স্যার, দোয়া করি আল্লাহ আম্নেরে বাঁচাই রাখুক, অনেক বড় করুক!❞
নতুন কাপড় আর ৫০০ টাকা পেয়ে রতন খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল! সেই টাকা দিয়ে মায়ের জন্য নতুন একটা শাড়ি কিনে খুশি মনে বাড়ি গিয়ে মায়ের সামনে হাজির হলো।নতুন শাড়ির পেকেট মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বললো,❝ মা, এইডা তোমার লাইগা আনছি❞। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো ❝ট্যাকা কই পাইলিরে বাপ?❞ তখন রতন সফিক নামের ভদ্রলোকের দেওয়া ইদ উপহারের কথা জানালো। মা খুশি হয়ে লোকটির জন্য দুহাত তুলে দোয়া করলো। আহ,রাত পুহালেই ইদ! সকাল সকাল ওঠতে হবে, সেই তাড়া নিয়ে রতন তাড়াতাড়ি শুয়ে  পড়ে৷ নতুন জামা পড়ে ইদে যাবে সেই খুশিতে রতনের ঘুমই আসছে না। সেদিনের রাতটা যেন অন্যান্য  রাতের তুলনায় অনেকটা দীর্ঘ মনে হচ্ছিল! ফজরের আজন শুনতেই রতনের ঘুম ভেঙে যায়। বাধ ভাঙা খুশির আমেজ নিয়ে ঘর থেকে বের হলো, সকালের স্নিগ্ধ বাতাস বইছে। রতন এদিক ওদিন তাকিয়ে দেখছে পাশেপাশের লোকেরা কি এখনো ঘুমাচ্ছে? মনে মনে ভাবছে এরা কেমন মানুষ,  ইদের দিন সকালে কেউ ঘুমায় নাকি! রতনের এই খুশি দেখে পূব আকাশের রাঙা আভা যেন রতনকে ইদ মোবারক জানাচ্ছে! রতন মসজিদে শুনেছিল, ইদের দিন গোছল করা সুন্নত।  তাই সে তাড়াতাড়ি গোছল করে, সফিক সাহেবের দেওয়া নতুন কাপড় পড়ে মাকে সালাম করে। মা রতনের কপালে চুমু খেয়ে তার হাতে দুই টাকার একটা নোট তুলি দিয়ে বললো, ❝নে বাপ এইডা তোর ইদ সেলামি❞।  মায়ের কাছ থেকে পাওয়া দুই টাকাই যেন তরনের লাখ টাকার সমান। মায়ের দেওয়া দুইটাকা হাতে নিয়ে ইদগাহে গিয়ে নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে আশেপাশের  লোকের কুরবানি করা দেখে। কুরবানির এই আনন্দ যেন রতনের একার! তারপর এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে গোস্ত, রুটি নিয়ে বাড়ি যায়। মা -ছেলে মিলে গোস্ত রান্না করে সাদা রুটি আর গোস্ত খেয়ে  আত্মতৃপ্তি মিটায়। রতনের এই আনন্দ যেন তার ছোট্ট  কুঁড়েঘরে জান্নাতি আমেজ বয়ে আনে!

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT