রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

১১:৩০ অপরাহ্ণ

শিরোনাম
◈ শুভ্র’র খুনীদের ফাঁসির দাবিতে মুক্তিযোদ্ধা ও সন্তানদের মানববন্ধন ◈ ধর্ষণ মামলার আসামী শরীফকে সাথে নিয়ে পুলিশের অস্ত্র উদ্ধার ◈ টঙ্গীবাড়িতে মা ইলিশ ধরার অপরাধে ৯ জেলেকে কারাদণ্ড ১জনকে অর্থদণ্ড ◈ ধামইরহাটে প্রতিহিংসার বিষে মরলো ১৫ লাখ টাকার মাছ, আটক-২ ◈ হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী কুপি বাতি ◈ ভালুকায় কোটি টাকা মুল্যের বনভুমি দখল রহস্যজনক কারনে নিরব বনবিভাগ ◈ নেয়াখালীতে ছেলের পরিকল্পনাতেই মাকে পাঁচ টুকরো ◈ চারঘাটে দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু ◈ সিরাজগঞ্জের বেলকুচি ও চৌহালীতে ৩০ জেলের কারাদন্ড, ৩৩ হাজার মিটার জাল জব্দ ◈ ধুনটে গ্যাসের চুলার আগুনে ঘর পুড়ে ছাই

মহাসড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল

প্রকাশিত : ০৬:১৮ AM, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ Wednesday ২৩৫ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) বলছে, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাব দায়ী। সম্প্রতি মহাসড়কে ছোট যানবাহনের চলাচলও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এ জন্য ২০১৫ সালে মহাসড়কে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দেয় সরকার। একই বছর জাতীয় মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, হিউম্যান হলার, নছিমন, করিমন ও ভটভটি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। কিন্তু এসব কার্যকর হয়নি। যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন মহাসড়কে পুলিশের স্পিডগান সম্প্রতি দেখা গেলেও এখন তা নেই। ফলে ইচ্ছে মতো গতিতে চলছে সব ধরনের যানবাহন।

দুর্ঘটনা রোধে সড়ক-মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সঙ্কেত দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা, গতি নিয়ন্ত্রণ সঙ্কেত, সেতু এসবই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জনকণ্ঠের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মহাসড়কে নিয়মিত যেসব চালক গাড়ি চালান তাদের অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে। এদের অন্তত ১৭ জনই বলছেন, গাড়ি চালানোর সময় সঙ্কেত দেখার খুব একটা সুযোগ হয় না। অনেকের বক্তব্য এমনও মিলেছে, ইচ্ছে মতো গাড়ি চলে, সঙ্কেত বুঝি না। কারণ লেখাপড়া নেই। তাছাড়া ২০ জনের মধ্যে প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাতে বেশি গতিতে গাড়ি চালালেও কাউকে কোন জবাবদিহি করতে হয়নি। সেই সঙ্গে পুলিশ কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরেও কখনও পড়তে হয়নি। যে কারণে ইচ্ছে মতো গাড়ি চালানোর বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই দেখেন চালকরা।

কিন্তু গবেষণা তো বলছে, দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বেপরোয়া গতি। এসব গবেষণার কোন তথ্যও চালকদের কাছে নেই। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বাড়তি গতিতে গাড়ি চালানোর বিষয়ে যে খুব একটা নজরদারি হয় তা জোর দিয়ে বলতে পারেননি কোন চালক। সব মিলিয়ে দুর্ঘটনার সঠিক গবেষণা বা কারণ সম্পর্কে চালকরা অনেকটা অন্ধকারে। ঢাকা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক হলো চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ। এই পাঁচটি সড়কের বাস চালকদের সঙ্গে কথা বলে দুর্ঘটনা সম্পর্কে এমন চিত্র মিলেছে। নামী দামী পরিবহন কোম্পানির বাস চালকরাও জানেন না অনেক কিছুই। তারাও নিজের ইচ্ছাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে গাড়ি চালান।

এই প্রেক্ষাপটে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে যত পদক্ষেপ বাড়ছে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনার মাত্রাও। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে সঠিক কোন পরিসংখ্যানও নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে দেশীয় একেক প্রতিষ্ঠানের জরিপ একেক রকম। পরিসংখ্যান নিয়ে কিছুটা সংখ্যাগত পার্থক্য থাকলেও দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকারের বিষয়ে পরামর্শ বা সুপারিশ একই রকমের। অথচ এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের গতি মন্থর। তাছাড়া এর চেয়ে বড় সমস্যা হলো দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে একেক সময় একেক ধরনের সুপারিশ তৈরি হচ্ছে। ফলে কোন সিদ্ধান্তই এক নাগারে আলোর মুখ দেখে না। নতুন নতুন পরামর্শে পুরনো সবকিছু হারিয়ে যায়। নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে দেখা যায় না।

আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ॥ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই)-এর গবেষণা বলছে, দুর্ঘটনার পর মামলার পুলিশী প্রতিবেদনে ৬০টির মতো তথ্য উল্লেখ করতে হয়। এর মধ্যে দুর্ঘটনায় দায়ী কে, তাও চিহ্নিত করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাব দায়ী। সম্প্রতি মহাসড়কে ছোট যানবাহনের চলাচলও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এ জন্য ২০১৫ সালে মহাসড়কে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। একই বছর জাতীয় মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, হিউম্যান হলার, নছিমন, করিমন ও ভটভটি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আছে। কিন্তু এসব কার্যকর হয়নি।

জানা গেছে, গত বছর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে এআরআই দুটি প্রকল্পের পরামর্শ দেয়। একটিতে প্রতি দুই কিলোমিটার অন্তর স্পিড রাডারগান বসানো এবং ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন রাখার কথা বলা হয়। এই ব্যবস্থায় কোন গাড়ি গতিসীমা অমান্য করল কিনা, দুর্ঘটনায় পড়লে দ্রুত উদ্ধারসহ নানা ব্যবস্থা থাকবে। অন্যটি হচ্ছে চালকদের প্রশিক্ষক তৈরি এবং চালকদের প্রশিক্ষণ প্রদান। দুটি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। প্রথম প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আছে। দ্বিতীয়টির কোন অগ্রগতি নেই।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, সড়ক নিরাপদ করতে তিনটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি হয়েছে। একটা সাইন সঙ্কেত উন্নয়ন, বিশ্রামাগার নির্মাণ ও সড়কে অতিরিক্ত মালবাহী যান নিয়ন্ত্রণে ২৩টি ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন। পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু হবে। এর বাইরে সড়ক চার লেন ও ছয় লেনে উন্নীত করার প্রকল্পগুলোতে এখন ধীরগতির যানের জন্য আলাদা লেন করা হচ্ছে। তাতে দুর্ঘটনা কমবে বলেও মনে করেন তিনি।

চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ২৪ হাজার ৯৫৪ জন। ২০১৬ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। এই হিসাবে দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৬৮ জনের বেশি। যদিও বেসরকারী বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি দুর্ঘটনার সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলা হচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) তথ্যই বলছে, দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের ৬২ শতাংশে যথাযথ সাইন-সঙ্কেতের ব্যবস্থা নেই। জাতীয় মহাসড়কের অন্তত ১৫৪ কিলোমিটার মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। আর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব বলছে, দেশে প্রায় সাড়ে ৪১ লাখের বেশি যানবাহন চলছে। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা ৫ লাখের কাছাকাছি। একই সূত্র মতে, দেশে বিভিন্ন শ্রেণীর যানবাহনের জন্য চালক আছেন প্রায় ২০ লাখ। অর্থাৎ ২০ লাখ যানবাহন ‘ভুয়া’ চালক দিয়ে চলছে। অর্থাৎ ৫০ শতাংশের বেশি গাড়ি চলছে ‘ভুয়া’ চালক দিয়ে। গত বছরের আগস্টে সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামার পর শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। বিভিন্ন দফতর তাৎক্ষণিক কিছু তোড়জোড় শুরু করে থেমে যায়। ঘটা করে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করলেও খোদ ঢাকা শহরেই পরিবহনের বেহাল পরিস্থিতির ন্যূনতম কোন উন্নতি চোখে পড়েনি।

গত বছরের ২৫ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি আলোচনায় আনেন। ঈদযাত্রায় প্রাণহানির প্রসঙ্গ টেনে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচটি নির্দেশনা দেন। এগুলো হলো- দূরপাল্লার পথে বিকল্প চালক রাখা। যাতে একজন চালককে টানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি চালাতে না হয়। নির্দিষ্ট দূরত্বে সার্ভিস সেন্টার বা চালকদের জন্য বিশ্রামাগার করা। গাড়ির চালক ও তার সহকারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া। সিগন্যাল মেনে পথচারী পারাপারে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করা বা অবৈধভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ করা। চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা নিশ্চিত করা।

এই নির্দেশনার পর সওজ দুটি প্রকল্প নিয়েছে। একটি প্রকল্প হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রংপুর ও ঢাকা-খুলনা এই চার মহাসড়কের চারটি স্থানে বিশ্রামাগার নির্মাণ। এগুলো কুমিল্লার নিমসার, হবিগঞ্জের জগদীশপুর, সিরাজগঞ্জের পাঁচিলা ও মাগুরার লক্ষ্মীকান্দর নামক স্থানে স্থাপন করা হবে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটি এখন পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায়। এ ছাড়া ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে যথাযথ সাইন-সঙ্কেত বসাতে ৬৩২ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প নিয়েছে সওজ। এটিও পরিকল্পনা কমিশনে আছে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কাজ করা বেসরকারী সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই বলছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে। আর অবৈধ যানবাহন ও চালকদের বেপরোয়া মানসিকতার কারণেই দুর্ঘটনার হ্রাস টানা যাচ্ছে না। অথচ প্রায় তিন বছর আগে দেশের ২২টি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার এ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই মূল কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বার্থে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরী। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে মহাসড়কে ৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি চলাচল করতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি ২২ মহাসড়কে নিষিদ্ধ যানবাহন যেন ফের চলাচল করতে না পারে সে ব্যাপারে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-খুলনাসহ সব গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে নিষিদ্ধ যানবাহন চলছে অবাধে। শুধু তাই নয়- উল্টো পথে দিব্যি এসব পরিবহন চলাচল করলেও কারও নিয়ন্ত্রণ নেই!

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ঢাকা-আরিচা জাতীয় মহাসড়কের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সোজা করা হয়েছে। এছাড়া, সারাদেশের মহাসড়কে ১৪৪টি দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক চিহ্নিত করে ১৩০টি বাঁক জটিলতার নিরসন করা হয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সরকার বিভিন্ন সময়ে ছোট বড় অনেক সিদ্ধান্ত নিলেও সবই পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, পরিবহন সেক্টরের মালিক ও শ্রমিক নেতারা সরকারের অংশীদার। তারা যদি প্রকৃতপক্ষে সরকারকে সহযোগিতা করতে চায় তাহলে জনস্বার্থে নিষিদ্ধ যানবাহন মহাসড়কে চলাচল বন্ধ করতে পারে। কিন্তু দেখা যায় তারা সহযোগিতার বিপরীতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় না।

সিআইপিআরবি’র জরিপ ॥ স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীন সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) সম্প্রতি একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয় এবং তার জের ধরে পরে মৃত্যুবরণ, এমন মানুষের সংখ্যা গড়ে প্রতিদিন ৬৪ জন। ২০১৬ সালে এর মোট সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ১৬৬ জন। এর বাইরে সড়ক দুর্ঘটনায় অন দ্য স্পট মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বুয়েটের এ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই), প্রতিবেদন অনুসারে ১৯৯৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ২৩ বছরে মোট ৮৪ হাজার ৪৩৫টি দুর্ঘটনায় অন দ্য স্পট মৃত্যু হয়েছে ৬৪ হাজার ১১২ জন মানুষের। বছরে গড়ে দুই হাজার ৭৮৭ জন, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে আটজন। বিভিন্ন রকমের দুর্ঘটনার কারণে বছরে প্রায় দুই কোটি লোক আহত হয়, যার মধ্যে দুই লাখ ৪১ হাজার মানুষ ছোট বড় পঙ্গুত্ববরণ করে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত আহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ।

দিন দিন বাড়ছে সড়কে বিশৃঙ্খলা ॥ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক সড়ক দুর্ঘটনা কারণ হিসেবে বলেন, গাড়ি কমেনি। দিন দিন বিশৃঙ্খলা বাড়ছে সকল সড়ক-মহাসড়কে। সড়কের ভূমি ব্যবহার বৃদ্ধিসহ নছিমন, করিমন ও অযান্ত্রিক গাড়ি চলাচলের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে সমান তালে। অবৈধ চালক, ফিটনেসবিহীন পরিবহনের সংখ্যাও কমেনি। বছরে ৮-১০ ভাগ গাড়ি বাড়ছে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বলছে, ২০১৮ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ মৃত্যু ঘটেছে গাড়ি চাপায়। বিদায়ী বছরে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা মহানগরসহ আশপাশের এলাকায়। হাইওয়েতে ছোট ছোট অবৈধ যানবাহন দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

নিসচা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে দ্রুত বাস্তবায়ন করলে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ২০১১ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। তবে যাত্রী কল্যাণ সমিতি এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২২১ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করে।

সংগঠনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৪ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে দুই বাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে। ৭ ভাগ গাড়ি উল্টে, ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে গাড়ি খাদে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনায় যাদের প্রাণ গেছে, তাদের মধ্যে ৫৬৬ জনই চালক। এর মধ্যে মোটরসাইকেল চালকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১৬০ জন। এছাড়া ৬৪ বাসচালক ও ৫৯ ট্রাকচালক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন গতবছর।

২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ঢাকা মহানগর ও আশপাশের এলাকায়। ৩৩৯টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৩৪৬ জনের। ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে বড় বড় শহর ও হাইওয়েতে। ছোট ছোট অবৈধ যানবাহন যেমন ভ্যান, রিক্সা, নছিমন ও অটোরিক্সার জন্য দায়ী। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন অমান্য করে ধীরগতির বাহন মহাসড়কে এখনও চলাচল করে যা দূরপাল্লার বড় গাড়িগুলোর চলাচলে বিঘœ ঘটায়। অবৈধ যানবাহন চলাচলে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতাও আছে।

সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, আমরা কখনই চাই না সড়কে দুর্ঘটনা হোক। মানুষের মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে পড়তে চাই না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বারবার নিয়ম মেনে গাড়ির গতি নির্ধারণ করতে বলা হচ্ছে। এজন্য হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা রোধে সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা বাস্তবায়নের পাশাপাশি সমিতির নিজস্ব কিছু উদ্যোগও কার্যকর করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সড়কে অরাজকতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। তাই রাতারাতি সব বদলে যাবে এমন ধারণা ঠিক নয়। তবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুর্ঘটনা সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলেও মনে করেন এই পরিবহন নেতা।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই বিভাগের জনপ্রিয়

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT