রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

০৪:৪৪ পূর্বাহ্ণ

বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি

প্রকাশিত : ০৬:০৫ AM, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ Wednesday ৩২০ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

কম খরচে গ্রাহককে একেবারে পিনপয়েন্ট করে বিজ্ঞাপন প্রচারের উপায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বর্তমান ডিজিটাইজেশনের যুগে দুনিয়াজুড়েই জনপ্রিয় হচ্ছে বিজ্ঞাপন প্রচারের এই মাধ্যমটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্যেও হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতি বছর ফেসবুক, ইউটিউব এবং গুগল বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকারও বেশি আয় করে। পুরোখাতের হিসাব করলে বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রাচরণার বাজার প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। যার বেশিরভাগ অংশই ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়াই বাইরে চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি ডিজিটাল সেগমেন্টের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, তিনটি বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর সা¤প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন বাবদ ১০৪ কোটি ডলার বা ৮ হাজার ৭৪৪ কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ করেছে!

সূত্র মতে, নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এখান থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং অগ্রিম আয়করের ৪ শতাংশ পাওয়ার কথা। কিন্তু সরকার ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিতে চলমান বিজ্ঞাপনগুলি থেকে ভ্যাটের উল্লেখযোগ্য পরিমাণই পায় না। এছাড়া নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার তিন মাস পরেও সরকার তার কর নেটওয়ার্কের আওতায় ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ গত ২৬ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড- এনবিআর এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটারসহ ইউটিউব ও গুগল ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে এসব কোম্পানিকে হয় বাংলাদেশে অফিস স্থাপন করতে হবে, অথবা মূসক এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে। আর এজেন্টরা ব্যবসা পরিচালনা বাবদ বাংলাদেশ সরকারকে রাজস্ব প্রদান করবে। এই বিজ্ঞপ্তির পর প্রায় ৩ মাস অতিবাহিত হয়েছে। পাশাপাশি গত ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু নিবন্ধন বা এজেন্ট নিয়োগে কোন অগ্রগতি নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে এনবিআর ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনতে পারলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জণে ব্যার্থতার কিছুটা হলেও কমবে। একই সঙ্গে এই টাকা যাতে কোনভাবেই বেহতা না হয় সেদিকে অর্থমন্ত্রণালয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কোন ধরণের ভুল তথ্য বা বিজ্ঞাপন বাবদ আয়ের তথ্যে কোন গড়মিল আছে কিনা তা তদারকিসহ অর্থমন্ত্রণালয় এবং এনবিআরকে পরামর্শ দিবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতে আসলে কতো খরচ হচ্ছে? আসলেই বছরে কতো টাকা চলে যাচ্ছে ফেসবুক-গুগল-ইউটিউব-ইয়াহু বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যাকাউন্টে? এর কতোটাই বা সঠিক পদ্ধতিতে ব্যাংকিং চ্যানেলে ওই সব প্ল্যাটফর্মের অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে? তা খতিয়ে দেখা দরকার।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা বলছেন, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব বা গুগলের মতো জনপ্রিয় মাধ্যম থেকে এখন তেমন ভ্যাট পাওয়া যায় না। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের মূসক নিবন্ধন নেই। এজন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে মূসক এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে। নিবন্ধন এসব প্রতিষ্ঠানের নামে হলেও মূসক এজেন্ট ওই প্রতিষ্ঠানের হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, নতুন ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২’ আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী ফেসবুক, ইউটিউব, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানকে মূসক নিবন্ধন নিতে হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে অফিস স্থাপন অথবা মূসক এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে।

এদিকে অর্থ আইন, ২০১৭ এর মাধ্যমে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ধারা ৫৬ (সংশোধন) অনুযায়ী ডিজিটাল মার্কেটিং সেবা গ্রহণ করলে ভোক্তাকে বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার খরচের উপর ১৫ শতাংশ হারে আয়কর প্রদান করতে হবে। ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে আয়করের এই পরিপত্র জারি হলেও, তা মানছে না- ইমামি, কোকাকোলা বাংলাদেশ, টিভিএসসহ অধিকাংশ ভোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলো। যদিও ইতোমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খঁতিয়ে দেখছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সূত্র মতে, দেশের একটি গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করলে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পায় সরকার। সঙ্গে ৪ শতাংশ পায় অগ্রিম আয়কর হিসেবে। কিন্তু, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন প্রচার করলে অনেক ক্ষেত্রেই ট্যাক্সের এই অংককে এড়িয়ে যাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফেসবুক, গুগল বা ইউটিউবে বিজ্ঞাপন প্রদানের জন্যে মূল খরচের সঙ্গে যেমন ভ্যাট প্রদান করতে হয়, তেমনি সারচার্জও প্রদান করতে হয়। তবে এসব নিয়মের কোন তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো। ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের নামে এই অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে নড়েচড়ে বসেছে সরকার। সিআইডি’র তদন্তে অপরাধ প্রমানিত হলে এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা-বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা।

সূত্র মতে, বাচ্চাদের জন্যে টিউটর খোঁজা থেকে শুরু করে চুল কাটানো, লন্ড্রি সেবা, বাসার বুয়া বা সিএনজি খোঁজ খবরও আছে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের কাতারে। ই-কমার্স বা ফেসবুকের ওপর নির্ভর করে যারা ব্যবসা করছেন সেই এফ-কমার্সও শতশত ডলার খরচ করছে তাদের পণ্যের খবর বুস্ট করতে। ফলে বাংলাদেশ থেকে শতশত কোটি টাকা আয় করলেও এখান থেকে সরকারের আয়ের অংক সামান্যই।

অনুসন্ধানের জানা যায়, ফেসবুক ও গুগল মিলিয়ে ইমামি বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। যা থেকে সারচার্জ হিসেবে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা সারচার্জ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে একটি টাকাও আয়কর কর্তন বা সারচার্জ হিসেবে প্রদান করা হয়নি। কোকাকোলা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অর্থের পরিমান আরও বেশি।
সূত্র জানিয়েছে, কোকাকোলা বাংলাদেশ প্রায় অর্ধ কোটি টাকার সারচার্জ প্রদান করেনি। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই একের পর এক ক্যাম্পেইন ও বিজ্ঞাপন প্রদান করে আসছে ফেসবুক ও গুগলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইউই’র ওই কর্মকর্তা বলেন, মাসেই প্রায় কয়েক কোটি টাকার সারচার্জ ফাঁকি দিয়ে ফেসবুক ও গুগলে বিজ্ঞাপন দিয়ে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো। যা শুধু আয়কর আইনের লঙ্ঘনই নয়, অর্থ পাচারের ঘটনাতেও অপরাধ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচারণার পুরোটাই চলছে বাংলাদেশের মধ্যে, নির্দিষ্ট বয়স বা এলাকার গ্রাহককে টার্গেট করে। অথচ দারাজ সিআইডিকে বলেছে, তারা দেশের বাইরে বসে এই খরচ করে। একই তালিকায় আছে উবারের মতো আরো বিদেশি ডিজিটাল সেবা কোম্পানি। তাছাড়া নামে দেশীয় মনে হলেও সিঙ্গাপুর বা অন্য কোথাও বসে চালাচ্ছেন এমন কোম্পানিও একই সুবিধা নিচ্ছে।

ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, অবস্থান যেখানেই হোক না কেনো, যেহেতু বাংলাদেশে সেবা বিপণন করছে এবং বাংলাদেশের মানুষের মাঝেই প্রচারণা চালাচ্ছে তাই এখানে অফিস খুলতেই হবে এবং সরকারকে তার প্রাপ্য দিতেই হবে।
রাশিদুল ইসলাম বলেন, এক্ষত্রে বাংলাদেশের একটি বড় শক্তির জায়গা হলো আমাদের বাজারের আকার। এখন দেশে সাড়ে তিন কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন। এই অংকও বছরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হারে বাড়ছে। গুগলের নানা প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এর চেয়েও বেশি মানুষ। এতো বড় বাজার ওই সব কোম্পানি খুব কম দেশেই পায়। সুতরাং আমাদের শক্তির জায়গাটি ধরে সমাধানের পথ খোঁজা যেতে পারে।

দীর্ঘদিন এই খাতের সঙ্গে যুক্তরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন বছরে অন্তত দুই হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল প্রচারণার বাজার। একই সঙ্গে বাজারটি প্রতি বছরই ফেসবুকের প্রবৃদ্ধির মতো করেই বড় হচ্ছে। কিন্তু,গত পাঁচ বছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে ফেসবুক আর গুগলের অ্যাকাউন্টে মাত্র ১৩৫ কোটি টাকা গেছে। অথচ ২০১৪ সাল থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অথচ গ্রামীণফোন-রবি-বাংলালিংক যে হিসাব দিয়েছে তাতে এই খাতে তাদের সম্মিলিতভাবে ব্যয় ৪৩৫ কোটি টাকা।

ব্যাংকের হিসাবে বলছে, ফেসবুক-গুগলের বাইরে আর একটি মাত্র অ্যাকাউন্টে দেশে থেকে টাকা গেছে। ব্যাংকের হিসাবে নেই ইয়াহু বা ইমোর নাম। অথচ মোবাইল ফোন অপারেটররা তাদের ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের প্রচার খরচের কথা বলছে তাও ব্যাংকিং চ্যানেলে যায়নি বাকী ৩শ’ কোটি টাকা।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT