রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০, ৬ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

০৭:২৭ পূর্বাহ্ণ

বৈধদেরও ফেরত পাঠাচ্ছে সৌদি

প্রকাশিত : ০৮:০০ AM, ৭ অক্টোবর ২০১৯ Monday ১০২ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

মাস পাঁচেক আগে চার লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে যান কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর যুবক মো. রুবেল। পাঁচ মাসের মাথায় গত শনিবার রাতে আরও ১১৯ বাংলাদেশি কর্মীর সঙ্গে খালি হাতে দেশে ফেরেন তিনি। রুবেলের আকামা ও ভিসার মেয়াদসহ প্রয়োজনীয় সব বৈধ কাগজ থাকার পরও সৌদি পুলিশ তাকে আটক করে দেশে ফেরত পাঠায়। তার মতো অন্তত ১২ হাজার বাংলাদেশিকে চলতি বছরে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি আরব, যাদের অধিকাংশেরই ছিল বৈধ কাগজ।

সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ সমকালকে বলেছেন, বাংলাদেশি কর্মীদের ধরে ধরে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। আগামী মাসে দুই দেশে জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির বৈঠকে ইস্যুটি শক্তভাবে তুলে ধরবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশি কর্মীদের কেন ফেরত পাঠাচ্ছে সৌদি আরব- এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রদূত বলেছেন, সে দেশের সরকারের অভিযোগ, তারা চাকরি না করে রাস্তায় হকারের কাজ করছে, সবজি বিক্রি করছে। সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ অভিযোগ ঠিক। তবে কর্মীরা বলছেন, তারা চুক্তি মেনেই চাকরি করছেন। তাদের এ দাবির সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ কম।

রুবেল সমকালকে জানিয়েছেন, গত ১০ মে তিনি সৌদি আরব যান। এক মাস পর মক্কায় আল-রাইমিনা নামে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি পান। মাসিক বেতন ছিল হাজার পঁচিশেক টাকা। ভালোই কাটছিল তার দিন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর কাজ থেকে ফেরার পর মেসের কাছের দোকানে গিয়েছিলেন সদাই করতে। সেখানে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

কী অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল- তা এখনও জানেন না রুবেল। তিনি সমকালকে বলেছেন, অভিযোগ আরবিতে লেখা ছিল। গ্রেফতারের পর তাকে ডিপোর্টেশন ক্যাম্পে রাখা হয়, যা সফর জেল নামে পরিচিত। সেখানে সৌদি আরব দূতাবাসের কর্মকর্তারা এসেছিলেন। তাদের কাছ থেকে জানতে পারেন, তার বিরুদ্ধে রাস্তায় সবজি বিক্রির অভিযোগ আনা হয়েছে। রুবেলের নিয়োগকারী কর্মকর্তাও কিছু করেননি। কারণ, এর আগেই তাকে দেশছাড়া করতে তার আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়।

শুধু রুবেল নন, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব থেকে ফেরা বাংলাদেশি কর্মীদের প্রায় সবার গল্প একই রকম। গত বৃহস্পতিবার ১৩০ জন ও শনিবার রাতে ১২০ জন দেশে ফিরেছেন। তাদের আটজনের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। শুধু একজন জানিয়েছেন, তার বৈধ কাগজ ছিল না। বাকিরা জানিয়েছেন, আকামার মেয়াদ থাকার পরও পুলিশ ধরে ফেরত পাঠিয়েছে।

রুবেল জানান, চার মাস চাকরি করে এক লাখ তুলতে পেরেছেন। এখনও তিন লাখ টাকা ঋণ। তিনি সৌদি যাওয়ার পুরো খরচই জোগাড় করেছিলেন ধারদেনা করে। সৌদি যেতে রিক্রুটিং এজেন্সি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ওভারসিজকে দিয়েছেন নগদ সাড়ে তিন লাখ টাকা। বাকি ৫০ হাজার টাকা খরচ হয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও আনুষঙ্গিক খাতে। যদিও সৌদি আরব যেতে সরকার নির্ধারিত ব্যয় এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় অতীতে অনেকবার উদ্বেগ প্রকাশ করলেও এ অপরাধে খুব কম এজেন্সিকেই শাস্তি পেতে হয়েছে।

রুবেলকে সৌদি আরবে পাঠানো ব্রাহ্মণবাড়িয়া ওভারসিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এন হুদা খাদেম সমকালকে বলেছেন, সরকার নির্ধারিত টাকা তারা নিয়েছিলেন। বাড়তি টাকা রুবেল কাকে দিয়েছেন, তা তার জানা নেই। মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় রুবেলের দেশে ফেরার প্রসঙ্গে খাদেম দুলাল বলেন, এ বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই। কর্মী বিদেশ যাওয়ার পর তার সঙ্গে নিয়োগ কর্মকর্তা বা নিয়োগকারী দেশ জোরজুলুম করলেও রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিকার করার ক্ষমতা নেই। এসব দেখতে হবে দূতাবাসকেই।

নবনিযুক্ত প্রবাসীকল্যাণ সচিব মো. সেলিম রেজা বলেছেন, সৌদি থেকে কর্মীদের দেশে ফেরার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে রয়েছে। বৈধ কাগজধারী কোনো কর্মী যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে লক্ষ্যে কাজ চলছে।

ঝিনাইদহের শৈলকূপার জাহাঙ্গীর হোসেন ২০১৭ সালের জুনে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। তিনি জানান, ছয় লাখ টাকা ব্যয় করে গিয়েছিলেন। এখনও দেড় লাখ টাকা দেনা রয়েছে। ওয়াইনকন নামে একটি শরবতের দোকানে তিনি কাজ করতেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর তাকে কাজে যাওয়ার পথে গাড়ি থেকে আটক করা হয়। তখরও তার আকামার মেয়াদ ছিল ৯ মাস। সফর জেলে ২০ দিন রাখার পর তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তার সঙ্গে মানিকগঞ্জের তিন তরুণ ছিলেন, যারা দিন পনেরো আগে সৌদি গিয়েছিলেন। জেলে থাকার সময় দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের কর্মকর্তারা এসেছিলেন। তাদের হাতে-পায়ে ধরেছেন। কিন্তু তারা কোনো কথা শুনতেই রাজি ছিলেন না।

এ অভিযোগের জবাবে রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেছেন, রিয়াদ, জেদ্দা ও দামাম জেল পরিদর্শনের অনুমতি রয়েছে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের। সৌদি আরবে ২২ লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন। কিন্তু দূতাবাসের সব মিলিয়ে জনবল মাত্র ৭২ জন। শ্রম উইংয়ে রয়েছেন ১৬ জন। এত কম জনবল দিয়ে কর্মীদের সব অভিযোগ শোনা ও নিষ্পত্তি করা যায় না।

রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশি কর্মীদের দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে অভিযোগ পেলে সৌদি সরকারের কাছ থেকে জবাব নেওয়া হয়। সৌদি সরকার ভিডিও ও ছবিসহ দূতাবাসকে প্রমাণ দিয়েছে, দেশে পাঠানো কর্মীরা ভিক্ষাবৃত্তি ও হকারের কাজ করছে। এসব ক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে আর এগোনো সম্ভব হয় না। কিন্তু এক মাসেরও কম সময় আগে সৌদি যাওয়া কর্মী কী করে হকারের কাজ করে- এ প্রশ্নে গোলাম মসিহ বলেন, এমন কোনো কর্মী থাকলে তার বিষয়টি অবশ্যই জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির বৈঠকে তোলা হবে।

সৌদি ফেরত কর্মী ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সমকালকে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এ তেলসমৃদ্ধ দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। সৌদিতে বিদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে গাড়ির বিক্রয়কর্মী, তৈরি পোশাক ও আসবাবপত্র এবং বাড়ির সরঞ্জামের দোকানসহ ১১টি খাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ নিষিদ্ধ করে সৌদি আরব। দক্ষ কর্মী না থাকায় পেশাভিত্তিক কাজগুলোতে বাংলাদেশিরা নিয়োগ পায় না। কম বেতনের ‘অড জব’ করেন তারা। তবে ইদানীং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সৌদির নাগরিকরা এ ক্ষেত্রেও কাজ খুঁজে নিচ্ছেন। এ অবস্থায় কর্মীদের সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দরকার।

২০১৭ সালে পাঁচ লাখ ৫১ হাজার ৩০৮ বাংলাদেশি কর্মী সৌদি যান। পরের বছরে যান দুই লাখ ৫৭ হাজার ৩১৭। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত গিয়েছেন দুই লাখ ৩৪ হাজার ৭১ জন। ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্যানুযায়ী চলতি বছরে প্রায় ১২ হাজার কর্মী দেশটি থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরও বহু কর্মী নিজ উদ্যোগে ফিরে এসেছেন। তাদের সংখ্যাটি অজানা।

ব্র্র্যাক মাইগ্রেশনের প্রধান শরিফুল হাসান বলেছেন, নানা কারণে কর্মীরা দেশে ফেরেন। কিন্তু সম্প্রতি যেসব কর্মী সৌদি থেকে ফেরত আসছেন, তাদের বিষয়টি আলাদা। অনেকেরই বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। অনেকে বিদেশ যাওয়ার খরচও তুলতে পারেন। কেন তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তার কারণ অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই বিভাগের জনপ্রিয়

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT