রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

রবিবার ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বুয়েটের হলে হলে টর্চার সেল

প্রকাশিত : ০৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ, ৯ অক্টোবর ২০১৯ বুধবার ৫৯ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :
alokitosakal

আবরার ফাহাদের মৃত্যুর ঘটনাটি সামনে এলেও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ে (বুয়েটে) শিক্ষার্থীদের নির্যাতন নতুন কিছু নয়। নীরবে র‌্যাগিং চলে সেখানে। নবীন শিক্ষার্থীদের চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়। নির্যাতনে শিউরে ওঠার মতো তথ্য বেরিয়ে আসছে বুয়েট শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। বুয়েটের প্রতিটি হলেই রয়েছে টর্চার সেল। ছাত্রদের ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতন করা হয়। টর্চার সেলে নির্যাতনের জন্য স্ট্যাম্প, লাঠি, ছুরি রয়েছে। বৈদ্যুতিক শকও দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের। বেশকিছু কক্ষে মদসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যও রয়েছে বলে জানায় শিক্ষার্থীরা।
দেশসেরা মেধাবীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এক বাক্যে ধরে নেওয়া হয় বুয়েটকে। সেই প্রতিষ্ঠানে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মেধাবী আবরার ফাহাদকে (২১) নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সবার মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে আসছে, আহা! এমন মেধাবী ছেলেটা অকালে চলে গেল। আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবির অন্যতম হচ্ছে বুয়েটে র‌্যাগিং বন্ধ করা। শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়েছে, আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগিংয়ের নামে ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে আহসানউল্লাহ হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোতে জড়িত সবার ছাত্রত্বও বাতিল হবে। এ জন্য সময়ও বেঁধে দিয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। আজ বুধবার বিকাল ৫টার মধ্যে এই দাবি পূরণ করতে হবে।

বুয়েটের শেরে বাংলা হলের যে কক্ষে আবরারকে নির্যাতন করা হয় সেই ২০১১ নম্বর রুমটি ভয়ঙ্কর এক আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে। পাঁচতলা ভবনের দোতলার শেষ দিকে রুমটি। বাইরে থেকে অন্য সব রুমের মতো মনে হলেও ছাত্রদের কাছে এটি একটি টর্চার সেল। বুয়েটে এই রুমটি ছিল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পার্টি সেন্টার। কক্ষটি ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কক্ষ হিসেবে পরিচিতি পায়। ছাত্রদের ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে এখানে নির্যাতন করা হতো। কক্ষটি থেকে স্ট্যাম্প, লাঠি, মদ এবং ছুরি পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীরা জানায়, কক্ষটিতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রায় প্রতি রাতেই পার্টি করত। তারা সেখানে নেশাও করত। সেই কক্ষ থেকে মধ্যরাতে নেশাগ্রস্তদের চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যেত। আশপাশের কক্ষের শিক্ষার্থীদের সমস্যা হলেও কেউ কিছু বলতে সাহস করেনি। বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানত বলেও দাবি করে তারা।

জানা গেছে, বুয়েটের সবগুলো আবাসিক হলেই একটি করে টর্চার সেল রয়েছে। বুয়েটে ছেলেদের আবাসিক হলগুলো হচ্ছে আহসানউল্লাহ হল, তিতুমীর হল, ড. এমএ রশিদ হল, কবি নজরুল ইসলাম হল, শেরে বাংলা হল, সোহরাওয়ার্দী হল, শহীদ স্মৃতি হল। বুয়েটে ছাত্রীদের জন্য একটি হল রয়েছে। ছাত্রীদের হলেও আছে চর্টার সেল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ছাত্রী জানায়, মেয়েদের হলেও নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের কথা বললে বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। এই ভয়ে কেউ মুখ খুলে না। বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বেনামে চিঠি দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আবরারের মৃত্যু শিক্ষার্থীদের চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শেষ পর্যায়। এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই র‌্যাগিংয়ের নামে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরছেন। ফেসবুকে একজন লিখেছেন, ‘১২ বছরের শিক্ষাজীবন এবং তারপর তিন মাসের কঠোর সাধনা শেষে স্বপ্নের ক্যাম্পাসে আসা। উচ্চশিক্ষার দুয়ারে এসেই এ কোন পরীক্ষা? র‌্যাগিং নামের সেই অভিশাপের মুহূর্তটির কথা মনে হলেও ঘুম ভেঙে যায়। ক্যাম্পাসে সিনিয়রদের সাময়িক আনন্দের খোরাক এই র‍্যাগিং।’

দেশে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে র‌্যাগিংয়ের কুখ্যাতি আছে। সেখানে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন র‌্যাগিং নিষিদ্ধ করলেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এর শিকার হয়ে থাকে। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় (শাবিপ্রবি), দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয়।

বিশ^বিদ্যালয়গুলোকে সমাজের মডেল হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ক্যাম্পাসে যদি ভিন্নমত না থাকে তাহলে তো আমরা ভয়ঙ্কর অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি। সমাজে ভিন্নমত দাবিয়ে রাখার প্রবণতা খুবই ভয়ঙ্কর। অনেক বছর বুয়েট থেকে এমন খবর আমরা পাইনি। সেখানে শান্ত পরিস্থিতি ছিল। হলের মধ্যেই ছেলেটি খুন হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। একই হলে আছে। তাকে এভাবে হত্যা করলÑ সে তো ফেসবুকে তার মত প্রকাশ করেছে। একটা মত তো দিতেই পারে। নানান জনের নানা মত থাকবেই।

তার মতে, এগুলো প্রমাণ করে আমাদের সমাজে টলারেন্স এখন নিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে। আরেকটি কারণ আমি সবসময়ই মনে করি, আমাদের বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে পরিবেশটা মোটেই সুস্থ না। এর কারণ হচ্ছে, এখানে ভিন্নমত নেই। এখানে যেটা হয় সেটা হলো, সরকারি দলের আধিপত্য, তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। যদি সেখানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকত তাহলে এমন ঘটনা ঘটত না।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT