রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

সোমবার ১২ এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

০৯:১০ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম
◈ করোনার দ্বিতীয় টিকা নিলেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান – মোফাজ্জল হোসেন খান ◈ কাভার্ডভ‌্যান চাপায় না.গ‌ঞ্জ সিআইডির কন‌স্টেবল নিহত ◈ নারায়ণগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে মিলছে দুধ ডিম মাংস ◈ ধামইরহাটে নর্থওয়েষ্ট ক্যাবল নেটওয়ার্কে তালা, ভোগান্তিতে স্যাটেলাইট গ্রাহকরা ◈ ধামইরহাটে ২য় ধাপের করোনা মোকাবিলায় তৎপর প্রশাসন করোনায় আক্রান্ত স্বাস্থ্য প্রশাসক ও মুক্তিযোদ্ধা আইসোলেশনে ◈ দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিলেন  গৌরীপুরের গণমাধ্যমকর্মীরা ◈ ইউএনও’র মোবাইল নাম্বার ক্লোন করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টাকা দাবি ! ◈ রাজারহাট উপজেলা ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স এর শুভ উদ্বোধন ◈ শ্রীনগরে বাড়ৈগাঁও-পশ্চিম নওপাড়া সড়কটি এখন মৃত্যুকুপ! ◈ তিতাসে গোমতী নদীর পাড় ও ডিম চরের মাটি যাচ্ছে ইট ভাটায়

বিশ্ব পানি দিবস আজ

প্রকাশিত : ০২:১৩ AM, ২২ মার্চ ২০২১ সোমবার ৫০ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

সাইফুল ‍ইসলাম সিফাত
স্বচ্ছ টলমলে জল। পালতোলা নৌকা। জেলের জালে ভরপুর মাছ। চোখ আটকে যাওয়া ডলফিন, শুশুকের দুরন্তপনা। ধলেশ্বরীর সেই চেনা ছবি এখন রূপকথা!

দূষণ কেড়ে নিয়েছে ধলেশ্বরীর প্রাণ। নদীতে যতটুকু পানি আছে রং পুরোটাই কুচকুচে কালো। রাসায়নিক বর্জ্যের থাবায় বর্ষায়ও কালো দেখায় ধলেশ্বরীর পানি। জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও বিপন্ন। দুর্গন্ধে নদীর পারে যেতে মানা! মাছ, জেলের কাছে এখন ‘সোনার হরিণ’। পানি ছুঁলেও চুলকায়। চামড়াপল্লীর বর্জ্যবিষে ধলেশ্বরীর চারপাশটাই এ রকম ‘বিভীষিকাময়’। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) পরিচালিত সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর সব ধরনের বিষাক্ত বর্জ্য নির্বিচারে ফেলা হচ্ছে ধলেশ্বরীতে। আর হেমায়েতপুরের পদ্মামোড় থেকে শুরু করে হরিণধরা গ্রাম পর্যন্ত দেড় শতাধিক গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, ব্যাটারিসহ বিভিন্ন কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি সরাসরি পড়ছে এই নদীতে।

চামড়াপল্লীর অবকাঠামো ও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) কাজ ১৭ বছরেও শেষ করতে না পারায় বর্তমানে তিলে তিলে ধুঁকছে ধলেশ্বরী। পরিবেশদূষণ আর বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে সরকার রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়াপল্লী স্থানান্তর করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। উল্টো এক নদী বাঁচাতে গিয়ে আরেক নদী মরছে।

চামড়াপল্লী ছাড়াও ব্যক্তিমালিকানায় স্থাপিত বহু শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য ধলেশ্বরীতে ফেলা হচ্ছে। বর্জ্যের মাত্রাতিরিক্ত দুর্গন্ধে কোনো কোনো এলাকার মানুষ তার আবাসস্থল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে আবার সীমাহীন কষ্ট সইয়ে দুর্গন্ধময় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবন যাপন মেনে নিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ট্যানারির বর্জ্যের কারণে ধলেশ্বরীর উত্তাল যৌবন যেমন আর নেই; তেমনি নেই কর্মমুখর মানুষের জীবনও। ফলে নদী মরার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবন-জীবিকাও মরতে বসেছে। ধলেশ্বরী যেন চামড়াপল্লীর কলঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পানি যেমন কালো দুর্গন্ধময়, একই সঙ্গে পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে পোড়া মবিল আর ট্যানারির রাসায়নিক বর্জ্য। ট্যানারির কেমিক্যালের বর্জ্য মোটা পাইপের মাধ্যমে নদীতে গিয়ে পড়ছে। এ ছাড়া নদীতে ভাসছে হাজার হাজার পলিথিনের ব্যাগ আর ট্যানারির উচ্ছিষ্ট।

যেভাবে শুরু : ২০০৩ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে ৬০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করে চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার কাজ শুরু করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। তবে প্রাথমিক অবকাঠামোর কাজ শুরু হয় ২০০৭-০৮ অর্থবছরে। এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি এই শিল্পনগরী। অবকাঠামো খাতের কাজ প্রায় শেষের দিকে হলেও সিইটিপি ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থার কাজ শেষ না হওয়ায় ধলেশ্বরী নদী দূষণের কবলে পড়েছে।

হতাশ ধলেশ্বরী পারের মানুষ : ‘ধলেশ্বরী নদীতে মাছ ধরে আমগো জীবন চলত। অহন নদীর পানি নষ্ট হয়া গ্যাছে। মাছ তেমন পাওয়া যায় না। দুই-চারটা পাওয়া গেলেও তাতে ঘা থাকে। নদীতে নামলে শরীর চুলকায়। মাছ বিক্রি করে ওষুধের পয়সাও হয় না। বাধ্য হয়ে অনেকেই পেশা বদলাইতেছে।’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সাভারের পানপাড়া এলাকার জেলে প্রদীপ রাজবংশী। তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে চামড়া শিল্পনগরীর পাশের হরিণধরা এলাকার আবু সাইদ বলেন, ‘বুড়িগঙ্গা আগেই মরেছে। ধলেশ্বরীর পানি ভালো ছিল। কিন্তু ট্যানারি স্থাপনের পর ধলেশ্বরী এখন আমাদের গলার কাঁটা।’

চামড়াপল্লীর পাশে নদীর পারের চায়ের দোকানে কথা হয় ৭০ বছরের বৃদ্ধ মোবারক মিয়ার সঙ্গে। একসময় তিনি এই নদীতে মাছ ধরতেন। তবে এখন নদীতে আগের মতো মাছ নেই। এই ট্যানারি শিল্প ধলেশ্বরীকে ধ্বংস করছে, আর আমাদের জীবন করছে বিপন্ন।

ট্যানারির কেমিক্যাল শ্রমিক মো. সজিব মিয়া বলেন, ‘ট্যানারি বর্জ্যের কারণে ধলেশ্বরী নদী মৃতপ্রায়। যে নদীতে একসময় ডলফিন, শুশুকসহ শত প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত, যে নদীর পানি দিয়ে আশপাশের গ্রামের মানুষ রান্নাবান্না করত, যে নদীর দুই পারে ধানসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ হতো—সেই নদীর পানি এখন স্পর্শ করাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংকট : চামড়া শিল্পনগরীর দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, শিল্পনগরীতে চালু হওয়া ১৩২টি কারখানায় তরল, কঠিন ও বায়বীয় তিন ধরনের বর্জ্য তৈরি হয়। চামড়ার কঠিন বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে পশুর খুর, নখ, কান, লেজ, শিং, হাড়, লোম, চামড়া বা মাংসের ঝিল্লি ইত্যাদি। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) ২১টির মধ্যে সব কটি অঙ্গেরই সিভিল কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। বর্তমানে সিইটিপির চারটি মডিউল চালু রয়েছে এবং এগুলো বর্জ্য পরিশোধনের কাজ করছে। সিইটিপির ক্রোম সেপারেশনের লক্ষ্যে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও ক্রম রিকভারিকাজ এখনো শুরু হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মত : নদী বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ইনামুল হক বলেন, রাজধানীর পরিবেশ ও বুড়িগঙ্গা নদীদূষণ রোধে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর করে আদতে কোনো লাভ হয়নি। শিল্প উদ্যোক্তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের বর্জ্যর যে মানদণ্ডে নদীতে ফেলার কথা, তা মানছেন না। ফলে ধলেশ্বরীর পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা একেবারে কমে গেছে। এ কারণে মাছসহ অন্য প্রাণী বাঁচতে পারছে না। ফলে ওই নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষ ও জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত শিল্প উদ্যোক্তাদের এসব মানদণ্ড পালনে বাধ্য করা।

পানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান খান বলেন, এখন ধলেশ্বরীর পানি পান করা তো দূরের কথা, নদীর পারে গিয়ে দাঁড়ানোরও উপায় নেই।

জরিমানা করেও কাজ হচ্ছে না : নদীদূষণের দায়ে সাভারের চামড়া শিল্পনগরে গত ৪ নভেম্বর চার কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। শিল্পনগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) অকার্যকর রেখে তরল বর্জ্য ওভার ফ্লো (উপচে পড়া) ও বাইপাসের (নালা দিয়ে) মাধ্যমে নদীতে ফেলায় ওই জরিমানা করা হয়েছিল। এর আগে নদীদূষণের দায়ে বিসিককে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর।

কে কী বলছেন : সাভার উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি ও সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহ উদ্দিন খান নঈম বলেন, কর্ণপাড়া খালটি পশ্চিম দিকে গিয়ে যুক্ত হয়েছে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে। একসময়ের খরস্রোতা নদী এখন ট্যানারি ও মিল-কারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্যের আধার। বিভিন্ন ডায়িং বা কম্পোজিট মিলের রং-বেরঙের তরল বর্জ্য পরিশোধন না করে খালে পাইপের মাধ্যমে দিব্বি ফেলা হচ্ছে।

স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ‘নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ‘ট্যানারি ও ডায়িং-প্রিন্টিং কারখানাগুলো লাল শ্রেণিভুক্ত শিল্প। এসব শিল্পে প্রচুর তরল এবং কঠিন বর্জ্যের সৃষ্টি হয়। সাভারে এই বর্জ্য ফেলে দেওয়ার অন্যতম স্থান এখন ধলেশ্বরী।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, ট্যানারির সিইটিপি কার্যকর না হওয়া, বর্জ্যর অপর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা এবং নির্মাণ কৌশলে ত্রুটির কারণে বুড়িগঙ্গায় যে দূষণ হতো; তার চেয়ে বেশি দূষণ হচ্ছে ধলেশ্বরীতে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ধলেশ্বরী দূষণের জন্য চামড়াপল্লীই শুধু দায়ী নয়, এই নদীর আশপাশে আরো অনেক শিল্প-কারখানা রয়েছে। যেগুলো কোনো নজরদারিতে নেই। তিনি বলেন, আগামী জুনের মধ্যে সিইটিপি চায়না কর্তৃপক্ষ বুঝিয়ে দেবে। তখন পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদণ্ড মেনে নদীতে বর্জ্য যাচ্ছে কি না তা বোঝা যাবে।

এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘দূষণকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর আগেও পরিবেশ দূষণকারী অনেক কারখানাকে জরিমানা করা হয়েছিল। আমাদের পরিদর্শকরা প্রতি মাসেই ধলেশ্বরী নদীদূষণের ব্যাপারে প্রতিবেদন দিয়ে থাকেন। ধলেশ্বরী নদী কাউকে দূষণ করতে দেওয়া হবে না।’

জানতে চাইলে চামড়াপল্লীর প্রকল্প পরিচালক জিতেন্দ্র নাথ পাল কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে কঠিন বর্জ্য খোলা জায়গায় ডাম্পিং করা হলেও চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য দুটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। নদীদূষণের জন্য শুধু চামড়াপল্লীর কারখানার বর্জ্য নয়, আশপাশের বিভিন্ন ডায়িং ও টেক্সটাইল কারখানাও দায় এড়াতে পারে না।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT