রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

বুধবার ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ৬ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম
◈ সাটুরিয়ায় গৃহবধূকে ধর্ষণ চেষ্টায় একজন গ্রেফতার ◈ তাহিরপুর হাওর পাড়ে বৃক্ষরোপণের স্থান পরিদর্শন করেন,ইউএনও ◈ সরকারি কাজে বাধা, যুবকের তিনমাস কারাদণ্ড ◈ গজারিয়ায় কম্বিং অভিযানে ১০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ও ২ টি বেহুন্দি জাল আটক করে -কোস্ট গার্ড ◈ বান্দরবানে সেনা জোনে ১১০ ব্রিগেড সিগন্যাল কোম্পানী প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠিত ◈ শাহজাদপুরে আইনজীবীদের আদালত বর্জন অব্যাহত ◈ জুতা পরে কমলমতি শিশুদের ক্লাসে ঢুকতে দেয় না প্রধান শিক্ষক ◈ রবিবা’র আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ◈ পাকুন্দিয়ায় শীতকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত ◈ ভূঞাপুরে কর্মসৃজন প্রকল্পের কাজের উদ্বোধন

বিজয় দিবসের ইতিহাস ও মাহাত্ম্য

শেখ একেএম জাকারিয়া

প্রকাশিত : ০৬:৩৫ PM, ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ রবিবার ৪৮৮ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

বাংলাদেশে ডিসেম্বর মানেই বিজয়ের মাস। এই মাসের ষোলো তারিখে নিগৃহীত জীবনের পরিণতির মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এই বিজয়কে সামনে রেখে বাঙালি জাতি প্রতি বছর মহাসমারোহে ষোলোই ডিসেম্বরে‘বিজয় দিবস’ পালন করে থাকে। ১৯৭১ সালের এই ষোলোই ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গৌরবের একটি দিন। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের পরে এ দিনে আমাদের প্রাণের জন্মভূমি পাকবাহিনী মুক্ত হয়। তিরিশ লাখ শহিদের জীবনের বিনিময়ে, অসংখ্য নারীর শ্লীলতাহানি এবং বীরত্বব্যঞ্জক লড়াইের মধ্য দিয়ে একাত্তরের  এ দিনেই বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে সার্বভৌম সত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। বিজয় দিবসের এই দিনটি বাঙালি় জাতির স্বীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতনতা, আত্মসম্মান, সাহসিকতা ও সার্বভৌমিকতার নিদর্শন। প্রতি বছর ডিসেম্বরের ষোলো তারিখে বাঙালির জাতীয় জীবনে সীমাহীন সুখের বিবৃতি নিয়ে আসে বিজয় দিবস। বিজয় দিবসের সহজবোধ্য সংজ্ঞা হচ্ছে, বহির্দেশীয় শক্তির কবল থেকে মুক্ত হয়ে কোনও দেশের স্বাধীনতা লাভ করার দিনটিকে ওই দেশের বিজয় দিবস বলা হয়। ১৯৭১ সালের এ দিনে বাঙালি জাতি অন্যায়ভাবে আক্ৰমণকারী পাক হানাদার বাহিনিকে পরাভূত করে তাদেরকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিল। আর এ কারণেই ষোলোই ডিসেম্বর দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বেশি স্মরণীয়, জরুরি ও তাৎপর্যবহ।
কবি সুকুমার রায় তাঁর এক ছড়াতে লিখেন-
“বাংলার মাটি বড় শক্ত
সোজা নয় শহীদের রক্ত
স্বাধীনতা চাই পথ চলবার
মুখ ফুটে হক কথা বলবার।”
বাংলাদেশের জয় লাভের পেছনে বাঙালি জাতির দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রায় দুই’শ বছর শাসন-শোষণের পরে ১৯৪৭ সালে তীব্র প্রতিবাদের মুখে ইংরেজ বণিকগণ ভারত উপমহাদেশের দখলদারিত্ব ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে  স্বাধীনতা লাভের পর হিন্দু ও মুসলমান এই দুই ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট শৃঙ্খলা ও পরম্পরা অনুসারে ভারত  ও পাকিস্তান নামে দু’টি স্বাধীন ও সার্ভভৌম দেশের জন্ম হয়।  ইসলাম ধর্মাবলম্বী অর্থাৎ মুসলিম অধিষ্ঠিত পাকিস্তান দেশটি বস্তুত দু’টি স্বতন্ত্র ভূখণ্ডে বা অংশে  ভাগ করা ছিল। একটি অংশ হলো পশ্চিম পাকিস্তান আর অন্যটি এই সময়ের বাংলাদেশ-সেই সময়ে যার নাম ছিল পূর্ব-পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ড  হওয়া সত্ত্বেও গোড়া থেকেই সমগ্র পাকিস্তান রাষ্ট্রের সর্বাত্মক ক্ষমতার স্বত্বাধিকারী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। উল্লেখ করা দরকার,  পাকিস্তান রাষ্ট্রের পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাসরত শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে প্রথম থেকেই শাসন, শোষণ ও পীড়ন করতে থাকে। শুধু শাসন-শোষণ-পীড়নই নয় রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজকর্ম, অফিস-আদালত  সবকিছুই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী  দ্বারা চালিত হতো। সারকথা, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে অর্থনীতিক, রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক কোনও ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা দেয়নি। ফলস্বরূপ যুক্তিযুক্ত কারণেই পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালির ভেতরে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন-শোষণ ও পীড়ন থেকে স্বাধীনতা লাভের স্পৃহা জাগে। ১৯৫২ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে বাঙালির মনে স্বাধীনতার গুপ্ত ইচ্ছা আরও তীব্র রূপ ধারণ করে। কার্যত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। সে সময় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবির কারণে ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে রাজধানী ঢাকার রাজপথে শহীদ হন  রফিক, সালাম, জব্বার, বরকতসহ আরও নাম না জানা অনেকেই। এর পরই শুরু হয় নিজ অধিকার আদায়ের তুমুল আন্দোলন। ৬২ এর শিক্ষা-আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা এবং ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের পাঁচিল আরও টেকসই হয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাঙালিরা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিক দল আওয়ামী লীগকে প্রচুর ভোটে জয়ের মালা পরিয়ে  তাদের মনস্কামনা বাস্তবায়নের  স্বপ্ন দেখলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের কারণে তা অলীক-ই রয়ে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার নির্বাচিত সরকারের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা না দিয়ে বরং শাসন-উৎপীড়নের পথ বেছে নেয়। এরই প্রতিবাদে বাঙালি জাতির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ  ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে নিজ ভূখণ্ডের সাধারণ লোকেদের উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার ডাক দেন। এর ক’দিন পরেই বাঙালির জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ অন্ধকার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে মেজর জেনারেল টিক্কা খানের নির্দেশে  অসভ্য পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনী এ দেশের শান্তিপ্রিয় -নিরস্ত্র মানুষের ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বাছবিচার না করে বন্দুকের গুলিতে পাখির মতো তাদেরকে হত্যা করে। প্রধানত রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা, রাজার বাগ পুলিশ লাইন এমন আরও স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়। গ্রেপ্তার করে বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। গ্রেপ্তারের আগে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। তাঁর সেই আহ্বানেই শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। গ্রেপ্তারের পর ২৬ মার্চ দিনের বেলা চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, নারী-পুরুষ জাতিধৰ্মবৰ্ণ-নির্বিশেষে এদেশের সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। দীর্ঘ ৯ মাস বহু লোকের প্রাণহানি হয়েছে এমন ভয়ানক যুদ্ধের পর ষোলোই ডিসেম্বরে আমাদের অনেক দিনের স্বপ্নের কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হয়। ওইদিন রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং সূচনা হয় মহান বিজয় দিবসের। জন্ম হয় একটি স্বাধীন দেশের, যার নাম বাংলাদেশ।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিনটি ছিল বাঙালির অনেক  বিসর্জন-সহিষ্ণুতা ও প্রয়াসের ফল। ৭ কোটি বাঙালির মহাসুখের দিন ছিল সেটি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সহ্য করা কঠিন এমন স্মৃতি, জ্ঞাতি-কুটম্ব খোয়ানোর মনস্তাপ যাবতীয় বিষয় ভুলে  বাংলার মনুষজন দলে দলে নেমে এসেছিল নগরের প্রধান সড়কে। সেদিন সবার হাতে ছিল সার্বভৌম বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। দুঃসহ যাতনাকে ভুলে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল ভবিষ্যতে ভালোকিছু হবে এমন একটি সুন্দর বাংলাদেশের। বাঙালির জাতীয় জীবনে এর থেকে সুখের দিন আর নেই। প্রতি বছর ১৫ ডিসেম্বর রাত থেকেই বাঙালির বিজয়োৎসব শুরু হয়।  ষোলোই ডিসেম্বরে বিজয় দিবস উদযাপনের জন্য ১৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১২.০১ মিনিট থেকে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ বিসর্জনকারী লাখো শহিদের প্রতি সম্মান জানাতে  সবশ্রেণির মানুষ ঢাকার সাভারে স্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে ও দেশের সব জেলা-উপজেলার শহীদ মিনারে মিলিত হয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। এদিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনাগৃহে যেমন, মন্দিরে মসজিদে গির্জায় প্রভৃতি  স্থানে দেশ ও জাতির সমুন্নতি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। এ দিবসের উৎসবাদি আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে শাণিত করে।
জাতীয় জীবনে বিজয় দিবসের ইতিহাস ও মাহাত্ম্য অসীম। এ দিবসটি বাঙালি জাতিকে ‘বীরবাঙালি’ হিসেবে পৃথিবীর বুকে পরিচিত করেছে। ষোলোই ডিসেম্বর দিনটি আমাদের সববসময় মনে করিয়ে দেয় রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের কথা, লাখো শহিদের কথা, যুদ্ধাহত সৈনিকদের কথা,সরকারপ্রদত্ত সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত  বীরশ্রেষ্ঠদের কথা। সব অবিচার-নিগ্রহ, শোষণ-কুশাসনের পরিপন্থি বিজয় দিবস আমাদের মনে উদ্দীপনা তৈরি করে।
প্রতি বছর অনন্য গৌরব নিয়ে আমাদের সম্মুখে আবির্ভূত হয় ষোলোই ডিসেম্বর । বাঙালি হিসেবে সব মানুষেরই এ দিবসটির প্রতি কিছু করণীয় আছে। শুধুমাত্র বিজয় দিবসের একটি দিনেই নয়, বরঞ্চ বিজয়ের চেতনায় প্রজ্বলিত হয়ে প্রতিটি বাঙালির উচিত সারাবছরই দেশ,জাতি ও সার্বভৌমিকতার পক্ষে আপন আপন অবস্থানে থেকে কাজ করে যাওয়া। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র ও জাতিকে অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার কাজও সবাইকে করতে হবে।  তাছাড়া বিজয় দিবসের ঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও সর্বসাধারণকে অবহিতকরণ সম্পর্কে জাতীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই  ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা একটি সার্ভভৌম দেশ পেয়েছি।ষোলোই ডিসেম্বর দিনটি তাই আমাদের বুকের অভ্যন্তরভাগে যেমন সুখ ও মনস্তাপের সঞ্চার ঘটায়, তেমনি নবচেতনাও জাগিয়ে তোলে। যাঁদের আত্মবিসর্জনের প্রতিদানে এ বিজয় আমরা অর্জন করেছি, সেই বিজয়কে অটুট ও সমুন্নত রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। এই চেতনায় প্রাণিত হয়েই আমাদের, রাষ্ট্রকে সুন্দরভাবে গড়ার শপথ নিতে হবে।

লেখকঃ শেখ একেএম জাকারিয়া, কবি ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT