রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

সোমবার ১০ মে ২০২১, ২৭শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

০১:৩৩ পূর্বাহ্ণ

বাড়ে ট্রেন কমে চালক

প্রকাশিত : ০৫:৪৩ AM, ১৪ নভেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার ৩১৩ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মন্দবাগে সংঘটিত ট্রেন দুর্ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। দুর্ঘটনার পরদিন অকুস্থলে যায় রেল মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি; মাঠে আছে রেলওয়ের পৃথক তদন্ত কমিটিও। ট্রেনের স্টাফ, প্রত্যক্ষদর্শী, মন্দবাগ রেলস্টেশনের কর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।

তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে অভিযুক্ত ট্রেনচালক ও গার্ডের সঙ্গেও কথা বলেছেন কমিটির সদস্যরা। এর পর জানিয়েছেন, মন্দবাগ ট্র্যাজেডির কারণ অনুসন্ধানে তারা তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন- প্রথমত, চালক সত্যিই সিগন্যাল দেখতে পেয়েছিলেন কিনা, কুয়াশা কতটা ঘন ছিল; দ্বিতীয়ত, চালক তাছেরউদ্দিন নিজে ট্রেন চালাচ্ছিলেন না ঘুমাচ্ছিলেন, কিংবা সহকারীকে দিয়ে ট্রেন চালানো হচ্ছিল কিনা এবং তৃতীয়ত, ট্রেন স্টেশন এলাকায় সিগন্যালের আগে কোনো বাধা ছিল কিনা, যে কারণে সিগন্যাল দৃষ্টিগোচর না-ও হতে পারে। এখন এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো প্রতিবন্ধকতার কারণে হয়তো তূর্ণা নিশীথার চালক তাছেরউদ্দিনের চোখে পড়েনি সিগন্যাল, যে কারণে উদয়ন এক্সপ্রেসের বগিতে ধাক্কা দেয় ট্রেনটি- এমন যুক্তির সঠিকতা যাচাই করা হচ্ছে।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একের পর এক রেল দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ জনবল সংকট। গত দুই বছরে কয়েকটি নতুন ট্রেন চালু হলেও জনবল বরং কমেছে। রেলের বড় বড় কর্মকর্তার বিদেশ-বিলাসিতা চললেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পর্যন্ত দেওয়া হয় না কর্মীদের। তারা বরাবরই উপেক্ষিত। এসব সংকটের উত্তরণ ঘটানো জরুরি।

অন্যদিকে গত দুদিনে রেলের ঢাকা স্টেশন, মন্দবাগ স্টেশনসহ আশপাশ স্টেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বক্তব্য সংগ্রহ করেছে তদন্ত কমিটি। এর কারণ ট্রেনের সিগন্যালিং ব্যবস্থা সঠিক ছিল কিনা,তা যাচাই করা। প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্টদের মনে হয়েছে, ওইদিন রাত ২টা ৪৮ মিনিটে মন্দবাগ স্টেশনের এক নম্বর লাইনে প্রবেশ করে উদয়ন এক্সপ্রেস। একই লাইনে বিপরীত দিক থেকে আসছিল তূর্ণা নিশীথা। ট্রেন দুটির ক্রসিং হওয়ার কথা ছিল মন্দবাগ স্টেশনে। এ জন্য উদয়ন এক্সপ্রেসকে এক নম্বর লাইন থেকে ডানপাশের লুপ লাইনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল যেন তূর্ণা নিশীথা এক নম্বর লাইন দিয়ে স্টেশন পার হতে পারে। সে সময় তূর্ণা নিশীথার গতি ছিল ৬০ কিলোমিটার। সিগন্যাল বুঝতে পারার পর ব্রেক কষে গতি কমিয়ে ২৫-এ নামানো হয়। এ সময় উদয়ন এক্সপ্রেস এক নম্বর লাইন থেকে লুপ লাইনে প্রবেশ করছিল। ট্রেনটির ১৬টি কোচের (বগি) মধ্যে ৯টি লুপ লাইনে প্রবেশের পরপরই তূর্ণা নিশীথা আঘাত করে ১০ নম্বর বগিতে। এর পরের খবর সবার জানা।

চালক ছাড়াও ট্রেন থামাতে ভ্যাকুয়াম ব্রেক কষতে পারেন গার্ড। সাধারণত লাইন ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার পর ট্রেন অতিক্রমে সহায়তা করেন গার্ড। মন্দবাগ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালক যদি সংকেত বুঝতে না পেরে থাকেন, সে ক্ষেত্রে গার্ড কোনো ব্যবস্থা নিতে পেরেছিলেন কিনা, নাকি ঘটনার আকস্মিকতায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি- এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখছেন তদন্ত তদারককারীরা।

রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দ্রুতগতির চলন্ত ট্রেনে তাৎক্ষণিক ব্রেক কষা সম্ভব নয়। এমন হার্ডব্রেকের ফলে ট্রেন উল্টে যাত্রীসহ অন্যদের জীবনের ঝুঁকি থেকে যায়। সাধারণত একটি ট্রেনের ব্রেক কষলে এটি ১৪০ গজ দূরে গিয়ে থামে। এ কারণে লেভেল ক্রসিং অতিক্রমের সময় কাউকে দুর্ঘটনার শিকার হতে দেখলেও হার্ড ব্রেক কষতে পারেন না চালক। দু-একজনের জীবন রক্ষার চেয়ে ট্রেনের বিপুলসংখ্যক আরোহীর প্রাণরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। মন্দবাগের দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটি ৬০ কিলোমিটার গতি থেকে নেমে ২৫ কিলোমিটারে আসার পরও উদয়ন এক্সপ্রেসে আঘাত হেনেছে। এটি কীভাবে ঘটল? এ প্রশ্নের জবাব পেতেও চলছে অনুসন্ধান।

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন গতকাল বলেন, কেবল চালকের দোষ নয়; সবই খতিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি। এ ধরনের দুর্ঘটনা যেন আর না হয়, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করতেও বলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবেÑ যেন সবাই কারণ জানতে পারেন। মন্ত্রী বলেন, সর্বোপরি কথা হচ্ছে, দুর্ঘটনার দায় আমরা এড়াতে পারি না। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রশিক্ষণসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেল মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, রেলের সেফটি মিজার্স হিসেবে লোকো বা ইঞ্জিনে এমন একটি ডিভাইস দরকার, যা পরবর্তী স্টেশনে লাল সিগন্যাল থাকলে রানিং ট্রেনের ইঞ্জিনে সতর্কবার্তা পাঠাবে এবং সিগন্যালের কাছাকাছি এসেও চালক ট্রেন না থামালে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা থেমে যাবে। এমনকি চালক ভুলে গেলে বা অবহেলা করলেও। এ রকম প্রযুক্তি যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রেলওয়ের সাড়া না পেয়ে সেটি আর এগোয়নি।

রেলের একটা বড় সমস্যা জনবল সংকট। এখন একদিকে ট্রেন যখন বাড়ছে, অন্যদিকে তখন দিন দিন কমছে চালকের সংখ্যা। সংকট রয়েছে স্টেশনমাস্টারেরও। গত দুই বছরে কয়েকটি নতুন ট্রেন চালু হলেও জনবল বরং কমেছে। রেলে প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি হয়। প্রতিবেদনে সুপারিশও জমা পড়ে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। আবার শাস্তি দিলেও তা পরে প্রত্যাহার করে নিতে হয় এ সংকটের কারণে। মঙ্গলবারের দুর্ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত করায় আরও তিনজন কমে গেল।

বর্তমানে ৩৫৬টি যাত্রীবাহী ট্রেন ও ৩০টি পণ্যবাহী ট্রেন চলে। অথচ একজন চালক তৈরি করতে ৮ বছর সময় লাগে। যদিও অনুমোদিত ১ হাজার ৭৪২ চালকের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ১৩৪ জন কর্মরত। ৬০৮টি পদ শূন্য। প্রথমে সহকারী লোকোমাস্টার গ্রেড-২ হিসেবে নিয়োগের পর গ্রেড-১, এর পর সাব লোকোমোটিভ মাস্টার হতে হয়। তারও পর লোকোমাস্টার গ্রেড-২ শেষে লোকোমাস্টার গ্রেড-১ পদে পদোন্নতি পান চালকরা। তাদের প্রশিক্ষণের জন্য রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি ছাড়াও রয়েছে পার্বতীপুর, ঢাকা, পাহাড়তলীতে ওয়ার্কশপ ট্রেনিং ইউনিট (ডব্লিউটিইউ)। ট্রেন চালনা ছাড়াও কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হয় চালকদের। মেকানিক্যাল বিভাগের অধীনে থাকা চালক আর ট্রাফিক বিভাগের অধীনস্থ গার্ডরা ট্রেন পরিচালনার অংশ। এ ছাড়াও স্টেশনমাস্টার থেকে শুরু করে পয়েন্টসম্যান, টিএক্সআর, এসই ট্রেন লাইটিং, মেইনটেইনার সিগন্যাল, পারমান্যান্ট ওয়ে ইন্সপেক্টর, জিআরপি, আরএনবি সদস্যসহ অনেকেই সম্পৃক্ত। অন্তত ৬টি শাখার সমন্বয়ে ট্রেন চলে। ট্রেন ক্লিয়ারেন্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত স্টেশনমাস্টারের ১ হাজার ২০৫ পদের মধ্যে ৭৫৬ জন কর্মরত। ৮ ঘণ্টার অতিরিক্ত ডিউটি করতে হয় চালককে। একই অবস্থা স্টেশনমাস্টারের। চুক্তিভিত্তিক লোক দিয়ে চালাতে হচ্ছে রেল। বাস্তবিকই এমন করুণ দশায় ট্রেন চললেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর কিন্তু হরদমই চলে। অথচ ট্রেনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কর্মীদের প্রতিবেশী দেশে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয় না। যদিও কথায় কথায় প্রতিবেশী দেশটির দৃষ্টান্ত সামনে তুলে ধরে কর্তৃপক্ষ।

দেখা যায়, উপযুক্ত ব্যক্তি নন এমন সংস্থা বা বিভাগের ব্যক্তিরাও রেলের প্রশিক্ষণে ইউরোপ-আমেরিকায় যান। উপেক্ষিত থাকেন ট্রেন পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নেই তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও রিফ্রেশার কোর্সের সুযোগ। মন্দবাগের ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্মকর্তাদের সতর্ক করার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের বিষয়েও নির্দেশ দিয়েছেন। রেলকর্মীদের প্রশিক্ষণে ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, গতকাল জানান রেলমন্ত্রী।

রেলসচিব মোফাজ্জেল হোসেন এ প্রসঙ্গে আমাদের সময়কে বলেন, চালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিনোদন, বিশ্রাম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তাদের রানিং রুমে কাক্সিক্ষত ব্যবস্থা নেই বলেও মনে করেন রেলসচিব।

অন্যদিকে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি আধুনিকায়নে সমীক্ষা প্রকল্প হাতে নিয়েছে রেলওয়ে। চট্টগ্রামের হালিশহরে অবস্থিত এ একাডেমির অবস্থা নাজুক। ১৯৭১ সালে ট্রেন পরিচালনাকারীদের ভারতের পুনেতে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হতো। এর পর ঢাকার লালমনিরহাট ও কমলাপুরে ট্রেনিং স্কুল ছিল। ১৯৭৯ সালের রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি গঠন করা হয় চট্টগ্রামে। সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) ও পাহাড়তলী কলেজের মাধ্যমে এটি পরিচালনা করা হতো। এভাবে চলে ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৪ সালেই হালিশহরে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি (আরটিএ) কার্যক্রম শুরু করে। এটি ভালোভাবে সম্পন্ন করতে এ বছরের মার্চে সমীক্ষাসংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য এখনো পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়নি। এ প্রসঙ্গে রেলসচিব গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, প্রকল্পটি অনুমোদনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রেলকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম এবং লোকবল সংকট দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো, নিজস্ব প্রতিবেদক ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কসবা প্রতিনিধির খবরঃ

তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেসের চালক ও গার্ড ঘুমে অথবা নেশায় বুঁদ থাকার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কন্ট্রোলার ও স্টেশনমাস্টাররা। তারা বলছেন, দুর্ঘটনার সময় সর্বোচ্চ গতিতে চলছিল তূর্ণা নিশীথা। উদয়ন এক্সপ্রেসের চালক ও তার সহকারীর দাবি, তূর্ণার সর্বোচ্চ গতি দেখে ওই ট্রেনের চালক ও সহকারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লাগাতার হর্ন বাজিয়েছিলেন তারা। কিন্তু এতেও শেষ রক্ষা হয়নি।

এদিকে কুয়াশার কারণে সিগন্যাল দেখতে না পারাকে তূর্ণার দুই চালক ও গার্ড দাবি করলেও তা সঠিক নয় বলে মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, কুয়াশার অজুহাতে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন তূর্ণার চালক। মন্দবাগ স্টেশনমাস্টার জাকির হোসেনের ভাষ্যও তাই। এর পরও দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জবানবন্দি, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, আলামত পর্যালোচনা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির কর্মকর্তারা।

এদিকে গতকাল বুধবার রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান কার্যালয় সিআরবিতে তূর্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের চালক, গার্ড, মন্দবাগ ও কসবা স্টেশনমাস্টার এবং দুর্ঘটনার সময় পাহাড়তলী কন্ট্রোলরুমে দায়িত্বরতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গতকাল বিকালে বিভাগীয় প্রধান পর্যায়ে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটির কাছে ঘটনার বর্ণনা দেন তারা। রাতে তারা বিভাগীয় কর্মকর্তা পর্যায়ে গঠিত তদন্ত দলের কাছে জবানবন্দি দেন। এ ছাড়া আজ বৃহস্পতিবার বিভাগীয় কর্মকর্তা পর্যায়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন।
জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্টদের বেশিরভাগই বলেছেন, তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের চালক ও গার্ড ঘুমিয়ে ছিলেন। তবে চালক তাছের উদ্দিন, সহকারী চালক অপু দে ও গার্ড আবদুর রহমান বলেছেন তারা সিগন্যাল দেখেননি। কিন্তু স্টেশনের সামনে ও পেছনে সিগন্যাল না দেখার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছে না তদন্ত দল। এ ছাড়া চালক ভুল করার পর গার্ড কেন বিষয়টি খেয়াল করলেন না তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন কমিটির সদস্যরা।

কুয়াশার বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন মন্দবাগ স্টেশনমাস্টার জাকির হোসেন। একই কথা বললেন বিভাগীয় কর্মকর্তা পর্যায়ে গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ডিটিও নাছির উদ্দিন। তিনি বলেন, কুয়াশার পরিস্থিতি দেখতে গতকাল ভোরে একই স্থানে অবস্থান করে দেখেছি, সেখানে ফগ সিগন্যাল দেওয়ার মতো কুয়াশা নেই।

বিভাগীয় পর্যায়ে গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিবহন কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, সিগন্যাল অমান্যের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে; সেটি নিশ্চিত। কী কারণে সিগন্যাল মানা হয়নি, সেটিই খতিয়ে দেখছি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দি, দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত এবং আলামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করব।

এদিকে তূর্ণার চালকদের রক্ষা করতে রেলওয়ে লোকো রানিং স্টাফ ও শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মোহাম্মদ আলী আমাদের সময়কে বলেন, স্টেশন এলাকায় মাটির স্তূপের কারণে ঠিকমতো সিগন্যাল দেখা যায় না। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গত ৩১ জুলাই জিএম নাছির উদ্দিন আহমেদকে লিখিত দাবি দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেননি। তাই শুধু চালকের ঘাড়ে দায় চাপালে হবে না। এখানে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব আছে।

গতকাল বিকালে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইন ও ভূমি) মো. রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ের চার সদস্যের তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তূর্ণা নিশীথার লোকোমাস্টার সিগন্যাল অমান্য করেছিল কিনা এবং আউটার ও হোম সিগন্যালে কোনো ত্রুটি ছিল কিনা, সেটি খতিয়ে দেখেন তারা। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে এই কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠিত আরেকটি তদন্ত কমিটির প্রধান ও রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (পূর্ব) মো. নাসির উদ্দিন জানান, চালকের ভুলের পাশাপাশি সিগন্যালের ত্রুটি ও আবহাওয়াসহ ১০টি কারণ আমরা খতিয়ে দেখছি। সেখান থেকে একটি কারণ চিহ্নিত করে বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিতু মরিয়মের নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি মঙ্গলবারই দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্তকাজ শুরু করে।

অপমৃত্যুর মামলা : এদিকে দুই ট্রেনের সংঘর্ষে ১৬ জন নিহতের ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা করা হয়েছে। আখাউড়া রেলওয়ে থানাপুলিশের ওসি শ্যামল কান্তি দাস জানান, মঙ্গলবার রাতে মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার জাকির হোসেন চৌধুরী মামলটি করেন। এতে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা তূর্ণা নিশীথা হোম ও আউটার সিগন্যাল অমান্য করে চলায় দুর্ঘটনা ঘটে বলে উল্লেখ করা হয়।

লাইন মেরামত : গতকাল মন্দবাগ স্টেশনের ১ নম্বর লাইনটিও মেরামত করা হয়। দুর্ঘটনার দিন দুটি লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ১ নম্বর লাইনটি মেরামত করা সম্ভব হয়নি। গতকাল দুপুরে ওই লাইনটির মেরামতকাজ শেষ হয়। এ বিষয়ে প্রকৌশল বিভাগের কর্মরত রাজাপুর থেকে আখাউড়া পর্যন্ত লাইনের দায়িত্বে নিয়োজিত মো. গোলাম মোস্তফা জানান, স্টেশনের এক ও দুই নম্বর লাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ৩ নম্বর লাইনটি অক্ষত ছিল। প্রধান দুই নম্বর লাইনটি ঠিক করার পর পরই ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

আহতদের জন্য ১০ হাজার টাকা : ট্রেন দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা সহায়তা হিসেবে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে রেলওয়ের পক্ষ থেকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি একজন আহতের কাছে বুধবার দুপুরে এই টাকা তুলে দেন রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের বাণিজ্যিক কর্মকর্তা শওকত হোসেন মহসীন। এ সময় তিনি জানান, আহত সবাই ১০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ পাবেন।

কসবার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে গত মঙ্গলবার ভোরে চট্টগাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন তূর্ণা নিশীথা এবং সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের সংঘর্ষে ১৬ যাত্রী নিহত ও শতাধিক আহত হন। আহতদের মধ্যে ৭৪ জন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

এই বিভাগের জনপ্রিয়

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT