রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

রবিবার ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ফেনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত বিশিষ্টজন

প্রকাশিত : ০৮:০০ পূর্বাহ্ণ, ৭ অক্টোবর ২০১৯ সোমবার ৩৩ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :
alokitosakal

ফেনী নদী। ১০৮ কিলোমিটারের কোনো অংশই ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেনি। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ফেনী, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের সাথে মিশে এই নদী। ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশে বলেই দাবি স্থানীয়দের। এ নিয়ে এখনো রাষ্ট্রীয় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যদিও দীর্ঘদিন ধরে ভারত এ নদীর উৎপত্তিস্থল তাদের দেশে বলে দাবি করছে। তাদের ভাষ্য, এই নদীর উৎপত্তি ত্রিপুরা রাজ্যে।

অথচ অনুসন্ধানে দেখা যায়, এর উৎপত্তি মাটিরাঙ্গার ভগবানটিলায়। ভারতের কোনো সীমানার মধ্যেই পড়েনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যর জন্য ২০১০ সালে ৮.২ কিউসেক পানি চাওয়া হয়। কিন্তু তখন থেকেই সমঝোতা ছাড়াই, অনুমতি না নিয়ে শক্তিশালী পাম্পের মাধ্যমে অদ্যাবধি পানি নিয়ে যাচ্ছে ভারত। স্থানীয়রাএ নিয়ে প্রতিবাদ করে আসছিলেন।

অবশেষে গত শনিবার অনুষ্ঠিত ঢাকা-নয়াদিল্লির মধ্য দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহারে সিদ্ধান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বৈঠকে নিজ নিজ দেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন। বৈঠকে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত।নদীটি থেকে ১.৮২ কিউসেক (ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ড) পানি তুলে নেবে ভারত। এই পানি দিয়ে ত্রিপুরার সাবরুম শহরে পানীয় জলের চাহিদা পূরণ হবে। এরপরই এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফেনীর বিশিষ্টজন।

স্থানীয়দের দাবি, বোরো মৌসুমে ফেনীর ফুলগাজী, সোনাগজী, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বেশ কিছু এলাকায় পানির অভাব দেখা দেয়।
পানি প্রত্যাহারের ফলে এই অঞ্চলে আরো বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশীয় স্বার্থ রক্ষায় এখন জোর দাবি জানান ফেনীর মানুষ। ফেনী নদী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদী। এ চুক্তির ফলে এখানকার কৃষকরা বিপদে পড়ে যাবে, বিশেষ করে সোনাগাজীর যে সেচ প্রকল্প রয়েছে। ১৮ হাজার হেক্টর জমি মরুভূমিতে বোরো মৌসুমে এমনিতেই মরুভূমিতে পরিণত হয়। যদিও বুদ্ধিজীবী মহল ১.৮২ কিউসেক পানিকে সামান্য মনে করছেন। তবে এর ভবিষ্যৎ কী জানা নেই।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবকে মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডক্টর আবুল কালাম আজাদ চৌধুরী আমার সংবাদকে এ বিষয়ে বলেছেন, ফেনী নদীর পানি সরকার ভারতকে মানবিক কারণে দিয়েছে। পানি দেয়ার এই চুক্তি নিছক মানবিকতার কারণ বলেও আমি বলবো। তবে এর কারণে ভবিষ্যতে কী হতে পারে এটি আমার কিংবা আমাদের অনেকরই জানা নেই। তবে ফেনীর মানুষ হিসেবে একটু তো বুকে লাগে। ভবিষ্যতে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ঘটবে কি না, এ শঙ্কাটা থেকেই যায়। কারণ আমরা এখনো ভবিষ্যতে কী হতে পারে তা জানি না।

ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার আমার সংবাদকে বিষয়ে বলেছেন, জাতীয় স্বার্থে কোনো চুক্তি হয়নি। ফেনী নদীর ব্যাপারে যে চুক্তি হয়েছে, সেটি মানবিক কারণে বলা যেতে পারে। এটি নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো সংকট এই জনপদের জন্য প্রভাব পড়তে পারে বলে এখনো ধারণা করা যায় না। তবে ভবিষ্যতে যদি এর প্রভাব পড়ে, তখন অবশ্যই পুনরায় তা বিবেচনা করা যেতে পারে।

ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু এ সম্পর্কে বলেছেন, ফেনী থেকে পানি নেয়ার ফলে এই নদী একসময় মরুভূমি হয়ে যাবে এবং এর প্রভাব পুরো ফেনীসহ আশপাশের এলাকায় পড়তে পারে। ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকারের জবাবদিহিতা নেই বলে ইচ্ছেমতোই দেশবিরোধী চুক্তি করে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এটি মাত্র গতকাল জানতে পারলাম। এ নিয়ে অবশ্যই দেশের সচেতন মানুষ প্রতিক্রিয়া জানাবে। এর বিরুদ্ধে কথা বলবে। রাজনৈতিক আন্দোলনের ইঙ্গিত দেন এই নেত্রী।

ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সভাপতি লাকি আক্তার এ সম্পর্কে বলেছেন, বাংলাদেশের নতজানু কূটনৈতিক পররাষ্ট্রনীতি প্রকাশ পেয়েছে । এক শ্রেণির কারণে ফেনী অঞ্চলের মানুষ অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হবে। এ চুক্তির মাধ্যমে ভারত অনেক লাভবান হলেও ভবিষ্যতের জন্য ফেনীর অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এ দেশের মানুষের চাওয়া তিস্তার পানি, কিন্তু সেটি আমরা এখনো পাইনি। আমাদের বাংলাদেশের অন্যতম সুপেয় পানির উৎস ফেনী নদী। আর এই নদীর উৎস থেকে পানি ভারত কোনোভাবেই দাবি করতে পারে না । ফেনীর বড় সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে বলেও দাবি করেন লাকি আক্তার।

তবে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও দেশের বিশিষ্টমহল মন্তব্য করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আলী রিয়াজ লেখেন, বাংলাদেশের বহু প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তি হয়নি, অন্য ছয়টি নদীর পানিবণ্টন বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি; বরঞ্চ ১১ বছর আগের স্বাক্ষরিত ফ্রেমওয়ার্ক নিয়েই আবারো কথা হয়েছে। সহজ ভাষায়, এ ধরনের চুক্তির আশু সম্ভাবনা নেই— এটাই বোঝা যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ফেনী নদী থেকে ভারত ত্রিপুরার সাবরুম শহরের জন্য ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করবে বলে চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়নি, ভারত পেয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, এবারো একই কাণ্ড। এবার ফেনীর পানি, চট্টগ্রাম আর মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ আর তরল গ্যাসের বিনিময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতে ঠুনকো এক পদক ধরিয়ে দিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের মানুষের সাথে দুদেশের সরকারের নির্মম এসব মশকরা আর কতকাল দেখতে হবে আমাদের?

এটিএন নিউজের বার্তাপ্রধান প্রভাষ আমিন লিখেছেন, তিস্তা নদীর পানি উস্তার মতো তিতা, তাই বাংলাদেশকে দেয়ার দরকার নাই। ফেনী নদীর পানি মধুর মতো মিঠা, তাই নিয়া আসো। বাংলা ভিশনের বার্তাপ্রধান মোস্তফা ফিরোজ লেখেন, পানি পাবো তিস্তার, এই আশায় বসে থাকতে থাকতে এখন উল্টো পানি দিতে হবে?

ড. তুহিন মালিক বলেন, স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সমুদ্রবন্দর, ফেনী নদীর পানি এবং জ্বালানি সঙ্কটময় দেশের গ্যাস ভারতের হাতে তুলে দেয়ার যে চুক্তি করা হলো, তা সুস্পষ্টভাবে সংবিধান পরিপন্থি। এটা বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদের গুরুতর লঙ্ঘন। যা সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদের অধীনে সংবিধান লঙ্ঘনজনিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের শামিল। সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদের অধীনে যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন।’

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT