রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

মঙ্গলবার ১৩ এপ্রিল ২০২১, ৩০শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

১০:৫২ অপরাহ্ণ

নিজস্ব ‘আদালতে’ বিচার ‘টর্চার সেলে’ কার্যকর

প্রকাশিত : ০৫:৫৬ AM, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ রবিবার ৩৬০ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

পাশাপাশি দুটি দামি চেয়ার। চেয়ারের পেছনেই দৃষ্টিনন্দন দামি কাঠের প্যাভিলিয়ন। এই প্যাভিলিয়নে সাঁটানো নিয়ন বাতিতে মোড়ানো সাদা রঙের স্তম্ভ। স্তম্ভের বাম পাশে ইংরেজিতে লেখা এনামুল হক এনু, ডান পাশে রুপন ভূঁইয়া। কক্ষের শেষ মাথায় বসানো খয়েরি রঙের আলিশান চেয়ার দুটি ক্যাসিনো ডন গে-ারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক ওরফে এনু ভূঁইয়া ও একই কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তার ছোট ভাই রুপন ভূঁইয়ার জন্য নির্ধারিত।

চেয়ার দুটি তারা সিঙ্গাপুর থেকে তৈরি করে এনেছিলেন। পুরান ঢাকার ওয়ারীর গরিয়া মঠ সংলগ্ন আইসক্রিম ফ্যাক্টরির গলিতে প্রায় ১০ কাঠার ওপর নির্মিত বিলাসবহুল ভবনটির নিচতলায় দামি টাইলসে মোড়ানো একটি কক্ষকে দুই ভাই বানিয়েছিলেন নিজস্ব ‘বিচারালয়’। সেই খয়েরি রঙের চেয়ার দুটিতে বসে তারা ‘রায়’ দিতেন। এই কক্ষের পাশের কক্ষটিকে ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করতেন তারা।

দুই ভাইয়ের রায়ের বাস্তবায়ন ঘটানো হতো ওই সেলে। একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে জমি, জুয়ার বোর্ড, চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো বিষয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ হলে তাকেই ধরে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের লোগোওয়ালা ভক্সি গাড়িতে তুলে এই টর্চার সেলে নিয়ে আসত তাদের ক্যাডাররা। দুই ভাইয়ের নিজস্ব বিচারালয়ে তাদের সামনে রাখা কাচের টেবিলের ওপাশে দাঁড় করানো হতো ‘অপরাধীকে’।

তার পেছনে তাকে ঘিরে দাঁড়াত এনু-রুপনের ক্যাডারা। এনু ও রুপনের আদেশ পেতেই বাহিনীর সদস্যরা অমানুষিক নির্যাতনের পর কাউকে শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিত; কারও কাছ থেকে আদায় করত মোটা অঙ্কের চাঁদা। বহুতল ভবনটি ওই দুই ভাইয়ের। গতকাল শনিবার পুরান ঢাকার স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত মঙ্গলবার এনু ও রুপনের বাসা এবং তাদের দুই সহযোগী আবুল কালাম ও হারুনুর রশিদের বাসা থেকে ৫ কোটি টাকা, ৮ কেজি স্বর্ণ এবং ৬টি অস্ত্র উদ্ধারের পর এলাকাবাসী এখন তাদের বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

পুরান ঢাকার বাসিন্দারা জানান, মাস কয়েক আগে পুরান ঢাকার ১নং মনির হোসেন লেনের ‘মেজরের বাড়ি’টি কেনার ইচ্ছা পোষণ করে দর-দাম করেছিলেন ধোলাইখালের একজন ব্যবসায়ী। দর-দাম করেছিলেন এনু ও রুপনও। খবর পেয়ে ওই ব্যবসায়ীকে তার প্রতিষ্ঠান থেকে অস্ত্রের মুখে এনু ও রুপনের ক্যাডাররা তুলে আনে টর্চার সেলে। সেখানে মারধরের পর ব্যবসায়ীকে নেওয়া হয় দুই ভাইয়ের নিজস্ব বিচারালয়ে। বাড়ি কেনার ‘ঔদ্ধত্য’ দেখানোর দায়ে ওই ব্যবসায়ীকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়ার রায় দেন এনু; তাতে সায় দেন রুপন। ওই টাকা চাঁদা দিয়েই রেহাই মেলে ওই ব্যবসায়ীর।

শুধু এই টর্চার সেলই নয়, কেরানীগঞ্জের কোনাখোলায় উপজেলা পরিষদের কাছে এনু-রশীদের রয়েছে আরও একটি টর্চার সেল। দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে এভাবে বহু মানুষকে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, এনু ও রুপন বাইরে বের হওয়ার সময় কালার ম্যাচিং করে জামা, জুতা, প্যান্ট, বেল্ট পরতেন। ৮-১০ ভরি ওজনের স্বর্ণের মোটা চেইন পরতেন একই ডিজাইনের; হীরা, দামি পাথর ও সোনার আংটিও পরতেন একই ক্যাটালগের। একসঙ্গে থাকা, একসঙ্গে বসা-খাওয়া থেকে শুরু করে প্রায় সব কিছুই একই আদলে করায় এনু ও রুপন এলাকায় ‘মিস্টার ম্যাচিং’ বা ‘ম্যাচিং ব্রাদার’ হিসেবেই পরিচিত। দুই ভাই চলাফেরার সময় তাদের সামনে-পেছনে থাকত সশস্ত্র দেহরক্ষীদের বিশাল বহর।

এনু ও রুপন এবং তাদের বড় ভাই রশীদের বিরুদ্ধে পুরান ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় দখল বাণিজ্য চালানোরও অভিযোগ রয়েছে। তাদের ঘোষণা ছিল, তারা ছাড়া কেউ এলাকায় কোনো জমি কিনতে পারবেন না। স্থানীয়দের ভাষ্য, তারা টাকার বিনিময়ে ‘ঠিকাদারি’ নিয়ে বিভিন্নজনের জমি দখল করে দিতেন। ধোলাইখালের হানিফ স্টিল মিল সংলগ্ন সরকারি জায়গা দখল করে বাঁধন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন এনু-রুপনের বড় ভাই রশিদুল ভূঁইয়ার ছেলে ৪১নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক বাতেনুল হক বাঁধন। করাতিটোলায় এক নারীর ১৫ কাঠা জমি তারা দখল করে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, আসগর আলী হাসপাতালের পাশে ১৫ কাঠা জমির দখল নিয়ে শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে তাদের বিরোধ চরমে ওঠে। পেরে না উঠে ওই ব্যবসায়ীর চেয়ে দেড়গুণ বেশি দাম দিয়ে এনু-রশীদ ওই জমি কিনে নেন। গত ফেব্রুয়ারিতে এনু-রুপনের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা দয়াগঞ্জের ৪০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়টি দখল নিয়ে সেখানেও ক্লাব বানিয়ে বসানো হয় জুয়ার বোর্ড। জুয়া খেলার পাশাপাশি সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত চলত মাদক সেবন ও অসামাজিক কার্যকলাপ।

র‌্যাব জানিয়েছে, এনু-রুপন ও তাদের বড় ভাই রশীদের নামে ১৫টি বাড়ির তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, পুরান ঢাকায় এই ভূঁইয়া পরিবারের সদস্যদের অন্তত ৩০টি বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া কেরানীগঞ্জে ১০০ বিঘা ও ভারতের শিলিগুড়িতেও তাদের বিপুল ভূ-সম্পত্তি রয়েছে।

ক্যাসিনোর টাকায় এনু-রুপনরা শুধু বাড়ি-জমিই কেনেননি। কোটি কোটি টাকা আর ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এনু-রুপন নিজেদের পাশাপাশি পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ ১৭ জনকে বানিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা। তাদের মধ্যে বড় ভাই রশিদুল হক ওরফে রশিদ ভূঁইয়া ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, তার ছেলে বাতেনুর রহমান বাঁধন ৪১নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ভাতিজা তানিম হক একই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও নারিন্দা জুনিয়র ক্লাবের ১২ কর্মচারীকেও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতৃত্বে বসিয়েছেন এনু, রুপন ও রশিদ। তাদের মধ্যে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ব্যবস্থাপক পাভেল রহমান ৪০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, কর্মচারী জাহাঙ্গীর আবদুল্লাহ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, আসলাম ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক, মো. রাজ্জাক বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক, মো. হারুন নির্বাহী সদস্য। এ ছাড়া আফতাবউদ্দিন ৪১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, মো. তারেক কৃষিবিষয়ক সম্পাদক, মো. রতন ধর্মবিষয়ক সম্পাদক, মনজুরুল কাদের মামুন সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক, মিজানুর রহমান মিজান যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক এবং মো. মঞ্জু ও কুতুবউদ্দিন এখন কার্যনির্বাহী সদস্য। এনু আগামীতে সংসদ নির্বাচন এবং রুপন ও রশীদ ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানা গেছে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT