রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

শনিবার ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

০১:৩৯ অপরাহ্ণ

শিরোনাম
◈ ধামইরহাটে সোনার বাংলা সংগীত নিকেতনের বার্ষিক বনভোজন ◈ ধামইরহাটে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ◈ পত্নীতলায় করোনা সচেতনতায় নারীদের পাশে তথ্য আপা ◈ ফুলবাড়ীয়া ২ টাকার খাবার ও মাস্ক বিতরণ ◈ কাতারে ফেনী জেলা জাতীয়তাবাদী ফোরামের দোয়া মাহফিল ◈ হাসিবুর রহমান স্বপন এমপির রোগ মুক্তি কামনায় মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত ◈ দৈনিক আলোকিত সকালের ষ্টাফ রিপোর্টার আশাহীদ আলী আশার ৪৩তম জন্মদিন পালিত ◈ সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ফুটবলার রফিকুল ইসলাম স্মরণে দোয়া ও মিলাদ আজ ◈ লক্ষ্মীপুর জেলার শ্রেষ্ঠ ও‌সির পুরস্কার পে‌লেন ও‌সি আবদুল জ‌লিল ◈ কাতার সেনাবাহিনীর বিপক্ষে বাংলাদেশের পরাজয়

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ১৪ চিনিকল

প্রকাশিত : ০৭:১৪ AM, ৩ নভেম্বর ২০১৯ Sunday ৩০৮ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

এক মাস থেকে পাওয়া যাচ্ছে না দেশি চিনি। আগে ডিলাররা গাড়ি নিয়ে এলেও তাদের এখন দেখা মেলে না। এভাবেই আমার সংবাদকে অভিযোগ করে জানান মোহাম্মদপুরের বছিলা রোডের রাকিব স্টোরের রুবেল। এসময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আখতারুজ্জামান নামে এক ভোক্তা অভিযোগ করে বলেন, খুবই ভালো মানের দেশি চিনি। কিন্তু কিছুদিন থেকে না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে সাদা চিনি খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

শুধু ওই ব্যবসায়ী ও ভোক্তারই এই অভিযোগ নয়, রাজধানীসহ সারা দেশের একই চিত্র। দেশীয় আখ থেকে উৎপাদিত চিনি বিশুদ্ধ ও প্রাকৃতিক চিনি। নেই কোনো কেমিক্যাল। দাম একটু বেশি হলেও চাহিদা অনেক বেশি। তাই উৎপাদন বাড়াতে ২০১২ সালের দিকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনে (বিএসএফআইসি) বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। কিন্তু অগ্রগতি খুবই ধীরগতি।

অপরদিকে, সারা দেশে ১৫টি চিনিকলে প্রতিবছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও অর্জন করতে পারছে না। বরং ডিলারদের সিন্ডিকেটে মিলে পচছে চিনি। এর ফলে বছরের পর বছর লোকসানে হাবুডুবু খেতে খেতে ১৪টি মিল ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী কিছু নির্দেশনা দিলেও এক দশকেও তা মানা হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ২৩ জুন বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান অজিত কুমার পাল। সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, এখানে কোনো ধান্দা করতে আসিনি, তদবির করে আসিনি। মরা শিল্প নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে কি লাভ? চিনিশিল্পের ভবিষ্যৎ কি তা বলা মুশকিল। কারণ এখানে কোনো দক্ষ শ্রমিক নেই। বুড়োদের দিয়ে চলবে না। ক্যাপাসিটি বিল্ডআপ করতে হবে।

ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, তারও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গত বছর হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এবারো তার কম হবে না। সরকারের কাছে অর্থ চাইলেও দিচ্ছে না। আবার আখ চাষিরাও মিলে আখ দিতে রাজি হচ্ছে না। বিক্রি না হওয়ার অজুহাতে ডিলাররাও চিনি তুলছে না। তাদের কারণেই পচে যাচ্ছে চিনি।

কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ছাড়া অন্য চিনিমিলগুলো লাভে আনা যাচ্ছে না কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেরুতে মদের কারণেই লাভে আছে, মদ তো আমদানিও করে না সরকার। চিনির দিক দিয়ে সব মিল লোকসানে। মুসলমান দেশ হিসেবে সব মিলে তো মদ উৎপাদন করা যায় না। রংপুর নর্থ চিনিকলের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজন প্রকল্পটি টেন্ডার দিয়েও দরপত্র পাওয়া যায় না।

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিন মাস শুধু উৎপাদনে রেখে লাভ করা কখনো সম্ভব নয়। ৯ মাস বসে থেকে কখনো কোনো প্রতিষ্ঠান টিকতে পারে না। পরিকল্পনায় গলদ রয়েছে। ধ্বংস করার জন্যই এটা করা হয়েছে। তাই লাভে আনা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতি বছরই চলছে লোকসান। তদবির ছাড়া এখানে কেউ কোনো কাজে আসে না। চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে লাভ নেই। গতবার ৬৫ হাজার টন উৎপাদন হয়েছে। এবারের মৌসুমে এক লাখ ২৫ হাজার টন ধরা হয়েছে। এটা মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম।

প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের ব্যাপারে এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, এটা প্রাইভেট কোম্পানি, বাবার সম্পদ নয় যে ইচ্ছামতো সব করা যাবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান চিনিকল। তাই সরকারের নিয়মে চলতে হবে। আগে যেভাবে খুঁড়িয়ে চলেছে, সেভাবেই চলবে। নতুন করে সুসংবাদ দেয়ার কিছু নেই আমার। কারণ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালন করতে কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। বাস্তবতা বিবেচনা না করেই ১৪ মিলের জন্য ইটিপি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিবেশের ক্ষতি করে চিনিকল করা হয়েছে। তাই দীর্ঘ সময় ধরে ধুঁকছে এই শিল্প। কাজেই অল্পসময়ে দরদ দেখিয়ে লাভ নেই।

তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া ৬০ বছরের লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে লাভে আনা সম্ভব নয়। সম্পূর্ণভাবে ঢেলে না সাজালে এগোনো সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারের নিয়মে মেনে প্রকল্প হাতে নিতে হবে। ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে হবে। কিন্তু অর্থ পাব কোথায়? তারপর প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হবে। এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় চলে যাবে বছরের পর বছর। লোকসানের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আখচাষিদেরই তো ঠিকমতো অর্থ দেয়া যায় না। তাই যেখানেই যাই কেউ বিশ্বাসও করতে চায় না। অর্থমন্ত্রণালয় দিতে চায় না অর্থ। বলছে আর কত দেব। আখচাষিরাও আখ দিতে চায় না বলে অভিযোগ করে জানান অমিত কুমার পাল।

মতিঝিলে চিনি ও খাদ্যশিল্পের হেড অফিসে জুরাইন গ্যাসপাড়ার ব্যবসায়ী মামুন মেহেদী এ প্রতিবেদককে অভিযোগ করে জানান, এলাকায় আখের চিনি পাওয়া যায় না। তাই এখানে এসেছি চিনি নিতে। আদাবর বাজারের মিডলাইন পরিবহনের ড্রাইভার আব্দুর রহমানও বলেন, আখের চিনি ভালো হলেও কোথাও দেশি চিনি পাওয়া যায় না। তাই সাদা চিনি খেতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে চেয়ারম্যান বলেন, কে বলছে, চিনি নেই। আগোড়া, স্বপ্নসহ বড় বড় সুপারসপে যান দেখেন পান কিনা। তিনি আরও বলেন, ডিলাররা বেশি করে লাভ করতে চায়। তাই ছোট ছোট বাজারে বিক্রি করছে না তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চিনি বাংলাদেশে খুবই প্রয়োজনীয় খাবার। প্রায় সময় এর ব্যবহার হলেও রমজান মাসে এর ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যায়। সিন্ডিকেটের দখলেও চলে যায়। বেড়ে যায় দাম। তা নিয়ে হইচই পড়লে বাজার সামলাতে সরকার চিনি বিক্রির ঘোষণা দেয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের অধীনে চিনিকল আছে ১৫টি। এর মধ্যে একমাত্র কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লাভের মুখ দেখলেও বাকি ১৪টি সুগারমিলই লোকসান গুনছে।

এসব চিনিকলের তিনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্রিটিশ আমলে, ৯টি পাকিস্তান আমলে ও তিনটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। সরকারি হিসাবে দেশে প্রতি বছর ১৪ থেকে ১৬ লাখ টন পরিশোধিত চিনির প্রয়োজন হয়। এদের মোট দেশি চিনিকলের উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র দুই লাখ ১০ হাজার টন। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদনের ধারে কাছেও নেই। তাই সিটি, ফ্রেশ, দেশবন্ধুসহ বিভিন্ন কোম্পানির অপরিশোধিত চিনিই বাজার দখল করে রেখেছে।

সূত্র আরও জানায়, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় আসার পর চিনিকলগুলোর লোকসান কমানোর উদ্যোগ নেয়। তারপরও পারেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর উদ্যোগ নেন। এরই অংশ বিশেষ তিনি ১২ এপ্রিল চিনিশিল্পকে লাভজনক করতে কিছু নির্দেশনাও দেন। শূন্য পদে লোকবল নিয়োগেরও নির্দেশ দেন। এমনকি বাজার সামলাতে চিনি আমদানিরও নির্দেশ দেন। বিভিন্ন প্রকল্প হাতেও নেয়া হয়। এরপর ১৯৩৮ সালের প্রতিষ্ঠিত কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ২০১২ সালে জৈবসার কারখানা চালুসহ মোলাসেস বা চিটাগুড়, ব্যাগাস বা ছোবড়া, প্রেসমাড বা গাদ কাজে লাগাচ্ছে। এছাড়া এই চিনিকলে তৈরি হয় দুই ধরনের ভিনেগার, স্পিরিট। তাই লাভের মুখ দেখতে পেয়েছে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি কিন্তু বাকি চিনিকলগুলো বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে। কারণ এই কলগুলোকে লাভজনক করার জন্য বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে চারটি প্রকল্প চলমান। কিন্তু বাস্তবায়নে নেই অগ্রগতি।

গত বছরের ২২ মে সরকার ১৪টি চিনিকলে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। ৮৫ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি ২০২০ শেষ করার কথা। কিন্তু গত জুলাই পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। নাটোরের লালপুরে নর্থবেঙ্গল চিনিকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সুগার রিফাইনারি স্থাপন প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি অনুমোদন দেয়। ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুনে বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছরে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে খুবই কম। মাত্র ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

ধীরগতি শুধু এই প্রকল্পে নয়, ঠাকুরগাঁও চিনিকলের পুরাতন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন ও সুগার বিট থেকে চিনি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকার ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই অনুমোদন দেয়। প্রায় ৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনে বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু দীর্ঘ ছয় বছরে গত জুলাই পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ০২ শতাংশ। চুয়াডাঙ্গার দামুরহুদায় বিএমআর কেরু অ্যান্ড কোম্পানির জন্য ১০২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২ সালের ১২ এপ্রিলে সরকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। যা ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালে জুনে বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও জুলাই পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩৪ দশমিক ২৮ শতাংশ।

সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশের সরকারি চিনিকলগুলো বছর বছর শুধু লোকসান গুনে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে লোকসান হয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। অপরদিকে চিনিশিল্প কর্পোরেশনের কাছে সরকারের বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচশ কোটি টাকা। এ জন্য আর টাকা দিতে চাচ্ছে না চিনিকলগুলোকে। তাই বেকায়দায় পড়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT