রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

শুক্রবার ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

০৪:৩২ পূর্বাহ্ণ

‘জীবনের আগে জীবিকা নয়, সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়’

মাহফুজা অনন্যা

প্রকাশিত : 04:27 AM, 25 November 2019 Monday ৩১ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :
alokitosakal

সংসদে পাশ হওয়া আইন একবছরের বেশি সময় পার হওয়ার পর গত ১৭ই নভেম্বর ২০১৯ প্রয়োগ শুরু করেন ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা’ বিআরটিএ। এরপর থেকেই সড়ক আইন বাতিলের দাবিতে পরিবহন শ্রমিকরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। ফলে নানারকম যানযট ও চলাচলে বিঘ্ন ঘটে সাধারণ মানুষের। তারপর থেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক ও পরিবহন ধর্মঘট করেন শ্রমিকরা। নতুন সড়ক আইন সংশোধনের দাবিতে রাস্তায় নেমে পড়েন শ্রমিকরা। শ্রমিক আইনের ১২৬টি ধারার মধ্যে ৯টিতে শ্রমিকদের আপত্তি বলে একটি বিশেষ সূত্রে জানা গেছে। শ্রমিকরা বুধবার থেকে সড়ক অবরোধ শুরু করে এবং যানবাহন চলাচল পুরোপুরি অচল করে দেয়। ৩৩টি জেলায় কোন ধরণের পরিবহন চলাচল করতে দেয়া হয়নি। ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যানেও কোন পণ্য পরিবহন হয়নি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলায় সড়কে সড়কে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন পরিবহন শ্রমিকরা। রাস্তায় গাড়ি বের করলেও ড্রাইভারের মুখে কালি লেপন ও মারধর করেন। রাস্তায় গাড়ি বের করলে ভাঙচুর করেছেন পরিবহন শ্রমিকের কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবকেরা। মাঝপথে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে কোথাও কোথাও। সবমিলিয়ে চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে দিন পার করেন যাত্রীরা। ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল ছিল স্বাভাবিক।যেহেতু সড়ক পরিবহন বন্ধ, তাই ট্রেন ও লঞ্চে ছিল যাত্রীদের উপচে পড়া ভীড়।এত ভীড়েও যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম সড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় অবরোধ করে যান চলাচলে বাঁধা দেন শ্রমিকরা। অবরোধের কারণে আটকা পড়ে হাজার হাজার মানুষ। এছাড়া সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, টঙ্গী, ঢাকার আশুলিয়াসহ কয়েকটি স্থানে অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লাখলাখ মানুষ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।বিশেষ করে পিইসি পরীক্ষার্থীরা চরম বিপাকে পড়ে। গাড়ি না পেয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতে দেখা গেছে।কেউ কেউ বিকল্প উপায়ে তিনচারগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছেছেন।শ্রমিকদের এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে পণ্য আমদানি-রপ্তানি গাড়ির কার্যক্রমে প্রভাব পড়ায় কাঁচা তরিতরকারি ও শাকসবজির দাম বেড়ে যায়। জনমনে শুরু হয় বিব্রতকর ভোগান্তি। একদিকে সড়ক অবরোধ, বিশৃঙ্খলা অন্যদিকে তারই প্রভাব নিত্যপণ্যে।

এদিকে বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি)র হিসাব অনুযায়ী সারাদেশে গাড়ির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে ৩৮ লাখ। তারমধ্যে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি গাড়ি ফিটনেসবিহীন। ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন মাত্র সাড়ে ২২ লাখ চালক। অবৈধ চালকের সংখ্যার সঠিক কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হচ্ছে তা ১০ লাখের কম নয়। বিআরটিএ এর দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতির খবরও সকলেরই জানা। ঘুষ বা দুর্নীতি করে ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলির রুট পারমিট দেওয়ার অভিযোগ আছে সংস্থাটির। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ি। তাছাড়া রুট পারমিট না থাকা সত্ত্বেও গাড়ি চালানোর ফলে সড়কে গাড়ির সংখ্যার সাথেসাথে দুর্ঘটনা পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে।দুর্ঘটনার পর জনগণ ফুঁসে উঠলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ে কিন্তু কিছুদিন পরেই আবার তা স্তিমিত হয়ে যায়।সড়কে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন দুর্ঘটনা ঘটে। বুয়েটের এআরআই এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৫১৩টি। তারমধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৭৬ জনের।এআরআই এর তথ্যে আরও বলা হয়েছে প্রতিবছর দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছেই। এ পর্যন্ত দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িগুলি যাচাই করে দেখা গেছে প্রায় প্রত্যেকটি গাড়িই ফিটনেসবিহীন এবং ভারি যান চলাচলের জন্য তাদের রুট পারমিট ছিল না। তাছাড়া কে কার আগে যাবে এটা নিয়েও চলে ড্রাইভারদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগীতা।মাঝেমাঝে মাতাল অবস্থায়ও গাড়ি চালান ড্রাইভাররা এমন অভিযোগও আছে। ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি যাত্রী তোলা এবং যত্রতত্র বিশৃঙ্খলভাবে নামাতে গিয়েও দুর্ঘটনা ঘটে প্রায়ই।অদক্ষ ড্রাইভার ও জনগণের অসচেতনতার ফলে সড়কে দিনদিন বেড়েই চলেছে মৃত্যুর মিছিল।

নতুন আইনের আওতায় যে যেভাবে পুরোনো লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন সে লাইসেন্স দিয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত গাড়ি চালাতে পারবেন।অর্থাৎ ৭ মাস পর নতুন করে লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে।এবং সঠিক লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাতে হবে।ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানো যাবেনা।গাড়ীর ফিটনেস এবং মেয়াদের বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অনুমতি দেয়া হবে।

গাড়ির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নিয়ে শ্রমিকরা কিছু দাবি তুলেছেন তা বিআরটিএ জুনের মধ্যে বসে একটি সমাধান করবেন।বিদ্যমান লাইসেন্স নিয়ে বিআরটিএ এর কাছে গেলে বিআরটিএ সেগুলোর ক্যাটাগরি ঠিক করে দেবেন।অবৈধ লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালালে সেগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খতিয়ে দেখা উচিৎ।সড়কে যে বিশৃঙ্খলা চলছে তা নিরসনে নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটলেও এখনো আইন নিয়ে পরিবহন নৈরাজ্য থামেনি। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে হুটহাট ধর্মঘট ডেকে বসছে শ্রমিকেরা।সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার কারণেই সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না।প্রতিদিনই একাধিক প্রাণ ঝরছে।সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝেমাঝে সরব হলেও রহস্যজনকভাবে ঝিমিয়ে পড়েন।তারাও সিন্ডিকেটের দেখানো অবৈধ পথে হাঁটছেন। ফলে ঢাকাসহ সারাদেশে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে একের পর মিটিং,সুপারিশ করেও কোন ফায়দা করতে পারছেন না। অতীতেও অনেকবার সড়ক আইন করা হয়েছে কিন্তু তা শ্রমিক ও মালিক সমিতির অসহযোগীতার কারণে বাস্তবায়ন হয়নি। এক্ষত্রে বলা যায় আমাদের অবকাঠামো,প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক ক্ষমতার অভাব রয়েছে। যার ফলে আগের আইনটি পুরোপুরি প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। নতুন আইনটি আগের তুলনায় দশগুণ কঠোর।তাই নতুন আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামো,প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপক জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন ‘নতুন আইন সঠিকভাবে পালন করলে দুর্ঘটনা কমবে’।তিনি বলেন সড়ক পরিবহন মালিক- শ্রমিকনেতাসহ সকলের মতামতের ভিত্তিতে এই আইন প্রণয়ন করা হয়।যুগোপযোগী এই আইনটি পাশ হওয়ার পর ক্ষতির আশংকা করে আগেই ভয় পেয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে চারদিকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে তা খুবই দুংখজনক।এবং এমন অস্থিতিশীল পরিবেশ দেশের কোন সচেতন নাগরিক হিসেবে কারো কাম্য নয়।

সড়কপথে নিয়োজিত অদৃশ্য কিছু স্বার্থবাদী জনগোষ্ঠী পরিবহন সেক্টরে প্রভাব বিস্তার করে রেল কিংবা পানিপথেও নানাভাবে অসংগতি তৈরি করে থাকেন এবং জনমনে ভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেন।

পরিশেষে বলা যায় বিআরটিএ কে গাড়ী এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে আরও দায়িত্ববান এবং দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে।ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। লাইসেন্সবিহীন গাড়ি এবং চালকের গাড়ি চালানো বন্ধ করার জন্য ব্যাপক অভিযান চালাতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য দায়ি চালকদের শাস্তি ও বিচার কার্যকর করতে হবে। জনগণকে রাস্তা পারাপারের সঠিক নিয়ম মানতে হবে। গাড়ি কিংবা যেকোনো যানবাহনে চলাচলে প্রত্যকের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং দৃঢ়ভাবে মনে রাখতে হবে ‘জীবনের আগে জীবিকা নয়, সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়’। সূত্র: নিরাপদ নিউজ

লেখক: কবি ও শিক্ষক।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT