রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

শুক্রবার ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

জমি কিনে ফেলে রাখছেন সিলেটের প্রবাসীরা

প্রকাশিত : 07:24 AM, 6 November 2019 Wednesday ৩০ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :
alokitosakal

প্রবাসীবহুল সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর জমি পড়ে রয়েছে পতিত অবস্থায়। একসময় এসব জমিতে ধান চাষ হতো নিয়মিত। এখন পুরোপুরি অনাবাদি। পতিত এসব জমির সিংহভাগই প্রবাসী মালিকানাধীন। গোটা সিলেট বিভাগেই এখন প্রবাসীদের মধ্যে জমি কিনে পতিত ফেলে রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো, হাওড় এলাকা হওয়ায় এখানে জমি বর্গা দিতে গেলে নানা সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। উপরন্তু ভয় রয়েছে বেদখল হয়ে যাওয়ারও। এ কারণেই বিদেশে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তারা প্রচুর জমি কিনছেন ঠিকই, কিন্তু তা ফেলে রাখছেন অনাবাদি অবস্থায়।

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার জানাইয়া গ্রামের বাসিন্দা আখলাস আহমদ বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। বছর দশেক আগে একবার দেশে ফিরে তিনি আট একর ধানি জমি ক্রয় করেন। এর পর থেকেই এ জমি পতিত অবস্থায় ফেলে রেখেছেন তিনি।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জের বাসিন্দা যুক্তরাজ্য প্রবাসী আলী হোসেনের মালিকানায় রয়েছে প্রায় ২০ একর কৃষিজমি। এসব জমি পতিত পড়ে আছে অনেক দিন ধরে। আলী হোসেন দেশে তেমন আসেন না। দেশে সম্পত্তি দেখাশোনা করেন আলমগীর হোসেন নামে তার এক চাচাতো ভাই।

আলমগীর হোসেন বলেন, জমিগুলো হাওড় এলাকায়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। তেমন ফসল হয় না। শ্রমিক সংকটও রয়েছে। বারবার বিদেশ থেকে টাকা আনাই কৃষিকাজের জন্য, কিন্তু শেষে আশানুরূপ ফসল হয় না। এজন্য এখন বিদেশ থেকে চাষাবাদ না করতে বলা হয়েছে।

সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সিলেট বিভাগে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১৩ লাখ ২২ হাজার ৭৮৫ হেক্টর। নিট ফসলি জমি ৭ লাখ ৮৩ হাজার ৪৩৮ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার হেক্টর জমি এখন অনাবাদি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিভাগটিতে সবচেয়ে বেশি পতিত জমি আছে সিলেটে। জেলাটিতে প্রায় ৩১ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সেচ সংকট, শ্রমিকস্বল্পতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল না হওয়াসহ নানা কারণে প্রবাসীরা জমিতে চাষাবাদ না করে ফেলে রাখেন। এছাড়া তাদের মধ্যে জমি বেদখল হয়ে যাওয়ারও এক ধরনের ভয় কাজ করে।

এভাবে জমি অনাবাদি ফেলে রাখার প্রভাব দেখা যাচ্ছে এ অঞ্চলের শস্য উৎপাদনেও। দেশে ফসলের নিবিড়তা যেখানে ১৯৪ শতাংশ, সেখানে সিলেট বিভাগে তা ১৭০ শতাংশ।

সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার শ্রীরামপুরে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ধানি জমি পড়ে রয়েছে পতিত অবস্থায়। জমি ছেয়ে গেছে লম্বা ঘাসে। অনাবাদি এসব জমির মালিকরা সবাই প্রবাসী। স্থানীয়রা জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে এসব জমিতে কোনো ফসল ফলানো হয়নি।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, গ্রামটির উত্তরভাগ মৌজায় পতিত অবস্থায় পড়ে থাকা আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ২০ হেক্টর।

এ এলাকার যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুর রউফের মালিকানায় পতিত ধানিজমি রয়েছে পাঁচ হেক্টর। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমরা দেশে থাকি না। বর্গা দিলে কোনো ফসল পাওয়া যায় না। বর্গাচাষীর কাছ থেকে একেক বছর একেক অজুহাত শুনতে হয়। বন্যা, খরা, পোকার আক্রমণ, মড়ক ইত্যাদি লেগেই থাকে। অনেক সময় ধান চাষের জন্য আমাকেই খরচ জোগাতে হয়। তার ওপর জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার ঘটনাও অহরহই ঘটে। এ কারণে চাষের জমি ফেলে রাখাই উত্তম। এতে অন্তত বেদখল তো হবে না।

সিলেটের প্রবাসীবহুল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বিয়ানীবাজার, বিশ্বনাথ, গোলাপগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলায় এ চিত্র দেখা যায় সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে বিয়ানীবাজার উপজেলায় কৃষিজমি রয়েছে ২০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই পতিত পড়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিসুজ্জামান।

তিনি বলেন, এখানকার অনেক প্রবাসীর ৪০-৫০ বিঘা করে জমি আছে। তারা সেসব জমি পতিত ফেলে রেখেছেন। যেহেতু সেচ সংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এখানে কৃষিকাজ বেশ শ্রমসাধ্য, আবার এর বিপরীতে ফসল পাওয়ার নিশ্চয়তাও নেই; সে কারণেই তারা কৃষিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চান না। জমিগুলো ফেলে রাখেন। এছাড়া জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তাও রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করে পতিত জমি আবাদের আওতায় আনার চেষ্টা করছি।

প্রবাসী সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সিলেট ওভারসিজ সেন্টারের ওয়েলফেয়ার অফিসার মো. আব্দুল মোছাব্বির বলেন, সিলেটের প্রবাসীরা মূলত সপরিবারে দেশের বাইরে থাকেন। তারা দেশে থাকা সম্পত্তি নিয়ে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। প্রবাসীদের জমি দখল হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে অহরহ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘনিষ্ঠ স্বজনরাই দখল করে নেন প্রবাসীর সম্পত্তি। এ কারণে অনেকটা অনিরাপত্তাবোধ থেকেই প্রবাসীরা জমি কাউকে চাষাবাদের জন্য না দিয়ে ফেলে রাখেন। এছাড়া আর্থিক টানাপড়েন না থাকায় জমি আবাদের ঝামেলায়ও যেতে চান না তারা।

প্রবাসীদের জমিসংক্রান্ত এ নিরাপত্তাবোধের অভাব একেবারে অমূলকও নয়। সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সমিউল আলম জানান, সিলেটের আদালতে চলমান মামলাগুলোর বেশির ভাগই জমিজমাসংক্রান্ত। জমি নিয়ে মামলা সিলেট অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি। এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এসব মামলার সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

সিলেটের প্রায় পাঁচ লাখ লোক প্রবাসে বসবাস করেন। এদের মধ্যে যুক্তরাজ্য প্রবাসীর সংখ্যাই সর্বাধিক। সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশীদের মধ্যে ৯০ শতাংশই সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা। এসব যুক্তরাজ্য প্রবাসী সিলেট অঞ্চলে ‘লন্ডনি’ নামে পরিচিত। জমি কিনে অব্যবহূত অবস্থায় ফেলে রাখার দিক থেকে এ লন্ডনিরাই এগিয়ে রয়েছেন সবচেয়ে বেশি। এদের অনেকেই আবার কৃষিজমিতে গড়ে তুলেছেন অট্টালিকা। যদিও এসব অট্টালিকায় তাদের পরিবারের কেউই থাকে না।

তবে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসছে বলে দাবি করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মজুমদার মো. ইলিয়াস বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা প্রবাসীদের চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি। জমি যাতে বেহাত না হয়, সে ব্যাপারে প্রশাসনের সহযোগিতাও নিচ্ছি। এতে সুফলও মিলছে। অনাবাদি জমির পরিমাণও অনেক কমে আসছে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT