রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

০৭:০৬ অপরাহ্ণ

শিরোনাম

তোড়জোড় কেবল এখনই আগে-পরে কেন নয়

প্রকাশিত : ০৪:৩৪ PM, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ Sunday ৪৬ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় আশাব্যঞ্জক তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ঘটনার পর চব্বিশ ঘণ্টা না যেতেই গঠিত হয়েছে তিন তিনটি তদন্ত কমিটি। মসজিদ কমিটির টনক নড়েছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের হেলদোল শুরু হয়েছে। কিন্তু এ সবই হচ্ছে তখন, যখন ১৪ জনের মৃত্যু ইতোমধ্যে হয়েছে এবং বাকি ২৬ জন রয়েছে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। যখন স্বজনদের চোখের জল আর কান্নায় ভারী হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যালের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট আর নারায়ণগঞ্জের তল্লার মসজিদ এলাকা। অথচ এ দুর্ঘটনা, হতাহত আর স্বজন হারানোর আর্তনাদ-আহাজারি সবই রোধ করা যেত, যদি আগে-পরে সেই অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অন্যায়, ঢিমেতালের ‘জগদ্দল পাথর’ সংস্কৃতি থেকে বেরোতে পারতাম। নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় আমরা ব্যথিত, শোকাহত, শোকস্তব্ধ। স্বজন হারানোদের কান্না, অসহায়ত্ব সিক্ত করেছে আমাদেরকেও। আমরা এও জানি, এ কান্না এখানেই শেষ নয়। অথচ যারা চাইলে এসব রোধ করতে পারে, অনেকাংশেই কমিয়ে আনতে পারে, এবং যাদের দায়িত্ব এগুলো নিশ্চিত করা তারা এটা যথাযথভাবে পালন করে না। আর করে না বলেই দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনা এখানে কেবলই বেড়ে চলেছে। আমরা দুর্ঘটনার পরই জানতে পারি, কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটল। বিল্ডিং ভেঙে পড়ার পর ফলাও করে জানানো হয় নকশা ঠিক ছিল না, ভবনটা অবৈধ, বিল্ডিং কোড মানা হয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি। জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পর এগুলো জেনে বা জানিয়ে কার লাভ, কিসের সান্ত্বনা। হ্যাঁ, লাভ কিংবা সান্ত্বনা একটা কিছু হয়তো হতো যদি দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হতো, যদি ওই ঘটনার পর এ ধরনের ঘটনা বা পরিস্থিতি রোধে সর্বত্র অভিযান চালানো হতো, এবং ভবিষ্যতে যেন ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করত সময়োচিত ও যথাযথ পদক্ষেপ। কিন্তু না তেমনটা হয় না, অথচ এটাই প্রত্যাশিত, এটা করতে তারা বাধ্য, কারণ তারা প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কর্মচারী। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের রাখাই তো হয়েছে জনগণের জান ও মালের নিশ্চয়তা বিধান করার লক্ষ্যে। কিন্তু ন্যায্যই এখন অন্যায্য বলে বিবেচিত হওয়ার সংস্কৃতি গেড়ে বসেছে। আর এই সুযোগে কেউই নিজ নিজ দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করছে না। কারণ উনি বা উনারা জানেন দায়িত্ব পালনে ত্রুটি থাকলে, অবহেলা করলে কিংবা যথাযথভাবে পালন না করলেও তেমন কিছু হবে না। বাস্তবিকই যদি তেমনটা হতো কৃতকর্মের জন্য শাস্তি নিশ্চিত করা যেত, তা হলে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর পরই যে রকম তোড়জোড় দেখা যায়, সেটা চলমান থাকত, রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হতো এবং আগে-পরেও এ কাজগুলো সম্পন্ন করা হতো যত্ন ও নিষ্ঠার প্রযত্নে। শিল্পনগরী নারায়ণঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত হন ৩৭ জন। ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. সামন্ত লাল সেনের উদ্ধৃতিতে বিবিসি বাংলার খবর, ‘সকাল পর্যন্ত মারা গেছে ১১ জন। কিন্তু যারা এখনো বেঁচে আছে তাদের অবস্থাও খুব জটিল। অনেকেরই শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ আগে খোঁজ নিয়েছেন ও নির্দেশ দিয়েছেন সম্ভাব্য সব কিছু করতে। আমরা সেটাই চেষ্টা করছি।’ ডা. সামন্ত লাল সেনের চেষ্টা সফল হোক। যারা জটিল অবস্থার মধ্যে আছেন, তারা সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক স্বাভাবিক জীবনে। দুর্ঘটনাটা কতটা ভয়াবহ তা স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি ৩৭ জন মুসল্লির সবাই আহত হয়েছে মারাত্মকভাবে। দুর্ঘটনা আকস্মিক ঘটলেও, বিপদ আঁচ করা গেছে বেশ আগেই। ঘটনা ঘটার পর পরই মনে করা হয়েছিল, মসজিদে থাকা এসির বিস্ফোরণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এসির বিস্ফোরণ নয়, গ্যাসের লিকেজজনিত কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপসহকারী আবদুল্লাহ আরেফিন একটি জাতীয় দৈনিকে বলেন, ‘গ্যাসের লিকেজ থেকে মসজিদে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। মসজিদের ভেতরে গ্যাস ভরে থাকায় বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ থেকে মুহূর্তে এ বিস্ফোরণ হয়েছে। এখানে এসি থেকে কোনো বিস্ফোরণ ঘটেনি। মসজিদের ভেতরে গ্যাস জমে থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।’ (প্রথম আলো অনলাইন ৫ সেপ্টেম্বর ২০২০)। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে মোটামুটি নিশ্চিত যে, গ্যাসের লিকেজজনিত কারণেই নারায়ণগঞ্জের মসজিদে দুর্ঘটনা হয়েছে। গ্যাসের লিকেজের বিষয়টা মসজিদ কমিটি, মুসল্লিরা শুধু নয় পথচারীরাও জানত। নামাজ পড়ার সময় মুসল্লিরা যেমন গ্যাসের গন্ধ পেত, মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পথচারীরাও গ্যাসের গন্ধ পেত। এবং উভয় পক্ষ থেকেই মসজিদ কমিটিকে বিষয়টা জানানো হয়েছে। মসজিদ কমিটিও বিষয়টা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং সমস্যা দূর করতে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিল। কিন্তু তারা সময়মতো যথাযথ দায়িত্ব পালন না করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল বলে মসজিদ কমিটির সভাপতি আবদুল গফুরের ভাষ্য। মসজিদ কমিটির সভাপতির বক্তব্য থেকে আরও জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার তার (আবদুল গফুর) কাছে ৫০ হাজার টাকা চেয়েছে, তিনি সেই টাকা জোগাড় করার চেষ্টাও করছিলেন। কিন্তু তার আগেই এ দুর্ঘটনা। পত্রপত্রিকায় এখনো সেই ঠিকাদারের নাম পরিচয় জানা যায়নি। তিনি কেন টাকা চাইলেন, এবং টাকা চাওয়ার বিধান রয়েছে কিনা, না থাকলে তিনি কেন এখনো আড়ালেই রয়ে গেছেন সেই প্রশ্নের সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের নিয়মাবলিটাও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ জানানোর পর সেটা কি লিখিত নেওয়া হয় এবং নেওয়া হলে সেই মর্মে কি কোনো প্রমাণাদি দেওয়া হয়। অভিযোগ জানানোর কত ঘণ্টা কিংবা কয় দিনের মধ্যে তারা সমস্যার সমাধান করে দিতে বাধ্য। মসজিদ কমিটির সভাপতি যে অভিযোগ জানিয়েছিলেন সেটা কী লিখিত, কবে জানিয়েছিলেন সেসব বিষয় যদি অবহিত হওয়া যেত, তা হলে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে আরও বেশি সহায়ক হতো। মসজিদের নিচ দিয়ে গ্যাসের লাইন গেছে বলেও একটা অভিযোগ উঠে এসেছে। এটা কেন হলো, কাদের অবহেলায় হলো, তখন কি মসজিদ কমিটি এটা নিয়ে কোনো প্রকার অভিযোগ কিংবা প্রতিবাদ জানিয়েছিল? এখন পর্যন্ত তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরা হলো ১. নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন, ২. তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ও ৩. ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। এসব কমিটিকে বিভিন্ন মেয়াদে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে তদন্ত পেশ করার জন্য। এখন তদন্ত কমিটি যদি সময়মতো রিপোর্ট পেশ করে এবং দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে তবে সেটাই হবে এসব কমিটির সার্থকতা। কিন্তু বেদনাদায়ক হলেও সত্যি, এসব ঘটনার প্রত্যাশিত কার্যক্রম অচিরেই গতিহীন হয়ে পড়ে। কিংবা শেষাবধি এর কোনো সন্তোষজনক ফল মেলে না । বিশেষ করে যারা এবং যেসব পরিবার এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী তাদের কাছে সান্ত্বনার কিছুই থাকে না, কারণ দায়ীদের বিচার হয় না। দীর্ঘমেয়াদে চলা বিচার কার্যক্রম তাদের কাছে বিচারহীনতার নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অপরাধীরা এসব ঘটনা থেকে সতর্ক হয় না, সাবধানতা অবলম্বন করে না। ফলে ট্র্যাজেডি রচিত হয় রানা প্লাজায়, নিমতলীতে, এফআর টাওয়ারের মতো অজস্র সব ঘটনায়। এসবের ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার এশার নামাজের সময় যুক্ত হয় নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদ। যাতে ইতোমধ্যে মারা গেছে ১৪ জন আর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন ২৩ জন। দায়হীনতা বা দায় এড়ানোর সংস্কৃতির চর্চা বেড়ে যাওয়ার ফলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে। এক একটা ঘটনা যখনই ঘটে তখনই বিভিন্ন মহল থেকে আমরা আশাবাদী হওয়ার মতো কথাবার্তা, ফাইল চালাচালির খবর শুনতে পাই। কিন্তু যা কিছুই হয় সবই তাৎক্ষণিক। তার পর সময় গড়ায়। ওই ঘটনার স্মৃতি ফিকে হয়ে আসে। যারা স্বজন হারায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারা শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কারণ সব আশ্বাসই সময়ের সঙ্গে ফুটো বেলুনের মতো উবে গেছে। কারণ যত তোড়জোড়, যত আশ্বাস, যত কমিটি সবই কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের জন্য। তার পর সব সেই আগের মতো। কেউ দায়ী নয়, কারও দায় নেই, কোনো প্রকার শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ নেই, ভবিষ্যতের জন্য কিছুই করণীয় নেই। আগে পরে যে লাউ সেই কদু।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT