রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

সোমবার ১৭ মে ২০২১, ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

০৪:১৮ অপরাহ্ণ

শিরোনাম
◈ ঈদ প্রীতি ফুটবল ম্যাচ,বড় দল বনাম ছোট দল, বিশেষ আকর্ষণ দেশের দ্রুত তম মানব ইসমাইল ◈ বিরলে শেখ হাসিনা’র স্বদেশ-প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে যুবলীগের দোয়া ও খাদ্য বিতরণ ◈ বুড়িচং উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের মতবিনিময় সভা অনষ্ঠিত ◈ মতিন খসরু’র স্মরণ সভা ও পূর্ণমিলনী অনুষ্ঠিত ◈ স্ত্রী কানিজ ফাতিমা হত্যায় আটক সেনা সদস্য স্বামী রাকিবুলের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন ◈ বাঁশখালীতে বেড়াতে আসা তরুণীকে ধর্ষণ করে আবারো আলোচনায় সেই নূরু ◈ ছাগলনাইয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মেজবাহ্ উদ্দিন আহমেদ এর বিদায় সংবর্ধনা ◈ বাঁশখালীতে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করায় ড্রেজার মেশিন জব্দ ◈ বাঁশখালী সাধনপুরে কাঁদায় দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত ◈ নবীনগর বিটঘরে কাল বৈশাখীর ঝড়ে গাছের ডাল পড়ে বৃদ্ধের মৃত্যু

চালকের গাফিলতি বাড়ছে

প্রকাশিত : ০৬:০১ AM, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ বুধবার ২২৬ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় গতকাল মঙ্গলবারের ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সামনে উঠে এসেছে চালকের গাফিলতি। তূর্ণা নিশিথা ট্রেনের অভিযুক্ত চালক লোকোমাস্টার তাছের উদ্দিন স্বীকার করেছেন, তার ভুলেই এ দুর্ঘটনা। কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, কুয়াশার কারণে সিগন্যাল দেখতে না পাওয়ার কথা। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পর লোকোমাস্টার তাছের ছাড়াও সহকারী লোকোমাস্টার অপু দে ও ওয়ার্কিং গার্ড আব্দুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।

সাধারণত দুটি কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। টেকনিক্যাল এরর (কারিগরি ত্রুটি) ও হিউম্যান এরর (মনুষ্য ভুল)। গত কয়েক বছরের মানুষের ভুলের কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে। রেল কর্তৃপক্ষের ২০১৮ সাল পর্যন্ত করা হিসাবে, ১০ বছরে ৩ হাজার ৪শ ৮৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যাতে প্রায় ৪শ যাত্রীর প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের পর থেকে হিউম্যান এরর বেশি। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং সুপারিশ জমা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিলে ট্রেন দুর্ঘটনা ভয়াবহতা হয়ত এড়ানো যেত। গত ১০ বছরে রেলের দুর্ঘটনার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, উভয় ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, পাশাপাশি ট্রেনের ধাক্কা, চলন্ত ট্রেন বিভক্ত হয়ে পড়া, লেভেল ক্রসিংগেটের দুর্ঘটনা, সিগন্যাল অমান্য, লাইনচ্যুতির ফলে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে।

অভিযুক্ত ট্রেন চালক তাছেরউদ্দিন গতকালের দুর্ঘটনা নিয়ে রেলের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের জানান, ট্রেনটির গতি ছিল ৭০। স্টেশনে আসার পর কুয়াশার কারণে সিগন্যাল দেখতে না পাওয়ায় দুর্ঘটনা এড়ানো যায়নি। দুর্ঘটনার আগে ট্রেনটির গতি ছিল ২০ কিলোমিটার। উদয়ন এক্সপ্রেসের সঙ্গে ধাক্কা লাগার আগমুহূর্তে ব্রেক কষা হলেও ট্রেনটি পুরোপুরি থামানো যায়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, চালকের দোষ। অবশ্য চালক তার বক্তব্যে কুয়াশার কারণে সিগন্যাল দেখতে পাননি বলে জানিয়েছেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে যাওয়ার সময় কুয়াশার কারণে আমার গাড়িও সড়কের পাশের গাছে গিয়ে ধাক্কা মারে।

রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক আবু তাহের আমাদের সময়কে বলেন, দুর্ঘটনা এড়াতে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। চালকের দোষে ট্রেন দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে বলে মনে হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে আমার এমন উপলব্ধি হয়েছে। তবে তদন্ত কমিটিই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে। আমি জিআইবিআর (বাংলাদেশ রেলওয়ের জেনারেল ইন্সপেক্টর) থাকাকালে বহু দুর্ঘটনার তদন্ত করেছি। তদন্তের পর দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে কমিটি বিভিন্ন সুপারিশ করে থাকে। দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে হলে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) হাবিবুর রহমান বলেন, ট্রেন বিজ্ঞানসম্মতভাবে চলে। একটি ট্রেন স্টেশনে অপেক্ষমান অবস্থায় একই লাইনে আরেকটি ট্রেন প্রবেশের সুযোগ নেই। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিপরীতমুখী ট্রেনকে থামার সংকেত দেওয়া হয় এবং এমন সংকেতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। এসব কারণে মনে হচ্ছে, এ দুর্ঘটনায় তূর্ণা নিশিথার চালকেরই দোষ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, উদয়ন এক্সপ্রেসের বগিতে ধাক্কা মেরেছে তূর্ণা নিশিথা। এটি মুখোমুখি সংঘর্ষ নয়। একে রেলের ভাষায় বলে সাইড কল্যুশন। তূর্ণা নিশিথার চালকের ঘুমিয়ে পড়া বা সহকারীকে দিয়ে ট্রেন চালনার ঘটনা ঘটেছে কি নাÑ এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি। যদিও চালক জানিয়েছেন কুয়াশায় সিগন্যাল দেখতে পাননি।

তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ডিউটির কারণে চালকের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব এসেছিল কিনা তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, চালক চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছিলেন। তাহলে কেন তিনি অমনযোগী ছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ২০১৪ সালে ১৮৮টি দুর্ঘটনায় ৪৬ জন মারা যান, ২০১৫ সালে ১২৮টি দুর্ঘটনায় ১৮, ২০১৬ সালে ৯৬টি দুর্ঘটনায় ১২, ২০১৭ সালে ১১৫ দুর্ঘটনায় ১২ এবং ২০১৮ সালে ১০৫ দুর্ঘটনায় ১৮ জন মারা যান। এর আগে ২০০৮-২০১৩ সালের হিসাবে দেখা গেছে, এ সময়কালে ২৭৯৮টি দুর্ঘটনায় ২০৪জন মারা গেছেন; আহত হয়েছেন ৫০৮জন।

গতকাল ট্রেন দুর্ঘটনার পর চালকের গাফিলতির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশি। এ দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রেলে যারা কাজ করেন, তাদের আরও শক্ত (দক্ষ) করা উচিত এবং সেই সঙ্গে রেলচালকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, জানি না কেন, শীত মৌসুম এলে শুধু আমাদের দেশেই নয়, সমগ্র বিশ্বেই রেল দুর্ঘটনা দেখা যায়।

এদিকে গত মাসে চালক ছাড়াই ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহীতে যায় পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেন। ওই ঘটনায় দায়ী ৩ জনকে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করে রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ। বরখাস্তকৃতরা হলেন, ঈশ্বরদী রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেনের চালক লোকোমাস্টার (এলএম) আসলাম উদ্দিন খান মিলন, শ্রমিক লীগের একই কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ও ওই ট্রেনের সহকারী লোকো মাস্টার (এএলএম) আহসান উদ্দিন আশা এবং ট্রেনের পরিচালক (গার্ড) আনোয়ার হোসেন। ওই ঘটনার পর সারা দেশে ট্রেনচালকদের দায়িত্বহীনতার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

বলা হয়, রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকায় এসব চালক-শ্রমিকের বিরুদ্ধে কখনোই ব্যবস্থা নিতে পারে না রেল কর্তৃপক্ষ। একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল টঙ্গী-বিমানবন্দর এলাকায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জিএস রুলের সংশ্লিষ্ট ধারা মানার তাগিদ দেওয়া হয়। সিগন্যালিং ত্রুটি ধরা পড়ে ওই দুর্ঘটনায়। এ বছরের ২৩ জুন দুর্ঘটনা ঘটায় উপবন এক্সপ্রেস।

এ ক্ষেত্রেও হিউম্যান এরর পাওয়া গেছে। এসব দুর্ঘটনার নেপথ্যে অপারেটিং বিভাগে লোকবলের স্বল্পতাও বড় কারণ। মেকানক্যিাল বিভাগের অধীন ট্রেনচালক পদেও জনবল সঙ্কট রয়েছে। অতিরিক্ত ডিউটি করতে হয় চালকদের। একদিকে ট্রেন বাড়লেও অন্যদিকে কমছে চালকের সংখ্যা। অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, রেলে ১৭৪২টি পদ রয়েছে ট্রেনচালকের। এর মধ্যে ৬১৬টিই শূন্য। এর মধ্যে প্রথম ধাপে মানে গ্রেড-২ এসিস্ট্যান্ট লোকোমাস্টারের (এএলএম) ৩৮৮টি পদের মধ্যে শূন্য ১৭০টি। একজন সহকারী লোকোমাস্টার কয়েক বছর পর লোকোমাস্টার হিসেবে পদোন্নতি পান।

এজন্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ধাপ রয়েছে। এছাড়া ট্রেন চালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদ স্টেশন মাস্টার। এক্ষেত্রে ১২০৫টি পদের বিপরীতে ৪৪৯টিই শূন্য। তদুপরি ৫০ জন স্টেশনমাস্টার দায়িত্ব পালন করছেন চুক্তির ভিত্তিতে। অথচ স্টেশনমাস্টার পদে দায়িত্ব পেতে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়। ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত পয়েন্টসম্যানের ১৪৪৫টি পদের মধ্যে ১৫৪টি শূন্য এবং পোর্টারের ৫৪৭টি পদের মধ্যে ২৩৮টি শূন্য।

গতকাল মন্দবাগ স্টেশনে যে দুর্ঘটনা ঘটে, সেটি ‘বি’ ক্লাস স্টেশনের। রেলে বি ক্লাস, ডি ক্লাস ও হল্ট এ তিন শ্রেণীর স্টেশন রয়েছে। এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ট্রেন অতিক্রম করতে লাইন ক্লিয়ারেন্সের দরকার হয়। রেলে বি ক্লাসের ৩৪৫টি, ডি ক্লাসের ১০২টি এবং হল্ট ক্লাসের ১৫টি স্টেশন রয়েছে। সব মিলিয়ে চালু স্টেশন ৩৫৪টি আর বন্ধ ১১২টি রেলস্টেশন।

লোকবলের এতো সংকটের মধ্যেও জানা গেছে, রেলের চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সংস্থাটির এ নিয়োগ প্রক্রিয়া চলে ১৯৮৫ সালের বিধির মাধ্যমে। তবে এ নিয়োগবিধি অবৈধ বলে সম্প্রতি মত দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। রেলের সেবাপ্রদান ও নিরাপত্তার জন্য এ এক দুঃসংবাদই বটে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

এই বিভাগের জনপ্রিয়

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT