রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

বুধবার ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১লা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

০৭:১০ পূর্বাহ্ণ

কী জবাব শাসক দলের

প্রকাশিত : ০৫:০০ AM, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শনিবার ১৬১ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

চলমান ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে একে একে ধরা পড়ছে কেউকেটারা। যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, আওয়ামী লীগের পরিচয়ে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়েছেন তারা। বস্তাভর্তি টাকা রাখছেন বাড়ির সিন্দুকে আবার কেউ করছেন টাকা পাচার। কেউবা আবার বাড়িভর্তি মজুদ করছেন সোনা। অভিযান আর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে একের পর এক কেচ্ছা-কাহিনী। কিন্তু এরই মাঝে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর এক বিষয়। সেটি হচ্ছে ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাজির আড়ালে দলীয় মতাদর্শ বদল করে দিব্যি যুবলীগ কিংবা শাসক দলের বনে গেছেন বিরোধী শিবিরের লোকজন।

অভিযুক্তদের মধ্যে যেমন বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের রাজনৈতিক দল ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার রয়েছেন (যার বিরুদ্ধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগও উঠেছে), আবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তাও রয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের প্রতাপশালী নেতারাই তাদের দলে ভিড়িয়েছেন, আবার এতদিন ধরে পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছেন। এ ধরনের ভয়ঙ্কর লোকদের দলে ভেড়ানোর কী জবাব আছে শাসক দলের।

রাজধানীর ফকিরাপুল ইয়াংমেন্স ক্লাবে বসানো ক্যাসিনো ও জুয়ার আড্ডাতে র‌্যাবের হানার মাধ্যমে শুরু হয় এবারের শুদ্ধি অভিযান। এ ক্যাসিনোসহ রাজধানীতে ১৫টি ক্যাসিনো পরিচালনা, দেখভাল ও চাঁদা তুলতেন ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এ অভিযানের প্রথম গ্রেফতারও খালেদ। অবৈধভাবে ক্যাসিনো চালানোর পাশাপাশি তার শুলশানের বাসায় অভিযানে মেলে বিপুল পরিমাণ টাকা, বিদেশি মুদ্রা, ইয়াবা ও অবৈধ অস্ত্র। আর রাজধানীর কমলাপুরে মেলে তার টর্চার সেল। এ সব ঘটনায় খালেদের বিরুদ্ধে চার মামলা হয়। প্রথম দফা রিমান্ড শেষে গতকাল দ্বিতীয় দফায় ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তার মামলা পুলিশ থেকে র‌্যাবে স্থানান্তর হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, যুবলীগ থেকে সদ্য বহিষ্কৃত খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে একে একে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। এক সময়কার বিএনপিপন্থি প্রভাবশালী উকিলের সন্তান খালেদ বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি রশিদ-ফারুকের হাতে গড়ে ওঠা ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার ছিলেন। গোয়েন্দা সূত্রে বেরিয়ে এসেছে, এই খালেদ ১৯৮৯ সালে ধানমণ্ডে ৩২ নম্বরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বাড়িতে গুলি ও বোমা ছুড়ে তাকে হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি।

প্রাথমিক চার্জশিটে তার নাম থাকলে ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের আমলে সেই চার্জশিট থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে খালেদের বাবা ও বিএনপিপন্থি আইনজীবী আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার তৎপরতায় মৃত দেখিয়ে চার্জশিট থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়। ফ্রিডম পার্টির এই সশস্ত্র ক্যাডার একসময় যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের হয়েও রাজনীতি করেছেন তিনি।

ভয়ঙ্কর প্রকৃতির এই ক্যাডার খালেদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য বহুবার মামলা হয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালী আইনজীবী বাবার কারণে তিনি বারবার বেঁচে গেছেন। যুবলীগে তার পৃষ্ঠপোষক ঢাকার ক্যাসিনো সম্রাট হিসেবে পরিচিত ইসমাইল হোসেন সম্রাট। তিনি ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে মানিক ও মুরাদের নেতৃত্বে খালেদ জামায়াত নেতা আব্বাস আলী খানের নির্বাচন করেছিলেন। নির্বাচনী কাজের জন্য সে সময় তাদের জামায়াতের পক্ষ থেকে ওয়াকিটকিও দেওয়া হয়েছিল। এক সময় শান্তিনগরের হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে ভর্তি হন তিনি। সেখানে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে পুলিশের সঙ্গে তার সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে তার একটি পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই থেকেই তাকে ল্যাংড়া খালেদ নামে অনেকে চেনে।

পরবর্তীতে বিএনপির এক শীর্ষ নেতার ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হন খালেদ। তার মায়ের নামও খালেদা- এমন কথা বলে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করতেন। ১৯৯৪ সালের মেয়র নির্বাচনে খালেদ খিলগাঁও রেলওয়ে কলোনি থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আসা আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ ও তার কর্মীদের অস্ত্রের মুখে বের করে দেন।

একপর্যায়ে খালেদ মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের অনুমতি পান। যুবদলের সন্ত্রাসী মজনুর ক্যাসিয়ার হিসেবে কাজ করেন। ২০০৮ সালে ক্ষমতার পালাবদল হওয়ার পর ২০১০ সালে খালেদ যুবলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। অচিরেই খিলগাঁও বাজার কমিটির সভাপতি হন। যুবলীগে প্রথমে তাকে শাহজাহানপুর থানা শাখার সভাপতি পদ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তিনি মহানগরের সাংগঠনিক পদ দাবি করেন। ২০১২ সালের পর মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ছত্রছায়ায় ঢাকার এক অংশের নিয়ন্ত্রণ আসে খালেদের হাতে।

২০১৭ সালের পর সম্রাটের আশীর্বাদে মতিঝিল, ফকিরাপুলের কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণে নেন খালেদ। এর মধ্যে ১৬টি ক্লাব নিজের লোকজন দিয়ে আর ফকিরাপুল ইয়াংম্যানস ক্লাব সরাসরি তিনি পরিচালনা করতেন। প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে এক লাখ টাকা করে নিতেন তিনি। এসব ক্লাবে ক্যাসিনোর পাশাপাশি ছিল মাদকের ছড়াছড়ি। পাওয়া যায় ইয়াবাও।

খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তা বিসিবি প্রধানের বন্ধু
ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতার আরেক মহারথী লোকমান হোসেন ভূঁইয়াকে নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে শাসক দল। বিসিবির পরিচালক ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমানকে দুইদিনের হেফাজতে নিয়েছে র‌্যাব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে র‌্যাব গণমাধ্যমে জানিয়েছে, লোকমান নিজের ক্ষমতার দাপটে ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ক্যাসিনোর জন্য ভাড়া দিয়েছিলেন।

গত দুই বছরে ক্যাসিনো থেকে অবৈধভাবে আয় করা ৪১ কোটি টাকা তিনি অস্ট্রেলিয়া পাচার করেন। তার কাছ থেকে ক্যাসিনো চালানোর জন্য ক্লাব ভাড়া নিয়েছিলেন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মমিনুল হক ওরফে সাঈদ।

১৯৯৬ সালে বিরোধীদলীয় নেতা থাকাকালে বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা কর্মকর্তা ছিলেন লোকমান হোসেন। এর আগে, ১৯৯৩ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হন লোকমান। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুর ঘনিষ্ঠ তিনি। বর্তমানে তিনি বিসিবি সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা নাজমুল হাসান পাপনের ঘনিষ্ঠ।

জানা যায়, লোকমান ১৯৯৩-৯৪ সালে মোহামেডানে যুক্ত হন ফালুর হাত ধরে। আবার এই ক্লাব সূত্রেই ফালুর সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ে। একপর্যায়ে ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হয়ে যান লোকমান। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ২০১১ সালে লিমিটেড কোম্পানি হলে তিনি তার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হন। এরপর ২০১৩ সালেও তিনি একই পদে নির্বাচিত হন। এরপর থেকে অঘোষিতভাবে তিনিই ক্লাব চালাচ্ছিলেন।

লোকমান ক্রিকেট বোর্ডে আসেন ২০১২ সালে। সে সময় ক্রিকেটের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতাই ছিল না। বিসিবি সভাপতি পাপনের আনুকূল্যে তিনি একপর্যায়ে বিসিবি পরিচালক হয়ে যান। পাপন জানিয়েছেন, লোকমান তার বন্ধু। কিন্তু সে যে ক্যাসিনো চালায় তা তিনি জানেন না। তবে বড় প্রশ্ন এখানে থেকেই যায়। আওয়ামী লীগের এমপি পাপন কি তবে জানতেন লোকমানের রাজনৈতিক পরিচয়।

সাবেক প্রতিমন্ত্রীর আশীর্বাদে সাবেক যুবদল নেতা টেন্ডারমোঘল
ঢাকার টেন্ডারমোঘল হিসেবে পরিচিত জি কে শামীম একসময় যুবদল করতেন। বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস যখন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সে সময়েই তার ঠিকাদারিতে প্রবেশ। ধূর্ত শামীম একসময় টেন্ডারবাজিতে পটু হয়ে ওঠেন। গণপূর্তের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তিনি ঘুষের মাধ্যমে ম্যানেজ করার কৌশল আয়ত্তে নেন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি রাজনৈতিক ভোল পাল্টিয়ে ফেলেন। মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ থেকে আওয়ামী লীগের গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খানের স্নেহধন্য হয়ে ওঠেন। এ আমলেই তিনি সরকারি কাজের বড় বড় টেন্ডার বাগিয়ে নিতে শুরু করেন। বলা চলে আব্দুল মান্নান খানের আশীর্বাদেই টেন্ডারমোঘলে পরিণত হন শামীম। পরবর্তীকালে গণপূর্তের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ঘুষের মাধ্যমে কিনে শামীম মন্ত্রণালয়ে তার প্রভাব বজায় রাখেন।

জানা গেছে, রাজনৈতিক পদ-পদবিধারী নেতা ছাড়াও ৫-৬ জন মন্ত্রীর সঙ্গে তার লেনদেন ছিল। প্রতিমাসে এ সব নেতাকে তিনি ২৫ কোটি টাকা মাসোহারা দিতেন।

এ ছাড়া টেন্ডার হলেই জি কে শামীমের কাছ থেকে যুবলীগের কমিশন হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকার ভাগ পেতেন যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট। জানা গেছে, অনুসন্ধানে এমন তিনজন প্রধান প্রকৌশলীর নাম উঠে এসেছে যারা শামীমের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন অন্তত দুই হাজার কোটি টাকা। তারা হলেন- প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, আবদুল হাই ও হাফিজুর রহমান মুন্সী।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

এই বিভাগের জনপ্রিয়

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT