রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০, ১২ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

০৮:৫৯ অপরাহ্ণ

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর

কী আছে মোদির মনে

প্রকাশিত : ১১:৪৫ AM, ৫ অক্টোবর ২০১৯ Saturday ১০০ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লি সফরে আসেন। গতকাল তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ইন্ডিয়ান ইকোনমিক সামিটের সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান চায় বাংলাদেশ। আজ সকালে দিল্লির হায়দারাবাদ হাউসে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

দক্ষিণ এশীয় দুই নেতার এ বৈঠকে দুদেশের মধ্যে ১০-১২ চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিস্তা, এনআরসি, সীমান্ত হত্যা ও রোহিঙ্গা ইস্যু তোলা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এবারের সফরে এ সমস্যাগুলোর বাস্তবিক কোনো সমাধান না হওয়ার সম্ভাবনায় বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কূটনীতিকরা মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন উষ্ণ। বিশেষ করে গত ১০ বছরে দুই দেশের মধ্যে শতাধিক চুক্তি হয়েছে, যার ৬৮টিই হয়েছে গত তিন বছরে। এ সময়ে কয়েক দশকের স্থলসীমান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে, সমুদ্রসীমা নিয়েও বিরোধ কেটে গেছে দুই দেশের। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও গতিশীলতা বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের বহু আকাক্ষিত তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি বছরের পর বছর অমীমাংসিত পড়ে রয়েছে।

অনেকবার আশ্বাসের পরও সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা বন্ধ হয়নি। আসামের নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দিল্লির জোরালো ভূমিকা প্রত্যাশা করলেও এ নিয়ে দ্বৈতনীতি অব্যাহত রেখেছে ভারত। আজকের দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে অমীমাংসিত ও প্রত্যাশিত এসব সংকটের জট খুলবে কিনা তা নিয়ে আগ্রহ সবার। কূটনীতিকদের ভাষ্য, ছোট প্রতিবেশী হিসাবে বাংলাদেশ ভারতকে উজাড় করে দিলেও বড় প্রতিবেশী হিসেবে উদারতা কম ভারতের। বরং বছরের পর বছর এমন সব সংকট জিইয়ে রেখেছে যেটা বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আমেনা মহসীন বলেছেন, সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য যেকোনো দেশেই প্রধানমন্ত্রীর সফর ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকেও আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি। তবে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে বাংলাদেশের তিস্তা চুক্তিসহ যে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো আছে আমি মনে করি না যে তার কোনো কিছুর সমাধান হবে। তিস্তা চুক্তির ব্যাপার ভারতের স্পষ্ট একটা অবস্থান আছে। ওদের অভ্যান্তরীণ একটি রাজনীতি আছে। সেখানে যতদিন পর্যন্ত সেটা সমাধান না হয় ততদিন পর্যন্ত তিস্তা চুক্তি নিয়ে কিছু হবে বলে মনে হয় না। এখন ভারত বলছে তিস্তা চুক্তির নতুন ফরমুলার কথা। হয়তো প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সেটা নিয়ে আলাপ আলোচনা হতে পারে।

কূটনীতিক সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা নিয়ে আলাদাভাবে এখনই কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে ভারত-বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন তথা বেসিন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে দুদেশের মধ্যে একটি সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

এ প্রসঙ্গে ভারতের বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা দত্ত গণমাধ্যমে বলেন, ‘বাংলাদেশের একটা বহুদিনের দাবি ছিল ৫৪টা অভিন্ন নদী নিয়েই একটা সর্বাত্মক চুক্তি করা হোক। আমার ধারণা এবার সেই ব্যাপারে ভারত নীতিগতভাবে রাজি হয়ে যাবে।’

অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে সমঝোতা হলে আগামী দিনে হয়তো এই সমঝোতাই তিস্তা চুক্তির ভিত গড়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে এর ভিন্ন মতও আছে। অনেকে মনে করছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারগুলোর মধ্যে এ নিয়ে আগে সমঝোতা না হলে এ ধরনের সমঝোতা সফলতার মুখ দেখা সুদূরপরাহত। তিস্তার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ইন্টারেস্ট পাশ কাটানো সম্ভব নয়। তাই তিস্তার জট খোলার বিষয়ে আস্থা রাখা দায়।
শেষ কোথায় এনআরসির উদ্বেগ

ভারতের নাগরিক তালিকা এনআরসি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারত সফররত শেখ হাসিনাকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, জাতিসংঘ অধিবেশনে পার্শ্ববৈঠকে মোদির সঙ্গে কথা হয়েছে তার। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বাস দিয়েছেন যে এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়া কিছু নেই। এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

এর আগে, এনআরসি নিয়ে একই বক্তব্য ঢাকা সফরে গিয়ে বলেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির কথায় তিনি (বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী) আশ্বস্ত ও সন্তুষ্ট কি না? জানতে চাওয়া হলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অবশ্যই সন্তুষ্ট। প্রধানমন্ত্রী (মোদি) নিজে আশ্বাস দিয়েছেন। আমি কেন তা হলে অন্য কিছু ভাবব?’

মোদির এ আশ্বাসের পরও বাংলাদেশের গলার কাঁটার মতো খচখচ করছে নাগরিকত্ব সংশোধন বিল। ভারতের শাসক দল বিজেপি চাইছে, আসামসহ সারা দেশে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার আগে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ফেলতে। এই আইন সংশোধন হলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ‘অত্যাচারিত-বিতাড়িত’ সংখ্যালঘুদের ভারতের নাগরিকত্ব লাভ সহজতর হয়ে যাবে।

ভারতীয় বিশ্লেষকরাই বলছেন, এনআরসি নিয়ে ভারতের বরাভয় দান বাংলাদেশকে নিশ্চিন্ত করলেও বন্ধু এই প্রতিবেশী দেশের দুশ্চিন্তা বাড়ছে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ কলকাতায় বলেছেন, সারা দেশে এনআরসি চালু করা তো হবেই, তার আগে সংশোধন করা হবে নাগরিকত্ব আইন। সম্প্রতি একই কথা শুনিয়েছেন শাসক দলের ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবতও। নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো হিন্দুকে যাতে অনিশ্চয়তায় পড়তে না হয়, তারা যাতে নাগরিকত্ব পান, ভারত সরকার তা নিশ্চিত করবে। বিজেপির উদ্দেশ্য, এনআরসিতে নাম না-ওঠা অ-মুসলমান ‘বিদেশি’দের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া।

প্রস্তাবিত সংশোধনীর লক্ষ্য ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে যেসব হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন ও পার্সি ভারতে চলে এসেছেন, ছয় বছরের অপেক্ষা শেষে তারা সবাই ভারতের নাগরিক হতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সংকটে পড়বে মুসলিম জনগোষ্ঠী। যাদের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশি বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন বিজেপি ও আরএসের নীতি-নির্ধারকরা। অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে এসব নাগরিককে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে এমন বক্তব্যে মাঠ গরম করছেন কেউ কেউ।

একদিকে আশ্বস্ত করা অন্যদিকে হুমকি-এনআরসি নিয়ে এই দ্বৈত নীতির কারণেই বাড়ছে উদ্বেগ। এ সফরে প্রধানমন্ত্রী তাই গুরুত্বের সঙ্গেই এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে চান। কেননা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রভাব রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। কিন্তু এনআরসির ইস্যু ধরে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বদলে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এর ওপর যদি লাখ লাখ ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয় তাহলে সেটা বাংলাদেশের জন্য শুধু ভয়ানক বোঝাই হবে না। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাতেও ছেদ ঘটবে।

নাগরিকপঞ্জি আর নাগরিকত্ব সংশোধন বিল নিয়ে তাই বাংলাদেশের গভীর উদ্বেগ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আইন সংশোধিত হলে সেটা বাংলাদেশের কাছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর দৃর্বৃত্তদের আক্রমণ নেমে আসতে পারে। ভারতের বোঝা উচিত, তাদের এই পদক্ষেপ মৌলবাদী শক্তিদের উৎসাহিত করবে। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ সদা সচেষ্ট। বিদেশি বাছাইয়ের নামে কিছু মুসলমানকে যদি বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়, তার একটা প্রতিক্রিয়া দেশের অভ্যন্তরে পড়লেও পড়তে পারে। তেমন হলে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষা হয়ে দাঁড়াবে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং।

এ বিষয়ে ড. আমেনা মহসীন বলেছেন, ভারত বলছে এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু তারা আবার একই সঙ্গে অন্য কথাও বলছে। এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানটা শক্তভাবে তুলে ধরতে হবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে। রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে বাংলাদেশকে আরও জোরালো সমর্থন চাইতে হবে, যাতে ভারত মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে অস্বস্তি
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সূত্রের অন্যতম বিষয় সীমান্ত। বাংলাদেশের জন্য একটা বড় মাথাব্যথার কারণ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর প্রভাব ব্যাপক। সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে বারবার আলাপ হলেও তা ব্যর্থ হয়েছে। গত কয়েক মাসে এ হত্যাকাণ্ড বেড়েছেও। সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের অস্বস্তি বাড়ছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজকের শীর্ষ বৈঠকে সীমান্তে হত্যা, সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা, বাণিজ্য, নৌপরিবহন, বন্দর ব্যবস্থাপনা, বিবিআইএম (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালকে নিয়ে গঠিত উপআঞ্চলিক জোট), অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সংক্রান্ত কাঠোমো চুক্তি, রোহিঙ্গা, উন্নয়ন, জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। যুব ও ক্রীড়া, সমুদ্র গবেষণা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাসহ কয়েকটি বিষয়ে বিনিময় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হবে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনটি যৌথ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন দুই নেতা।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই বিভাগের জনপ্রিয়

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT