রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

০১:২৬ অপরাহ্ণ

শিরোনাম

কালের বিবর্তনে ম্রিয়মান আমাদের পুঁথি সাহিত্য

প্রকাশিত : ১২:৪১ AM, ২৪ জুন ২০২১ বৃহস্পতিবার ১১৭ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

কালের বিবর্তনে ম্রিয়মান আমাদের পুঁথি সাহিত্য
বারী সুমন
“হারিকেনের টিমটিমে আলোর সাথে আসমানে উঁকি দিতো আধফালী চাঁদ। বাঁশঝাড়ের পাতার ফাঁকে দিয়ে এক চিলতে আলোর ঝলকানি পুঁথি পাঠের আসরকে আরও মোহনীয় করে তুলতো”।
সংস্কৃত শব্দ ‘পুস্তিকা’ শব্দ থেকে পুথি শব্দটির উৎপত্তি। এর নাসিক্য উচ্চারণ পুঁথি। হাতে লেখা বইকে আগে ‘পুস্তিকা’ বলা হতো। যেহেতু আগের দিনে ছাপাখানা ছিল না, তাই তখন হাতে পুঁথি লেখা হতো। প্রাচীন বা মধ্যযুগের প্রায় সকল সাহিত্য হাতে লিখতে হয়েছিল এবং এদের একাধিক সংস্করণও তৈরি হয়েছিল হাতে লিখে। তাই প্রাচীন ও মধ্যযুগের সকল সাহিত্যকেই পুঁথিসাহিত্য বলা হয়।
পুথি সাহিত্য আরবি, উর্দু, ফারসি ও হিন্দি ভাষার মিশ্রণে রচিত এক বিশেষ শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য। আঠারো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত এর ব্যাপ্তিকাল। এ সাহিত্যের রচয়িতা এবং পাঠক উভয়ই ছিল মুসলমান সম্প্রদায়।
পুঁথি এক সময় মুখে মুখে রচিত হতো। লোক কাহিনীর মতোই পুঁথির জন্ম। পরবর্তীতে লিখে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হয়। পুঁথি সাধারণত কোন একটি কাহিনীকে কেন্দ্র করে রচিত। বাংলাদেশেও পুঁথি সাহিত্যের বেশ সুনাম রয়েছে। পুঁথি সাহিত্য পরবর্তীতে গ্রাম-বাংলায় পাঠ করতো গ্রামের কিছু পাঠকরা। তারা সুর করে পাঠ করতো পুঁথি। একটি পুঁথি পাঠ করে শেষ করতে লেগে যেতো অনেকদিন। কখনও কখনও মাসও পার হয়ে যেতো। নানা অঙ্গভঙ্গি আর হাস্য রসাত্মক কথার মধ্য দিয়ে পুঁথি পাঠ করতো। সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তি যিনি পুঁথি পাঠ জানতেন এবং এর কাহিনী সম্পর্কে অবগত তিনিই পাঠ করতেন। পুঁথি পাঠে পাঠকের সুর একটি মুখ্য বিষয় ছিলো। পুঁথির সুরটি অন্যান্য সুর থেকে একটু আলাদা। পুঁথির কিছু অংশ পাঠ করে এর সারসংক্ষেপ পাঠক, উপস্থিত দর্শকদের বুঝিয়ে দিতেন কথার মাধ্যমে।
পুঁথি পাঠ সাধারণত রাতের বেলা অনুষ্ঠিত হতো। সবাই খাওয়া দাওয়া শেষ করে অবসর সময়ে কোনো এক আঙিনায় জড়ো হতো। তারপর সেখানে উপস্থিত হতো পুঁথি পাঠক। অনেক পুঁথি সাহিত্য বাংলায় নামকরা ছিলো। গুলেব কাওলি, বাহরাম বাদশা, লাইলি মজনু, ইউসুফ জোলেখা সহ বহু পুঁথি সাহিত্য ছিলো। যা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। আগে থেকেই তারা ঠিক করে নিতো কোন পুঁথিটি পাঠ করবে। আগেই বলেছি একেকটি পুঁথি শেষ করতে মাসখানেক বা তার বেশি সময়ও লেগে যেতো। বাড়ির ছোট ছেলে-মেয়েরা থেকে শুরু করে, মুরুব্বিরা এবং মহিলারাও পুঁথি শুনতে আসতো। যে বাড়িতে পুঁথি পাঠ করা হতো শুধু সে বাড়ির নয়, এ শ্রোতা থাকতো আশে পাশের অনেক বাড়ির মানুষজন। সবাই নির্ধারিত সময়ে পুঁথি পাঠের আসরে চলে আসতো। হারিকেনের টিম টিমে আলোয়, জলচৌকিতে পুঁথি রেখে পাঠক আসন করে বসতো। চারদিকে সবাই নীরব। তারপর সুর করে পাঠ চলতে থাকতো। কয়েকলাইন পড়ে পাঠক থামতেন এবং এর মর্মার্থ উপস্থিত পাঠক বৃন্দকে বুঝিয়ে দিতেন। পুঁথি পাঠের কথা শুনে কখনও হেসে কুটি কুটি হয়েছেন দর্শক, কখনও বা চোখের কোণে জমেছে অশ্রু। পুঁথি পাঠের মাঝখানে থাকতো বিরতি। পাঠককে চা করে এনে দিতো। সাথে উপস্থিত দর্শকরাও চা পান করতো। সাথে একটু পান বা তামাকের ব্যবস্থা করা হতো। বিরতির পর আবারও শুরু হতো পুঁথি পাঠ। রস-রসাত্মক, হাসি-ব্যঞ্জনায় ভরে থাকতো পুঁথি পাঠের পুরো সময়টি। রাত যত গভীর হতে থাকতো পুঁথি পাঠ ততোই জমে উঠতো। ছোট বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়তো মায়ের কোলে। বসার তেমন ব্যবস্থা না থাকলেও চাটাই বিছানো থাকতো, কখনও আরেকটু আরাম প্রিয় করার জন্য খড় বিছিয়ে নেওয়া হতো। পাঠক নানান কথা দিয়ে বর্ণনা করে পুঁথি পাঠের পুরো সময়টিকে মাতিয়ে রাখতেন। গ্রাম-বাংলার প্রতিদিনের অঘোষিত একটি সময় থাকতো এই পুঁথি পাঠের জন্য। সে সময়ে সবাই পুঁথি পাঠের আসরে চলে আসতো। এটা প্রতিবেশীদের সাথে একটি সম্পর্কের সেতু বন্ধনও বলা যেতে পারে। এ বাড়ির ও বাড়ির মানুষের খোঁজ খবর নেওয়ারও একটা মাধ্যম ছিলো পুঁথি পাঠের আসর। কে আসলো কে আসলোনা, কেন আসেনি, কেউ অসুস্থ কিনা এমন খোঁজ-খবরের মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হতো। এখানে কত অজানা কাহিনী উন্মোচিত হতো তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা তখন এ পুঁথি পাঠ শুনতে আসতো। পুরোপুরি মর্মার্থ না বুঝতে পারলেও আনন্দ পেতো এবং এ সময়টা তারা অন্যকোন কাজে অপব্যয় না করে বিনোদনের মধ্য দিয়ে কাটাতো। পুঁথি পাঠ তখনকার দিনের একটি বিনোদনেরও মাধ্যম ছিলো। বাড়িতে কোন মেহমান এলে বা বিশেষ কোন অনুষ্ঠান থাকলে সেদিনের আসরটা আরও বেশি জমজমাট হতো। বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে পুঁথি পাঠের অনুষ্ঠানে মজাদার খাবারেরও আয়োজন থাকতো। হারিকেনের টিমটিমে আলোর সাথে আসমানে উঁকি দিতো আধফালী চাঁদ। বাঁশঝাড়ের পাতার ফাঁকে দিয়ে এক চিলতে আলোর ঝলকানি পুঁথি পাঠের আসরকে আরও মোহনীয় করে তুলতো।  এমনি কতো হাসি কান্নার ভেতর দিয়ে যে একটি পুঁথি শেষ হতো তা বলা কঠিন। এই পুঁথি পাঠের আসরে এসে একেকটি পরিবারের সাথে গড়ে উঠতো দৃঢ় সম্পর্ক।
সময়ের বিবর্তনে আজ অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্যই আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকে  জানেইনা পুঁথি কি জিনিস, তা কিভাবে পাঠ করা হতো। বর্তমান সময় প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির ভালো ও খারাপ দুটো দিকই আছে। তখনকার সময়ের ছেলে-মেয়েরা পুঁথি পাঠ বা গ্রামীণ কিচ্ছগান দেখে বিনোদন পেতো। আর বর্তমানে অনলাইন ভিত্তিক বহু বিনোদন মাধ্যম রয়েছে। তবে সেকালের পুঁথি পাঠ আর বর্তমানের প্রযুক্তির বিনোদনে রয়েছে বিস্তর তফাৎ। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে পুঁথি পাঠ সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। তা না হলে একসময় তারা জানবেইনা বাংলা পুঁথি সাহিত্যেরও একটা স্বর্ণযুগ ছিলো। যারা সাহিত্য প্রেমী, লোক সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেন, গবেষণাধর্মী কাজ করেন, পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সকল সংগঠন ও ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে পুঁথি সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে নতুন প্রজন্মের জন্য।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT