রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

সোমবার ২৫ মে ২০২০, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

০৭:১৪ অপরাহ্ণ

কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি গণমাধ্যম

প্রকাশিত : ০৪:২৪ AM, ১৫ মার্চ ২০২০ Sunday ৭৫ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

পীর হাবিবুর রহমান

সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন আজ এগারোতে, বিশেষ আয়োজনে লেখা। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার লড়াইয়ে গণমাধ্যম আজ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নির্লজ্জ দলবাজিতে ডুবেছি সবাই। একজন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, জহুর চৌধুরী, সিরাজুদ্দিন হোসেন গণমাধ্যম জন্ম দেয়নি। বার্তাকক্ষে গোলাম সারওয়ার দূরে থাক আহমেদ ফারুক হাসানও ওঠে আসেননি। সারাদেশে জন্ম নেয়নি একজন মোনাজাত উদ্দিন। তবু….অনেক কাগজের চেহারা মানুষ দেখে না তাদের সম্পাদকের মুখ সবখানে সবপথে বিচরণ করে! অনেক কাগজের অস্তিত্ব বিলীন হলেও তার কর্ণধারদের সার্কুলেশন বেশি বলে ব্যঙ্গ করা হয়। তবু তারা সেটি গায়ে মাখেন না। বিনিয়োগকারীদেরও বিচার করার সময় এসেছে নিয়োগে গুণবিচারী না হলে বিনিয়োগে সাফল্য আসে না। যে প্রতিষ্ঠানে সাফল্য আসে না সে প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র, সমাজ, দেশ ও মানুষের কল্যাণে সমাজের আয়না হওয়া দূরে থাক কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।

সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে ফোর্থ স্টেট বলা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র বা সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ হচ্ছে সংবাদপত্র। একুশ শতকের শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ওপর দাঁড়ানো গণমাধ্যম আদৌ কি ফোর্থ স্টেট সেই প্রশ্ন শক্তিশালীভাবে উঠে এসেছে। আমরা সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম অর্থাৎ প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা অনলাইন ভিত্তিক নিউজ পোর্টালকে সমাজের আয়না বলে আসছি। সমাজের চিত্র কতটা নির্মোহ ও স্বচ্ছভাবে আয়নায় উঠে আসছে সেই প্রশ্ন থাকলেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে গণমাধ্যম চ্যালেঞ্জ নিয়েই নানান প্রতিকূলতার মধ্যে সেই কাজ করে যাচ্ছে। সমাজের চিত্র তুলে আনার লড়াইয়ে নিরন্তর সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সংবাদ এলেও গুজব ছড়ায় তার চেয়ে বেশি। আতঙ্ক ছড়াতেও কম নয়। বলা হয়, ঘোড়ার আগে দুঃসংবাদ ও গুজব ছুটে দ্রুতগতিতে। কিন্তু গণমাধ্যমে উঠে আসে সত্য। যে সত্য মানুষ বিশ্বাস করে। তাই গণমাধ্যমের সততা দায়িত্বশীলতা এবং জবাবদিহিতার জায়গা সর্বোচ্চ। সত্য হচ্ছে মানুষের সম্পদ। মানুষের জন্য লুকানো বা গোপন সেই সত্য উন্মোচন গণমাধ্যমের কাজ।

১৭৮৭ সালে ব্রিটেনের হাউস অব কমন্সে সংসদীয় বিতর্কে এডমুন্ড ব্রুক প্রথমে ফোর্থ স্টেট শব্দটির ব্যবহার করেছিলেন। তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজের তিনটি প্রধান স্তম্ভ ছিল অভিজাত শ্রেণি (ফার্স্ট স্টেট), ধর্মযাজক শ্রেণি (সেকেন্ড স্টেট) ও সাধারণ মানুষ (থার্ড স্টেট)। টমাস কার্লাইল তার ‘বুক অন হিরোস অ্যান্ড হিরো ওরশিপ’ বইয়ে লিখেছেন- ব্রুক সেদিন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, ‘এই সংসদে আজ তিনটি স্তম্ভের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। কিন্তু ওই যে গ্যালারিতে বসে আছেন সাংবাদিকরা, তারা এই সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ। তারা কিন্তু এদের সবার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ।’

সেই থেকে গণমাধ্যম বা সাংবাদিকদের ফোর্থ স্টেট বলার প্রচলন শুরু হয়েছে। এ কথাটি আপেক্ষিক ও তাত্ত্বিক হলেও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নৈতিক ভিত্তির ওপর শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছিল। সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবিস্মরণীয় বিজয়ের পর গণমাধ্যমের জন্য ফোর্থ স্টেট তকমাটি অসার ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। কারণ পশ্চিমা দুনিয়ার গণমাধ্যমই নয়, তাবৎ পৃথিবীর গণমাধ্যমের রিপোর্ট, মন্তব্য এমনকি জরিপ মিথ্যা প্রমাণ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হয়ে আসেন। গণমাধ্যম ট্রাম্পকে অযোগ্য, নোংরা মানসিকতার, ট্যাক্স ফাঁকিবাজ, জালিয়াত, অর্থদুর্বৃত্ত, নারীবিদ্বেষী, বর্ণবাদী, বিকৃত যৌনাচারী, এমন কোনো নেতিবাচক আক্রমণ নেই, যা করেনি। কিন্তু তবু ভোটাররা ট্রাম্পকেই পছন্দ করে বিজয়ী করেছেন। এতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফোর্থ স্টেটের জায়গায় গণমাধ্যম পরাস্ত হয়েছে। প্রমাণ হয়েছে, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে গণমাধ্যম ব্যবহৃত হওয়ায় এডমন্ড ব্রুক যে ফোর্থ স্টেটের কথা বলেছিলেন, সেই জায়গা থেকে গণমাধ্যম সরে গিয়েছে। মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও মতামতকে ধারণে ব্যর্থ হয়েছে। জনমত গঠনেও পরাজিত হয়েছে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করে কিছু প্রচার মাধ্যম তার পেছনে ভারতীয় ইন্ধন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা বলে উল্লেখ করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে কিছু দৈনিক কোমর বেঁধে বিরূপ প্রচারণা চালালেও বিপরীতধর্মী ছিল দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ। ১৯৫৪ সালে নুরুল আমীনের মালিকানা থেকে আহমেদুল কবীর কিনে সংবাদকে বিরোধীদলীয় ধারার সঙ্গে যুক্ত করেন। অন্যদিকে সাপ্তাহিক হিসেবে ইত্তেফাক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দৈনিকে রূপান্তরিত হয়েছিল। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি যুক্তিনির্ভর সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করে পূর্ব বাংলার জনগণের অনুভূতিতে নাড়া দিয়ে স্বাধিকার আন্দোলনকে গতিশীল করেছিল এ দুটি দৈনিক পত্রিকা। পাশাপাশি দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক জনপদ এবং আবিদুর রহমানের ইংরেজি দৈনিক পিপলসের ভূমিকাও বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য সহায়ক শক্তিতুল্য ছিল।

১৯৭১-এর ২৫ মার্চের গণহত্যার কালো রাতে দি পিপলস পত্রিকা অফিস হানাদার বাহিনী কর্তৃক পুড়িয়ে ফেলা এবং দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদ অফিসে সেল নিক্ষেপের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়ার পর অন্য সব পত্রিকা পাকিস্তানি শাসক মহলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য হয়। তন্মধ্যে চরিত্রানুসারে দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক পয়গাম এবং ডেইলি পাকিস্তান অবজারভার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী প্রচারণায় এগিয়ে ছিল।

ইত্তেফাক ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া স্বাধিকার স্বাধীনতার পথে বঙ্গবন্ধুর সব আন্দোলন-সংগ্রামে সাহসী ভূমিকা রাখেন। মানিক মিয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার পরিকল্পনার একজন সহযোগী ও জনমত গঠনের শক্তি। ইত্তেফাক হয়েছিল বঙ্গবন্ধু ও তার দলের মুখপত্র এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের বড় শক্তি। আইয়ুব খান তাকে তিন দফা জেল খাটায়। কারা নির্যাতন সয়ে একসময় ’৬৯ সালে মানিক মিয়া হৃদরোগে মারা যান। আবিদুর রহমান ’৭১ সালেই তাদের রোষানলে পড়েননি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনিরা তাকে আটক করে নির্যাতন করে জেলে দেয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ঢাকা থেকে ১০টি দৈনিক প্রকাশিত হয়। তন্মধ্যে দৈনিক পাকিস্তান নাম পরিবর্তন করে হয় দৈনিক বাংলা এবং পাকিস্তান অবজারভার হয়ে যায় বাংলাদেশ অবজারভার। রাজনৈতিক সাংবাদিকতার ছদ্মাবরণে দৈনিক গণকণ্ঠ ও সাপ্তাহিক হক কথার ভূমিকা ছিল বিতর্কিত।

স্বাধীন দেশে উগ্র একদল রাজনৈতিক শক্তি ও গণমাধ্যম যেমন, গণকণ্ঠ ও সাপ্তাহিক হক কথা সেদিন সর্বনাশা খেলাই খেলেছে। এরা স্বাধীন বাংলাদেশে উদার গণতন্ত্রী মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে চরম সরকার ও মুজিব বিদ্বেষী উগ্র হঠকারী পথ নিয়ে মিথ্যা, অসত্য গুজবে ভাসাতে কার্পণ্য করেনি, তেমনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার-পরিজনসহ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সেই রক্তাক্ত ঘটনা তুলে ধরতে গণমাধ্যম নির্লজ্জভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সামরিক শাসন কবলিত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর যে অবর্ণনীয় নির্যাতন নেমে এসেছিল সেই চিত্র জনসম্মুখে তুলে ধরতে যেমন পারেনি, তেমনি কাপুরোষিত সুবিদাবাদী নীতি গ্রহণে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দৈনিকগুলোর ব্যর্থতার মুখে সাপ্তাহিকগুলো সেদিন পাঠকপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হয়।

আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী রাজনৈতিক ও ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল বিক্ষোভকালে মেধাবী তারুণ্যনির্ভর সাহসী সংবাদকর্মীদের হাত ধরে গণমাধ্যম গণতন্ত্রের আলোর পথে ঘুরে দাঁড়ায়। গণমানুষের আকাক্সক্ষাকে লালন করে ঝড়-ঝাপটা, দমন-পীড়নের মুখেও অকুতোভয় সাহস এবং ঔদ্ধত্য দেখাতে পিছপা হয়নি। বিবিসিখ্যাত আতাউস সামাদ, যায়যায়দিনের শফিক রেহমান, মতিউর রহমান চৌধুরী, অকাল প্রয়াত মিনার মাহমুদের মতো অসংখ্য সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হন, গণমাধ্যম ও সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। কিন্তু গণমাধ্যম কর্মীরা গণতন্ত্রের পথ থেকে গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার ধারা থেকে সরে দাঁড়াননি। নব্বইয়ের গণতন্ত্রের বিজয়ের পর তত্ত্বাবধায়ক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ সংবাদপত্র বন্ধে কালো আইনটি যেমন বাতিল করে দেন, তেমনি গণতন্ত্রের নবযাত্রায় সংবাদপত্র প্রকাশের দুয়ার উদারভাবে খুলে দেওয়া হয়। আর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে এদেশে ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা বেসরকারি টিভি চ্যানেলের জগৎ অবারিত হয়।

বাংলাদেশে একুশ শতকের গণমাধ্যম এখন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং শক্তিশালী। শিল্পপতিরা গণমাধ্যমে বিনিয়োগে এগিয়ে আসায় এটি শিল্পের মর্যাদা লাভ করেছে। গণমাধ্যম কর্মীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। ওয়েজবোর্ড অনুসরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান তাঁর মেধা, সৃজনশীলতা, সাহস, স্বপ্ন ও আগ্রাসী বিনিয়োগের সমন্বয়ে আজকে গড়ে তুলেছেন দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ মিডিয়া গ্রুপ ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া। যেখান থেকে দেশের সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন স্বল্পমূল্যে সব শ্রেণি-পেশার পাঠকের জন্য তুলে দিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রতিদিন ছাড়াও এখান থেকে মোটা কলেবরের আরেকটি বাংলা দৈনিক কালের কণ্ঠ প্রকাশিত হয়ে আসছে। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সান ছাড়াও সংবাদনির্ভর টেলিভিশন নিউজ টোয়েন্টিফোর দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। ক্যাপিটাল নামের বেতারটি শ্রোতাদের হৃদয় জয় করেছে। বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর অনলাইন পোর্টালটি পাঠক মন জয় করেছে। তিতাস নামের আরেকটি খেলার খবরভিত্তিক টেলিভিশন মাইলফলক গড়তে যাচ্ছে। তথ্যমন্ত্রী কর্তৃক জাতীয় সংসদে বারবার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিদিনের নাম আসাটাই বড় সার্থকতা নয়। এককালে দৈনিক ইত্তেফাক যেমন অফিসে বাড়িতে, পথে-ঘাটে, স্যালুনে, মুদি দোকানে শোভা পেত, সেখানে আজ বাংলাদেশ প্রতিদিন আরও দাপুটে চেহারায় নিজের শোভাবর্ধন করে টিকে আছে। সুমহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনা ও গভীর দেশপ্রেম প্রশ্নে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া তার নীতিতে অবিচল। আর এ নীতি থেকে বাংলাদেশ প্রতিদিন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনা নিয়ে সব খবর সবার আগে এবং সব মত-পথ ধারণ করার মধ্য দিয়েই পাঠক নন্দিত হয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান, তাঁর সব শিল্প গোষ্ঠীর কর্মীর মতো গণমাধ্যম কর্মীদেরও বিশাল আশ্রয়স্থল। যা চিন্তাই করা যায় না।

দীর্ঘদিনের পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতায় আজকের বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চেহারার দিকে তাকালে বলতেই হয়, নেতিবাচক খবরের পাশাপাশি ইতিবাচক খবর গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে উঠে এলেও মিডিয়ার সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষা লালন এবং পাঠক ও দর্শক শ্রোতার রুচিবোধের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেকে নবায়নের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে টিকে থাকার লড়াই, এগিয়ে যাওয়ার যুদ্ধ ও সাফল্যকে হাতের মুঠোয় পুরতে হয়। শক্তিশালী টিমওয়ার্ক মেধা, সৃজনশীলতা ও আইডিয়ার কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দলীয়করণে নিমজ্জিত অনেক গণমাধ্যমের মোড়লরা চারদিকে দৌড়ঝাঁপ ছোটাছুটি করে নিজেদের মতলববাজিতে সফল হলেও তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সংবাদকর্মীরা মাসের পর মাস, অনেকে বছরের পর বছর বেতন পাচ্ছেন না। রুগ্ন প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপদ জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করতে পারে না, তেমনি সমাজেও কোনো ভূমিকা রাখার শক্তি রাখে না। সংসদে দাঁড়িয়ে তথ্যমন্ত্রী প্রিন্ট মিডিয়ার যে প্রচার সংখ্যা ঘোষণা করেন, সেখানে হাতেগোনা কিছু দৈনিক ছাড়া বাকিগুলোর কোনো নাম-নিশানা কোথাও দেখা যায় না। সরকারি বিজ্ঞাপন আদায়ের জন্য এই কৃত্রিম প্রচার সংখ্যা তৈরি হয়। অনেক কাগজের চেহারা মানুষ দেখে না তাদের সম্পাদকের মুখ সবখানে সবপথে বিচরণ করে! অনেক কাগজের অস্তিত্ব বিলীন হলেও তার কর্ণধারদের সার্কুলেশন বেশি বলে ব্যঙ্গ করা হয়। তবু তারা সেটি গায়ে মাখেন না। বিনিয়োগকারীদেরও বিচার করার সময় এসেছে নিয়োগে গুণবিচারী না হলে বিনিয়োগে সাফল্য আসে না। যে প্রতিষ্ঠানে সাফল্য আসে না সে প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র, সমাজ, দেশ ও মানুষের কল্যাণে সমাজের আয়না হওয়া দূরে থাক কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। গণমাধ্যম কর্মীদেরও আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির সময় দরজায় কড়া নাড়ছে। গণমাধ্যম কর্মীদের মানুষের সমালোচনার মুখোমুখি কেন দাঁড় করিয়েছে? এর উত্তর নিজেদেরই খুঁজতে হবে।

পৃথিবীজুড়ে গণমাধ্যম বা সংবাদকর্মীরা অনেক সময় বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে কোনো দলের দিক ঝুঁকেন সত্য। কিন্তু বাংলাদেশের মতো অন্ধ দলীয় কর্মীর মতো দলবাজিতে ডুবে যেতে গণমাধ্যমের শীর্ষ থেকে মাঠকর্মীদের আর কোনো দেশে দেখা যায় না। এমন নির্লজ্জ দলবাজি, সিন্ডিকেট সাংবাদিকতা ও মানুষের চাওয়া-পাওয়া আবেগ-অনুভূতিকে ধারণ করতে না পারা এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন না করা মিলিয়ে গণমাধ্যমে ঝুঁকিতে ফেলছেন।

এমনিতেই পৃথিবীর তাবৎ শাসক এখন গণমাধ্যমের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানই নেননি, পশ্চিমা দুনিয়াও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার লড়াইয়ে গণমাধ্যম এখন কঠিন সময়ের মুখোমুখি। গণমাধ্যমে মেধাবী, পরিশ্রমী, দক্ষ সংবাদকর্মীদের আকাল চলছে। একেকটি গণমাধ্যমে একটি অংশ অধিক পরিশ্রম করছেন, আরেকটি অংশ নেহায়েত চাকরির জীবনযাপন করছেন। গণমাধ্যম আর যাই হোক চাকরির জায়গা নয়।

বার্তাকক্ষ গণমাধ্যমের শক্তিশালী আঁতুড়ঘর। রিপোর্টাররা তার হৃৎপিন্ড। কলামে একালে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সিরাজউদ্দিন হোসেন, জহুর চৌধুরীদের উত্তরাধিকারিত্ব নিয়ে কেউ উঠে আসছেন না। বার্তা কক্ষে গোলাম সারওয়ার দূরে থাক, আহমেদ ফারুক হাসানও নেই। মোনাজাত উদ্দিনের জায়গায় সারা দেশে একটি নাম গত তিন দশকে উঠে আসেনি। এটি মরুকরণের আলামত মাত্র। অথচ সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির যেমন প্রসার ঘটেছে, তেমনি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ও ঘটেছে।

আমরা একটি প্রাতিষ্ঠানিক, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্য মুক্তিযুদ্ধই করিনি, বারবার সংগ্রামে রক্ত ঝরিয়েছি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখনো অদৃশ্য রয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও স্বাধীন গণমাধ্যম একে অন্যের পরিপূরক। গণমাধ্যমে যখন-তখন যেখান সেখান থেকে হস্তক্ষেপ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি স্বাধীন সাংবাদিকতায় কালাকানুন প্রতিকূল নয়। তার পরেও গণমাধ্যম জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম, ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ারবাজার লুট, নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, যৌননিপীড়ন, শিশু নির্যাতন, পাপাচার, ব্যভিচার, জুলুম নির্যাতন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে চিত্র তুলে ধরছে। এতে প্রতিনিয়ত কত হামলা নির্যাতন সইতে হচ্ছে। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসন ও সুশাসন ছাড়া গণমাধ্যমের চতুর্থ স্তম্ভ হওয়া দূরে থাক টিকে থাকার লড়াইই কঠিন। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT