রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

রবিবার ২৪ অক্টোবর ২০২১, ৯ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

০৫:৪২ পূর্বাহ্ণ

এই পিচ্চি এদিকে আয়

প্রকাশিত : ০৯:১৬ AM, ৩১ জুলাই ২০২১ শনিবার ১৭৯ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

সহস্র সুমন:

ডালপুরি খাইতে সুপ্রিয় হক খুব পছন্দ করিত। পাড়ার মোড়ে মকলেসের দোকানটায় প্রত্যহ সকাল দশটা হইতে এগারোটা আর বিকাল চারটা হইতে পাঁচটা পর্যন্ত ডালপুরি বানাইতো। বছর দশেক আগের কথা; দুই টাকা করিয়া লইতো। পুরিগুলো বেশ ফোলা ফোলা আর বড় ছিল । কিন্তু দিন যত যাইতে লাগিলো পুরির দাম এক টাকা করিয়া বাড়িয়া যায় আর আকারে সংকুচিত হয়। এলাকার পুরিপ্রেমিরা বলাবলি করিতে লাগিলো মকলেস নাকি কোথাও আরেকটা বিবাহ করিয়াছে তাই সেই সংসার চালাইতে এখন অধিক পয়সা লাগিতেছে। শাড়ির যেহেতু হাত বাড়িয়াছে তাই পুরির ডাল আর আটা কমিয়াছে। “দোকানির বউয়ের শাড়ির হাত বাড়িলে ‍পুরির আকার কমিয়া যায়, পুরির আকার বাড়িলে দোকানির বউয়ের শাড়ির আকার কমিয়া যায়।”- বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এল রবিন্সের সেই অপ্রতুলতার তত্ত্ব আর এডম স্মিথের সম্পদ ও চাহিদার মাঝে সমন্বয় করিবার গবেষণা সুপ্রিয় হক জীবনে অনেকটা পথ পারি দিয়া শিখিলেও মকলেসারের বউ ও ডালপুরি তত্ত্ব কিন্তু অনেক পূর্বেই তাহাকে সেটি শিখাইয়াছে। তখন মকলেস আসলেও আরো বিবাহ করিয়াছিল কিনা জানা যায় নাই। একদিন বৈকালে দুটো দুই টাকার ময়লা নোট লইয়া সুপ্রিয় হক বাড়ি হইতে বাহির হয়। এর আগে বাবা একদিন দুই টাকা দিয়াছিল, আজ আরো দুই টাকা চাহিয়া লইয়া লইলো। এই মিলিয়া চার টাকা, অর্থাৎ দুটো পুরি। মকলেসের দোকানে গিয়া মকলেসকে দেখা গেলো না, কিন্তু গরম উনুনে হোটেলের কর্মী মন দিয়া পুরি ভাজিতেছে। গরম তেলে স্যান স্যান করিয়া লাফাইতেছে পুরিগেুলো, যেন অন্যের পেটে যাইবার আনন্দে নাচিতেছে। সুপ্রিয় খানিক তাকাইয়া দেখিলো। তারপর ভেতরে পাতা চেয়ার ও টেবিলগুলোর দিকে অগ্রসর হইয়া দেখিল ভেতরে তেমন কেহই নাই, একটা সাত আট বছরের বালক ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে। সুপ্রিয় হক একটা টেবিল বাছিয়া বসিয়া পড়িল। বসিতে বসিতেই মকলেসের ছেলে রায়হান দুটা ডালপুরি, একটু পেয়াজ, আর তেতুলের টক নিয়া আসিলো। মানে কথা হইলো, সুপ্রিয় এ দোকানে ঢুকিলে কেহই জানিতে চাহিবে না যে সে কি খাইবে। সবাই জানে এই হোটেলে গত দুই বৎসরে সুপ্রিয় পুরি ব্যতীত অন্য কিছু খায় নাই এবং সে পুরি হইলো প্রত্যহ দুটো করিয়া। আর তেতুলের টক না থাকিলে সুপ্রিয় রাগান্বিত হয় এটাও সকলে জানে। তাই রায়হান বা অন্য যে কোন কর্মী দেরি করে না। আসা মাত্রই আপ্যায়ণ। সুপ্রিয় পুরির সুবাস লইতে লইতে বলিল, “কিরে রায়হান তোর আব্বা কই? ”

আব্বা বাড়িত্, ঘুমায়।

রায়হানকে খুব প্রশ্ন করিতে ইচ্ছে করে, “তোর আব্বা নাকি আরেকটা বিয়ে করেছে রে?”

কিন্তু সাহস হয় না। পাগল ধরণের আছে। ধুম করিয়া মারিয়া দিলে মুসকিল। রায়হান পুরিটুরি দিয়াতো গেলো, কোথায় যে গেলো আর সন্ধান পাওয়া গেলো না। এখন পানি দিবে কে? পুরি যে ভাজিতেছে সে যদি দেখে এখানে একজন পানির অভাবে দাফাইতেছে তবু সে পানি লইয়া আসিবে কিনা বলা যায় না। এই ধরনের কাজে একটা পদসোপান আছে এটা আমরা অনেকেই অবগত না। আমরা ভাবি ওগুলো নিচু কাজ। কিন্তু তাহাদেরও ভাবসাব ও চমৎকার বসিজম রহিয়াছে জানিয়া লন। যেমন গাড়ির ড্রাইভার ড্রাইভিং সিটে বসিয়া দাতের নিচে লুকাইয়া থাকা গুপ্তধন সন্ধান করিবে ঘন্টার পর ঘন্টা কিন্তু আপনার ব্যাগ ধরিয়া সাহায্য করিবে না, ওটা হেল্পারের কাজ। হেল্পার আসিলে তাহাকে কোথায় কোথায় লাথি মারিয়া অন্ডকোষ ফাটাইবে সেগুলো হাক ছাড়িয়া বলিবে। তেমনই হোটেলে যাহারা রান্না করিয়া থাকে তাহারাও বিশেষ সম্মানের । তাহারা চুলো রাখিয়া পানির গ্লাস লইয়া যাইবে না। সুপ্রিয় হক সেটা টুকটাক জানে, তাই সে কাউকে উদ্দেশ্য না করিয়া বলিল, ‘’পানি দেয়ার কেউ আছে নাকিরে ভাই?’’

পুরি ভাজিকারক কর্ণপাত করিলেন না । এদিকে সুপ্রিয় হক বড় সাইজের একখানা পুরি গলধকরণ করিয়াছে এবং একটা মরিচে কামড় দিয়াছে। সুপ্রিয় আবার বলিল, পানি দেয়ার কেউ নাই নাকি? পানিই তো আগে দেয়া লাগে।

এবার গরম তেলে হাতা নাড়িতে নাড়িতে লোকটা চিৎকার দিল ‘‘এই পিচ্চি, এদিকে আয়, পানি চায় দেহস ? কি এতো ঘর ঝার দেস বারবার!’’

সুপ্রিয় বুঝিলো ঝাড়ুদার বালকটিকে বলা হইয়াছে। সুপ্রিয় দেখিল পিচ্চিটি একটা ঝাড়ুহাতে তাহার দিকেই আসিতেছে। আসিল নিকটে, বলিল, ‘‘আপনার পা দুটা তুললে খুব ভালো হয়, পরিস্কার করব।’’ এই বলিয়া বালক পাশের টেবিল হইতে একখানা জগ যোগার করিলো। সুপ্রিয় পানি খাইবে কী খাইবে না সে প্রশ্ন আর থাকিলো না। প্রশ্ন হইলো, এ বালক বলিলো কী! ‘‘আপনার পা দুটো তুললে খুব ভালো হয়, আমি পরিষ্কার করব।’’ এদের তো এমন প্রকাশভঙ্গি হওয়ার কথা নয়। ইহারা বলিবে, পা তোলেন, ঝাইর দেবো।’ অথবা, ‘পাডা তোলেন।’ নাহ! বিশ্বাস হইতে চায় না। সুপ্রিয়ের পুরি খাওয়ার আনন্দ আজ এ বালকের জন্য রহস্যে ভরিয়া গেলো। সুপ্রিয় বলিল, ‘‘এই তোমার নাম কি?’’

ছেলেটাকে তুই বলিবার সাহস হয় নাই সুপ্রিয়র। বালক বলিল, রনি।

বাহ রনি। ‘‘তুমি কি পড়াশোনা করো?’’

‘‘হ্যাঁ করতাম। এখন করি না। পা দুটো কি একটু উঁচু করা যায়?’’

সুপ্রিয় পা দুটো উঁচু করিতে করিতে বলিল, অবশ্যই যায়। বাবা কি করে তোমার?

‘‘বাবা ভ্যান চালায়, মা মারা গেছে, বাবায় বিয়া করছে। রনি আর দেরি করল না।’’

সুপ্রিয়র মাথা থেকে রনি বের হইতে চায় না। ‘পা দুটো কি একটু সরানো যায়?’ সুপ্রিয়র বাবা-মা মাঝে মাঝে ওর ওপর রাগ করে বলিত, পড়াশানা ঠিকমত না করলে হোটেলে কাজে লাগিয়ে দেবো। সুপ্রিয়র চোখের সামনে নিজের চেহারা ভেসে ওঠে। সেও নিশ্চয়ই এভাবে সুন্দর করে কথা বলিত।

বহু বছর গত হইলো। সুপ্রিয় সরকারী চাকুরী করে। দেশে দেশে ঘোরে, মানুষের কাজ করে। কিন্তু রনিকে সে ভোলে নাই। হোটেলে-মোটেলে, বাসে-লঞ্চে, সব জায়গায় অনেক পিচ্চি দেখে সে কিন্তু অমন গোছালো রনি আর পাওয়া যায় না। কিন্তু সকলেরই আসলে অমন সুন্দর কথা বলার কথা। সকলেই ও বয়সে হোটেলে কাজ করার কথা নয়। সুপ্রিয়র ছেলে আছে। সেও বাড়িয়া উঠিতেছে। কথা বলিতে শিখিতেছে। ‘দাও’ আর ‘নাও’ এর মধ্যে একটু গুলাইয়া ফেলে, ফুলকে ফুস বলে, এরকম আরো অনেক কিছু। ছেলেকে লইয়া মাঝে মাঝে গ্রামে গঞ্জে ঘুরিয়া বেরাইতে ভালো লাগে। এইতো সেদিন একখানা আশ্রয়ন প্রকল্পে কতিপয় শিশুদের জন্য সরকারী সহায়তা নিয়া গিয়াছিল সে। ছেলেকেও সাথে লইলো। আশ্রয়ন গরু ছাগল আর ফুলে ফলে বেশ সমৃদ্ধ। ছেলে বেশ ছোটাছুটি করিল, এর ওর কোলে উঠিল। ফুল ফল ছিড়িয়া লইলো। কিন্তু একখানা ঘরের সামনে আসিয়া সুপ্রিয় দশ বছর পিছনে ফিরিয়া গেলো। একটা বালক, সাত বা আট বছর বয়স হইবে। ডালপুরি খাইতেছে। পাশে এই মাত্র পাওয়া সরকারী খাদ্যের একটা বিস্কুটের প্যাকেট। সুপ্রিয় ছেলেকে দেখাইলো। ঐ দেখো একটা ভাইয়া, সালাম দাও, হাই-হ্যালো দাও। ছেলে সালাম ও হাই-হ্যালো দুটোই যুগপত দিয়া দিল।

সুপ্রিয় প্রশ্ন করিলো, ‘কি খাও?’

বালক আনন্দের সাথেই উত্তর করিল, ডালপুরি। আর আপনি বিস্কুট দিছেন সেটা রাতে বই পড়তে পড়তে খাবো।

বই পড়তে পারো?

হ্যাঁ

কি বই?

আমি আমপাতা পড়ি, ছয়ের ঘরের নামতা পড়ি, টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল পড়ি।

বলো কি! এতো দূরে একটা আশ্রয়ন, রাস্তাঘাটও সুবিধার না, আর তুমি এসবও পড়ো।

হ্যাঁ, ইউটিউব দেখি।

আরে বাপরে। নাম কি তোমার? বাবা কি করে?

আমার নাম নয়ন। বাবা রঙ এর কাজ করে। আর মা এখানেই থাকে, মানুষের জমিতে আর ঘরে কাজ করে।

‘আমার নাম নয়ন’ এ কথাটার ইংরেজি কি বলতে পারবে?

হুম। ‘মাই নেম ইজ নয়ন।’ চট করে বলে দেয় নয়ন।

খুব ভালো। ভেরি গুড।

ছেলেটার সাথে কথা বলিবার সময় সুপ্রিয়র ছেলেটা একা একাই বকিয়া যাইতেছিল সেগুলোও বলি। সে বলিতেছিল, কি কাও, পুলি পুলি পুলি ই্ ই্ ই । আসসো। ‍

সুপ্রিয়র কথোপথন শেষ হওয়ার আগেই আশ্রয়নের সভাপতি সাহেব আসিলেন। ত্রাণ সঠিকভাবে বিতরণ হইয়াছে জানাইলেন। তারপর বারান্দায় বসা বালককে বলিল, কিরে পিচ্চি খুশি তো?

সুপ্রিয় খট করিয়া সভাপতি সাহেবকে থামাইলো। “ওর নাম নয়ন। নাম ধরে বলুন। পিচ্চি বলবেন না।”

সভাপতি সাহেব আর কোন কথা বলিলেন না। গাড়ি দাঁড়াইয়া ছিল, সুপ্রিয় গাড়িতে উঠিবার কালে আশ্রয়নের লোকেরা জানালার কাছে আসিয়া সালাম-বিদায় দেয়। সবাই যার যার সন্তানকে সুপ্রিয়র বাচ্চাটাকে নির্দেশ করিয়া বলিল, ‘‘দেখলে কি সুন্দর বাবু! ওর মতো হতে হবে, পরিষ্কার, সুন্দর কথা বার্তা।’’ সুপ্রিয় সবাইকে হাত নাড়িয়া বিদায় জানাইলো। সভাপতি সবচেয়ে নিকটে থাকায় বিদায় বেলায় সুপ্রিয়র মনে একটা কথা জাগিলো। সে সভাপতিকে বলিল, সভাপতি সাহেব কি শিক্ষিত?

জ্বি স্যার টেন পাশ করছিলাম ম্যালা আগে।

ও আচ্ছা। একটা বাংলা কথার ইংরেজি করতে পারবেন?

কি কথা স্যার?

‘আমার নাম নয়ন’ এই কথাটার?

সভাপতি সাহেব খানিক এ ,উ, অ্যা, উঁ করিলেন, তারপর বলিলেন ‘’স্যার ,আমার নামতো জয়নাল।”

ভালো থাকুন জয়নাল।

গাড়ি চলিতে শুরু করিলো। গাড়ি পিপ পিপ হর্ন দিচ্ছে, সুপ্রিয়র ছেলের মুখেও বাজিতেছে, পিপ পিপ ব্রুম ব্রুম। সুপ্রিয় ছেলের দিকে তাকাইলো । ছেলে দৌড়াইয়ার জানালার কাঁচে হাত দেয়। বাহিরে ধান ক্ষেতে কাজ করা লোকগুলোকে দেখাইয়া বলে ‘ বাইলে, বাইয়ে।’ বেশ খানিকটা আগাইয়া গিয়া সুপ্রিয় গাড়ি থামায়। বিকেলের আলো লুটাইয়া পড়িয়াছে প্রাকাণ্ড আকাশে, অনেক শিশু দৌড়াদৌড়ি করিতেছে তারই নিচে। ঘুড়ি উড়াইতেছে, খেলিতেছে। ছেলে সেদিকে দৌড়াইয়া যাইতে চায়। তাহাকে ছাড়িয়া দিয়া পিছনে চোখ মেলিয়া দাঁড়ায় সুপ্রিয়। মেঠো পথে ছোট ছোট পদক্ষেপে ধুলার কুয়াশা জমিয়া যাইতেছে। এই পথেই রনি ও নয়নেরা একদিন লিখিয়া চলিবে ইতিহাস, ঘটাইবে পরিবর্তন। সমীরণ ছুটিয়াছে ছেলের পিছু পিছু। সুপ্রিয় সে বাতাসের সাথে কথা বলিবার কালে আস্তে আস্তে বলিল ‘রনিদের মতো হওয়া চাই, নয়নদের মতো হওয়া চাই।’

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT