রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

বৃহস্পতিবার ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আরবের বুকে যুবক নবী (সা.) এর সামাজিক বিপ্লব

প্রকাশিত : 05:41 AM, 14 November 2019 Thursday ৪০ বার পঠিত

অনলাইন নিউজ ডেক্স :
alokitosakal

দুনিয়ার বুকে অনেক বিপ্লব হয়েছে। তবে অশিক্ষিত, ক্ষুধার্ত আরবদের দ্বারা বিশ্বের বুকে যে বিপ্লব হয়েছিল তা বিরল। এক শতকের ব্যবধানে ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও ভারতবর্ষসহ দূরপ্রাচ্যেও আরবদের এই বিপ্লবের হাওয়া লেগেছিল।

ঐতিহাসিকদের মতে ইউরোপে বিজয়ী বেশে কেউ আসতে পারেনি। ব্যতিক্রম শুধু আরবরা। বর্বর আফ্রিকাদেরকে নিজেদের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে তারা ইউরোপে এসেছিল বিজয়ী বেশে। স্পেনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে ইউরোপকে আলোকিত করেছে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্য দিয়ে। তারা আলোর মশাল নিয়ে এসেছিল ওই সময়, যখন ইউরোপ ছিল অন্ধকার।

সুবহে সাদিকের আগে পূর্ব দিগন্তের সাদা আভা প্রভাতের সংবাদ দিয়ে যায়। সকালের সূর্য অমানিশার ঘোর কেটে আলোকিত করে বিশ্বকে। নবুওয়াতের সূর্যও এর ব্যতিক্রম ছিল না। শৈশবে বৈচিত্রময় জীবনযাপনই বলে দিচ্ছিল যে, মুহাম্মাদের (সা.) দ্বারা আরবের জাহেলি সমাজে পরিবর্তন আসবে। সমাজ থেকে জুলুমতের অন্ধকার দূর হবে। মানবতা ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবে আরবের বর্বর জাতি।

শিশু বয়স থেকেই তার জীবনটা ছিল বৈচিত্রময়। জন্মের আগেই পিতার মৃত্যু। অল্প বয়সে মাকে হারিয়ে দাদার কাছে আশ্রয়। দাদার বিয়োগের পর চাচার তত্তাবধানে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ। যখন প্রাপ্ত বয়সে উপনীত হলেন, তার জীবন ছিল অন্যদের চেয়ে ভিন্ন। তিনি সমাজ সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। নিরাপত্তাহীনতা দূর করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন, ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক সামাজিক সংঘটন।

বিভিন্ন হাদিসে রাসূল (সা.) এর নবুওয়াত পূর্ব জীবনের কথা বিবৃত হয়েছে। সংক্ষিপ্ত শব্দে এসেছে বুখারী শরিফের বর্ণনায়। ওই বর্ণনায় বিবরণ শুরু হয়েছে এভাবে, ‘ওহি প্রাপ্তির পর রাসূল (সা.) হেরা গুহা থেকে এসে কাঁপছিলেন। ভয়ে জ্বর জ্বর ভাব। তাই খাদিজা (রা.)-কে বলেন, আমার গায়ে কম্বল দিয়ে দাও, আমার গায়ে কম্বল দিয়ে দাও! রাসূল (সা.) এর মনে নানা ভয়। নবুওয়াতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা নিয়ে চিন্তা। খাদিজা (রা.) সান্তনা দেয়ার জন্য তখন বলেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সাহায্য করবেন; এ ব্যাপারে বেইজ্জতি করবেন না। কারণ, আপনার চরিত্রের মাঝে এমন কিছু গুণের সমাহার ঘটেছে, এই গুণগুলোর ওসিলায় আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সফলতা দেবেন।’

ওই গুণগুলো কী ছিল, যার ওপর ভরসা করে রাসূল (সা.) এর সফলতার স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী? তারপর তিনি বলেন, ‘আল্লাহ শপথ! আল্লাহ আপনাকে লাঞ্চিত করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন, প্রতিবন্ধীদের দায়িত্ব নেন, বেকার লোকের কাজের বন্দোবস্ত করে দেন, মানুষের মেহমানদারি করেন ও সত্য অবলম্বনের কারণে বিপদগ্রস্থদের সাহায্য করেন।’ কোনো কোনো সূত্রে আরো একটি গুণের কথা এসেছে যে, ‘আপনি সত্য কথা বলেন’।

জাহেলি যুগেও তিনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলা ছিল রাসূল (সা.) এর অন্যতম একটি গুণ। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সফল করার বাহ্যিক কিছু উপকরণ দেন। এর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে বংশ। বংশীয় প্রভাবে মানুষ অনেক কিছু সহজে করে ফেলতে পারে। তাই নবীগণের জীবনী দেখলে আমরা পাই, প্রত্যেক নবীকে আল্লাহ তায়ালা প্রভাবশালী বংশে পাঠিয়েছেন। নবী করিম (সা.)-কে প্রেরণ করা হয়েছিল, আরবের সবচেয়ে প্রভাবশালী বংশে। তিনি তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেন। তাই ইসলাম প্রচারের আগে তাদের কাছে তিনি ‘আল আমিন’ বা বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। এ কারণে, তার ডাকে আরবের বুকে সংঘবদ্ধ একটি সংঘটনা দাঁড়িয়ে ছিল। সুসম্পর্কের কারণে বংশের অনেকে ইসলাম গ্রহণ না করলেও, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সহযোগিতা করে গেছেন। দুধ সম্পর্কীয় আত্মীয়দের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক ছিল। তাঁর দুধ মায়ের সঙ্গে সাক্ষাত হলে বসার জন্য নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে দিতেন। একজন মানুষ নিজের আত্মীয়দেরকে নিজের পক্ষে রাখতে পারলে শক্তির অনেক বড় যোগান সেখান থেকে আসে। আর রাসূল (সা.) সেই কাজটিই করেছিলেন সফলভাবে। ইসলামও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছে।

অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের দায়িত্ব নিতেন:
অসহায় ও প্রতিবন্ধি বুঝানোর জন্য হাদিসে ব্যবহৃত শব্দ হচ্ছে ‘কাল্লুন’। ‘কাল্লুন’ এর অর্থ হচ্ছে বোঝা, ভার ইত্যাদি। অর্থাৎ যাদেরকে পরিবার বা সমাজ নিজেদের ওপর বোঝা মনে করত, রাসূল (সা.) তাদের দায়িত্ব নিতেন। এর মধ্যে প্রতিবন্ধি, ইয়াতিম, বিধবা ও ফকির-মিসকিন ইত্যাদি শ্রেণির মানুষ ছিল। প্রতিকূল মুর্হূতে দুর্বলদের কারণে আল্লাহর তরফ থেকে সাহায্য এসে থাকে। দুর্বলদের ওসিলায় সবলরা খেয়ে থাকে। কিন্তু সবলরা তা বুঝতে পারে না। হয়তো রাসূল (সা.) এর জীবনের সফলতার পেছনে, ওই সকল দুর্বল অসহায় ইয়াতিম শিশুদের মনের দোয়াও কাজ করেছে। পরবর্তীতে ইসলাম এ সকল কাজকে খুব উৎসাহিত করেছে।

বেকার সমস্যার সমাধান করতেন:
নবুওয়াত লাভের আগেই তিনি সমাজের বেকার সমস্যা নিয়ে ভেবেছেন। বেকারত্ব সামাজিক সমস্যা, তা দূর করার জন্য চেষ্টা করেছেন। নবুওয়াত লাভের পরও বিভিন্নভাবে তিনি মানুষকে কর্মের মাধ্যমে আয়-রোজগার করার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। আমরা জানি, এক ভিক্ষুক রাসূল (সা.) এর দরবারে এসে ভিক্ষা চাইলে, রাসূল (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করেন তোমার ঘরে কিছু নেই? সে বলে, একটি কম্বল আছে। সেটিই নিয়ে আসার জন্য রাসূল (সা.) নির্দেশ দিলেন। তা বিক্রি করে অর্ধেক টাকা দিয়ে পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করে দিলেন। আর বাকি টাকা দিয়ে কুড়াল ক্রয় করে দিলেন। সে জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি শুরু করল। এভাবে পরিবারের অভাব মোছন হলো। তিনি মানুষকে ব্যবসার প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিভিন্নভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। নিজে ব্যবসা করেছেন। মানুষদেরকে বুঝালেন, ব্যবসা শুধু জাগতিক সুখ-শান্তির জন্য নয় বরং আখেরাতেও এর বিনিময়ে অনেক উঁচু মর্যাদা রয়েছে। পূববর্তী নবীগণ কাজ করে অর্থ উর্পাজন করতেন, তা শুনিয়ে শুনিয়ে মানুষদের কর্ম করে খাওয়ার জন্য উৎসাহ যোগিয়েছেন। এভাবে রাসূল (সা.) বেকার সমস্যার সমাধান দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

তিনি মানুষের মেহমানদারি করতেন:
মানুষকে আপ্যায়ন করা ছিল রাসূল (সা.) এর অনন্য বৈশিষ্ট্য। মদিনায় মেহমান আসলে তিনি নিজের ঘরে প্রথমে খুঁজ লাগাতেন। খাবার থাকলে নিজের ঘরেই ব্যবস্থা করতেন। অন্যথায় যে সাহাবির ঘরে খাবার থাকতো সেখানে পাঠাতেন। একবারের ঘটনা, একলোক মদিনায় এলেন। রাসূল (সা.) অভ্যাস অনুযায়ী নিজের ঘরে খুঁজ নিলেন। কিন্তু কিছুই পেলেন না। একজন সাহাবি তার মেহমানদারির দায়িত্ব নিলেন। সাহাবি ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, আমাদের জন্য খাবার কতটুকু আছে? স্ত্রী বলেন, আমরা তিনজন, খাবার আছে একজনের। সাহাবি বলেন, বাচ্চাকে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দাও যেন ঘুমিয়ে যায়। মেহমানের সঙ্গে আমিও খেতে বসবো। তখন তুমি বাতি নিভিয়ে দেবে। আমি তার সঙ্গে বসে হাত নাড়াবো। বুঝবে খাবার খাচ্ছি। খাবারটা মূলত সেই খাবে। আর আমরা রাতের খাবার খাবো না। আল্লাহ তায়ালা ওই সাহাবির ঘটনা দ্বারা খুব খুশি হলেন। আয়াত নাজিল করে প্রশংসা করেন। আমরা কবিতায় পড়ি ‘নিজের খাবার বিলিয়ে দেবো অনাহারির মুখে’ কিন্তু কর্মে বাস্তবায়ন দেখিনা। সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন তার বাস্তব নমুনা।

জাহেলি যুগ থেকেই ন্যায়ের পক্ষালম্বনের কারণে ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়াতেন:
ন্যায় ও সত্যের পর অটল থাকার দরুন কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হলে, নবী করিম (সা.) তার পাশে দাঁড়াতেন। নানাভাবে তাকে সহযোগিতা করতেন। এটা তখনকার অবস্থা যখন তিনি নবী হননি। অসহায়ের সহায় হয়ে মানুষের মনে তখনি তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন।

সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়া বর্তমান সময়ে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও যারা সাহসের সঙ্গে রাতের বিপরীত দাঁড়ায় তাদের সাহায্য করা নৈতিকতা ও ঈমানি দিক থেকে জরুরি। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নেক ও খোদাভীরুতায় একে অন্যকে সাহায্য কর। গোনাহ ও অবাধ্যতায় একে অন্যকে সাহায্য করো না।’ (সূরা মায়েদা)। কোনো ব্যক্তি যদি ন্যায়ের ওপর অটল থাকার কারণে মাজলুম হয় তাকে সাহায্য করা মুসলমানের ওপর জরুরি হয়ে যায়। নবী করিম (সা.) হাদিসে এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের হক কয়টি আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাকে সহযোগিতা করা।

সত্যবাদিতা:
প্রাগৈসলামিক যুগে রাসূল (সা.) আরবদের মাঝে আল আমিন উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। আল আমিন অর্থ বিশ্বাসী। তিনি ছিলেন সকলের আস্থাভাজন ব্যক্তি। সততা, সত্য কথা বলা ছিল তার চরিত্রের ভূষণ। এই গুণের কারণে, ইসলামের দাওয়াত দেয়ার পর, আরবের মুশরিক সম্প্রদায় তার কথাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে পারেনি। কারণ, ওরা তার থেকে কখনো মিথ্যা কথা শুনেনি।

আরব জাতি মূর্খ ছিল, কিন্তু মিথ্যাকে তারা ভীষণ খারাপভাবে দেখতো। এর প্রমাণ পাই আবু সুফিয়ানের এক ঘটনা থেকে। সহীহ বুখারীতে সে ঘটনা বর্ণনা হয়েছে, ‘হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আবু সুফিয়ান বাইতুল মুকাদ্দিস এলাকায় বাণিজ্যের জন্য যান। তৎকালিন রোম সাম্রাজ্যের অধিপতি হিরাকল তখন বাইতুল মুকাদ্দিসে অবস্থান করছিলেন। রাসূল (সা.) এর দাওয়াতি চিঠি তার কাছে এসে পৌঁছেছিল। তাই নবী করিম (সা.) সম্পর্কে বাদশা জানার জন্য আরবের একজন লোককে ডাকলেন। উপস্থিত করা হলো আবু সুফিয়ানকে। বাদশা, আবু সুফিয়ানকে কিছু প্রশ্ন করলেন। আবু সুফিয়ান সবকটির সঠিক জবাব দিলেন। এতে বাদশার বিশ্বাস হয় যে, এই ব্যক্তিই শেষ নবী। আবু সুফিয়ান পরে বলেছেন, আমার ইচ্ছা হচ্ছিল, কিছু ভুল তথ্য দিই। কিন্তু চিন্তা করেছি, মানুষ আমাকে মিথ্যুক মনে করবে। তাই কোনো মিথ্যা বলিনি।’

এভাবেই নবী করিম (সা.) নবুয়াত লাভের আগেই নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। আমরাও যদি আগামী দিনে সুন্দর সমাজ দেখতে চাই তাহলে বর্তমান প্রজন্মকে সেভাবে গড়তে হবে। তাদেরকে মানব সেবা, বদান্যতা, সত্যবাদিতা ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সবক শিখাতে হবে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT