রেজি. নং- ১৯৬, ডিএ নং- ৬৪৩৪

শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০, ২০শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

০৫:৩০ অপরাহ্ণ

শিরোনাম
◈ নকল হ্যান্ড সেনিটাইজারসহ নিম্ন মানের মাস্ক বিক্রি বন্ধে ভোক্তা অধিকারের অভিযান ◈ মালয়েশিয়ায় মসজিদে নামাজের অনুমতি, বিদেশীদের জন্য নিষেধাজ্ঞা ◈ করোনা টেস্ট ফি বাতিল ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি ◈ রায়পুরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ চালক নিহত ◈ মেধাবীদের আরো একবার সংবর্ধিত করলো গোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয় এ্যালামনাই ◈ নাটোরের লালপুরে পদ্মা নদীতে মহিলার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার ◈ রাজশাহীতে সাংবাদিকের সঙ্গে পুলিশ কনস্টেবলের মারমুখী আচরণ ◈ ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন করোনায় আক্রান্ত সবার কাছে দোয়া কামনা ◈ ১৪ দিনের জন্য লকডাউন চবি ক্যাম্পাস ◈ গঙ্গাচড়ার তিস্তায় নৌকাডুবি অল্পের জন্য বেঁচে গেল কয়েকটি প্রাণ

অন্নের জন্য কৃষকের অন্যত্র যাত্রা

প্রকাশিত : ০২:৩৩ AM, ২৮ নভেম্বর ২০১৯ Thursday ১০৭ বার পঠিত

আলোকিত সকাল রিপোর্ট :
alokitosakal

এনজিও থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে পাঁচ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলেন সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের কৃষক মোমিনুল হক। এর মাধ্যমে ২০১৭ সালের বন্যায় ফসলহানির পর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্ন এখন কচুরিপানার মতোই ভাসছে। গত দুই বছর ধান বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছেন, তাতে ঋণই শোধ করতে পারেননি মোমিনুল। অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে স্ত্রী হনুফা বেগমকে নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে সাভারে গার্মেন্টে চাকরি নিয়েছেন।

মোমিনুল হকের মতোই ধানের দাম নিয়ে হতাশা এখন হাওরজুড়ে। এনজিওর ঋণ কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে চাষাবাদ ছেড়ে ধানের দেশের কৃষকরা অন্নের জন্য পাড়ি দিচ্ছেন অন্যত্র।

মধ্যনগরে অজিত দাসের ধানের বীজের দোকানে কথা হয় কৃষক মহিব উল্যাহ, আনিসুর রহমান ও মকবুল হোসেনসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের হিসাব মতে, এক কাঠা জমিতে ধান চাষে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদিত ধানের দাম পাওয়া যাচ্ছে সর্বোচ্চ তিন

হাজার টাকা (কাঠায় পাঁচ মণ উৎপাদন ধরে)। কৃষকের লোকসান প্রতি কাঠায় ৫০০ টাকা।

২০১৭ সালের বন্যার আগেও দুটি বড় দুর্যোগ সোনালি ফসল কেড়ে নিয়েছিল। তাহিরপুরের কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, দুর্যোগে ধান পানিতেই মিশে যায়। ঘরে তোলা ধান যখন বিক্রি করতে পারি না, তখন কষ্টটা একটু বেশিই হয়। লড়াই করে আর টিকতে পারছেন না। ঘরে খাবার না থাকলে দম থাকে না। হাওরাঞ্চল বছরের প্রায় সাত মাস পানিতে ডুবে থাকে। বাকি সময়টা চাষাবাদ করা

হয়। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া- এই সাত জেলার বিভিন্ন অংশজুড়ে হাওর বিস্তৃত। তবে সুনামগঞ্জের প্রায় পুরোটাই হাওর এলাকা। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, এখানে এবার ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টন ধান উৎপাদনের বিপরীতে কেনা হয় ১৭ হাজার ৮২৩ টন। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ১৫ হাজার এবং ২০১৮ সালে ৬ হাজার ৮৮৭ টন ধান কেনা হয়।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছর সরকার প্রতি মণ ধানের মূল্য নির্ধারণ করে এক হাজার ৪০ টাকা। অথচ এ জেলায় ভেজা ধান প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং শুকনা ধান ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ঋণ এবং পরিবারের ব্যয় মেটাতে কৃষকরা ‘পানির দরে’ ধান বিক্রি করছেন, লাভের গুড় খেয়েছেন মহাজনরা। বাজারমূল্য নিন্ত্রয়ণে হাওর অঞ্চলে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয়। স্থানীয় ব্যাপারি ও আড়তদাররা ফড়িয়াদের মাধ্যমে ধান কিনে ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধান-চালের ক্রয়কেন্দ্রে পাঠান। এ ছাড়া হাওরগুলোতে সড়ক না থাকায় কৃষকরা পাকা ধান জমিতেই মাড়াই করে নামমাত্র মূল্যে ব্যাপারিদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এখানে কৃষককে বাঁচাতে সরকারি সংস্থাগুলোর তেমন তৎপরতা নেই। উল্টো ধান কেনা নিয়ে লুকোচুরি ছিল সুনামগঞ্জ জেলাজুড়েই। কোথাও কোথাও অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। ধান কেনার সময় কৃষকের তালিকা টানানো দূরের কথা, উপজেলা ওয়েবসাইটেও তা আপলোড হয়নি। ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের সভাপতি বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, সরকারিভাবে ধানের চেয়ে চাল বেশি কেনা হয়। ধান দেন কৃষক আর চাল দেন মিলাররা। এতে কৃষকের চেয়ে মিলাররাই বেশি লাভবান হন।

কৃষিকার্ড নিয়েও অভিযোগের অন্ত নেই। দেখা গেছে, যাদের কৃষিকার্ড আছে তাদের ধান নেই। যাদের ধান আছে তাদের কৃষিকার্ড নেই। তাই এই তালিকা সংশোধনের দাবি জানান হাওরের কৃষকরা।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার কৃষক নেতা, কেন্দ্রীয় কৃষক সংগ্রাম সমিতির আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন, লটারির নামে সরকারি দলীয় নেতাকর্মীদের সুবিধা দেওয়ার অপচেষ্টাও হয়েছে। সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার আশা কৃষকরা ছেড়েই দিয়েছেন। কৃষকের এই হতাশা ভবিষ্যতে ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে।

ফসল রক্ষা বাঁধে হরিলুট : হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের বরাদ্দ কয়েকটি চক্র লোপাট করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। হাওরে কখনই নির্ধারিত সময়ে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হয় না। আবার কোথাও কোথাও বাঁধের গোড়া থেকে মাটি তোলায় বাঁধ আরও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগে গত ফেব্রুয়ারিতে ধর্মপাশার চন্দ্র সোনারথাল হাওরের ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতিকে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

২০১৭ সালে অকাল বন্যা ও দুর্নীতিবাজদের অপকর্মে হাওর তলিয়ে যায়। ঠিকাদার ও পিআইসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও হয়। অর্থনীতিবিদ ও গবেষক অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জে ঠিকাদার ও পাউবোর কর্মকর্তারা পরস্পর যোগসাজশে আট কোটি ১৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। রাজনৈতিক যোগসাজশে হাওরের বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরে সুনামগঞ্জে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজে প্রথম পর্যায়ে ৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে বরাদ্দ আরও বাড়ানো হতে পারে। ১৫ ডিসেম্বর থেকে বাঁধের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে। সুনামগঞ্জে হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবে জমির মালিক না হয়েও পিআইসিতে ঠাঁই হয়েছে অনেকের। সুবিধাভোগীরা লাভবান হতে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া আগে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির মামলার আসামিও পিআইসির সভাপতি ও সম্পাদক হয়েছেন। এবার যেন এটা কোনোভাবেই না হয়। তিনি বলেন, বাঁধের কাজে যারা আর্থিকভাবে লাভবান হন, তারা কোনো কাজে ২০ হাজার টাকার হলে সেখানে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ আনার চেষ্টা করেন।

খাল কেটে কুমির আনার শঙ্কা : সুনামগঞ্জের মাহারাম নদী একসময় ছিল হাওরের দুঃখ। এ নদী দিয়ে সরাসরি কয়েকটি হাওরে পানি ঢুকে যেত। মানুষের প্রচেষ্টায় বাঁধ দিয়েও আটকানো যাচ্ছিল না সেটি। একপর্যায়ে প্রাকৃতিকভাবেই তা বন্ধ হয়ে যায়। এ বছর সরকার মাহারাম ও যাদুকাটা ইজারা দিতে টেন্ডার আহ্বান করেছে। মাহারাম নদী ইজারা দিলে হাওরের জন্য ‘খাল কেটে কুমির’ আনা হবে বলে মনে করেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা। এতে ফসলহানির আশঙ্কাও করছেন তিনি।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি Alokito Sakal'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyalokitosakal@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

Alokito Sakal'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। Alokito Sakal | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT